ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৫ অাপডেট : ২১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৩০

প্রিন্ট

বিশ্ব ইজতেমা শুরু: বয়ান করছেন ওমর খতিব

নিজস্ব প্রতিবেদক

টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে তাবলিগ জামাতের আয়োজনে বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমা। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও ব্যাপক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। এখন বয়ান করছেন জর্দানের মওলানা মুরুব্বি শেখ ওমর খতিব। তার বয়ান তরজমা করছেন বাংলাদেশের মো. আবদুল মতিন।

১৪ জানুয়ারি দুপুরে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমা শেষ হবে। এরপর চারদিন বিরতি দিয়ে আগামী ১৯ জানুয়ারি শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব।

এবারের বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদসহ দুই পক্ষের প্রধান দুই মুরুব্বি যোগ দিচ্ছেন না। তবে তাদের প্রতিনিধিরা ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন। টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে মাওলানা সাদ এ সিদ্ধান্ত  নিয়েছেন বলে কাকরাইল মসজিদ ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ইজতেমায় অংশ নিতে বুধবার থেকেই তুরাগতীরে জড়ো হতে থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। তবে ইজতেমায় অংশ নেওয়ার জন্য বিদেশি মুসল্লিদের কেউ কেউ দু-একদিন আগেই ইজতেমাস্থলে এসে পৌঁছেছেন। তারা দলে দলে ময়দানে এসে খুঁজে নিচ্ছে যার যার খিত্তা। মুসল্লিদের আগমনে পুরো টঙ্গী নগরী এখন টুপি-পাঞ্জাবি পড়া মানুষের নগরে পরিণত হয়েছে। ইবাদাত-বন্দেগীর মোক্ষম সময় হৃদয়ে ধারণ করে মুসল্লিদের স্রোত টঙ্গী অভিমুখে বেড়েই চলছে। এ স্রোত থাকবে ১৪ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত।

শুক্রবার বাদ ফজর জর্দানের মাওলানা সৈয়দ ওমর খতিবের আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর বাদ জোহর বয়ান করবেন বাংলাদেশের মাওলানা মোহাম্মদ হোসেন, বাদ আছর বয়ান করবেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল বার ও বাদ মাগরিব বয়ান করবেন বাংলাদেশের মাওলান মোহাম্মদ রবিউল হক।

এদিকে শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাজে লাখ লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নামাজে অংশ নিতে মুসল্লিদের গন্তব্য এখন তুরাগ তীরের দিকে। লাখ লাখ মুসল্লির আগমনে তুরাগ তীরে অন্যরকম ধর্মীয় আমেজ বিরাজ করছে।

বিশ্ব ইজতেমা আজ শুরু হলেও গত বুধবার বিকেল থেকে জামাতবদ্ধ মুসল্লিরা ইজতেমা ময়দানে আসতে শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আয়োজন কমিটির এক মুরুব্বি জানান, বিগত বছরে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব থেকে আগত মুসল্লিদের ইজতেমা মাঠে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে সমস্যা হতো। এবারও যাতে কোনো রকম অসুবিধা না হয় সে বিবেচনা মাথায় রেখে দেশের ৬৪টি জেলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে এবছর নির্দিষ্ট ৩২ জেলার মুসল্লিরা বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিবেন।

প্রথম পর্বে ১৬ জেলা এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৬ জেলার মুসল্লিরা তাদের জন্য নির্ধারিত খিত্তায় অবস্থান নিয়ে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন। তবে ঢাকা জেলার মুসল্লিরা দুইপর্বেই অংশ নেবেন। সারা দেশের জামাতবদ্ধ মুসল্লিদের জেলাওয়ারি দু’পর্বে ভাগ করা হয়েছে। কোন কোন জেলার মুসল্লি কোন পর্বে অংশ নেবেন সে দিক নির্দেশনাও ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। ময়দানে মুসল্লিদের অবস্থানও জেলাওয়ারি নির্দিষ্ট খিত্তায় (ভাগে) বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম দফায় পুরো ময়দানকে ২৮টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে।

এবারের ইজতেমায় বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় ২৫ হাজার বিদেশি মেহমান আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ৫০টি দেশের প্রায় ১২ হাজার বিদেশি মেহমান ময়দানের তাদের জন্য নির্ধারিত বিদেশি নিবাসে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। দেশি-বিদেশি ইসলামী চিন্তাবিদ ও ওলামায়ে কেরামগণ ছয় উসুল সম্পর্কে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনামূলক মূল্যবান বয়ান রাখবেন। মূল বয়ান সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় তরজমা করা হবে।

দুই পর্বে খিত্তাওয়ারি মুসল্লিদের অবস্থান

এ বছর প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমায় আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা যেসমস্ত খিত্তায় অবস্থান করবেন তা হলো- ঢাকা-৮,৯,১০,১১,১২,১৩,১৬,১৭ (খিত্তা নং-১-৮), পঞ্চগড় (খিত্তা নং-৯), নীলফামারী (খিত্তা নং-১০), শেরপুর (খিত্তা নং-১১), নারায়ণগঞ্জ (খিত্তা নং-১২ ও ১৯), গাইবান্ধা (খিত্তা নং-১৩), নাটোর (খিত্তা নং-১৪), মাদারীপুর (খিত্তা নং-১৫), ঢাকা-২৪ (খিত্তা নং-১৬) নড়াইল (খিত্তা নং-১৭), ঢাকা-১৫ (খিত্তা নং-১৮)  লক্ষ্মীপুর (খিত্তা নং-২২ ও ২৩), ঝালকাঠী (খিত্তা নং-২৪), ভোলা (খিত্তা নং-২৫ ও ২৬), মাগুরা (খিত্তা নং-২৭) ও পটুয়াখালীর মুসল্লিরা ২৮নং খিত্তায় অবস্থান করে তাদের ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকবেন।

দ্বিতীয় পর্বে ঢাকা জেলা (খিত্তা নং-১-১০), ১৮ ও ১৯), জামালপুর (খিত্তা নং-১১ ও ১২), ফরিদপুর (খিত্তা নং-১৩), ফরিদপুর (খিত্তা নং-১৪), ঝিনাইদহ (খিত্তা নং-১৫), ফেনী (খিত্তা নং-১৬), সুনামগঞ্জ (খিত্তা নং-১৭), চুয়াডাঙ্গা (খিত্তা নং-২০), কুমিল্লা (খিত্তা নং-২১ ও ২২), রাজশাহী (খিত্তা নং-২৩ ও ২৪), খুলনা (খিত্তা নং-২৫ ও ২৭), ঠাকুরগাঁও (খিত্তা নং-২৬) ও পিরোজপুর (খিত্তা নং-২৮) অংশ নিবেন।

ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন ও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প উদ্বোধন

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মো. জাহিদ আহসান রাসেল টঙ্গী ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন করতে যান। এ সময় তিনি ময়দানের উত্তর পাশে মন্নু টেক্সটাইল মিলের মাঠে স্থাপিত হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) লি., টঙ্গী ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি ও ইবনে সিনার ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনকালে জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, এবারও বিশ্ব ইজতেমা দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্ব ইজতেমার সকল কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লি ময়দানে সমবেত হয়েছেন।

পুলিশ প্রশাসনের প্রেস ব্রিফিং

বৃহস্পতিবার বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের আইনশৃংখলা নিয়ে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ষ্টেডিয়ামে এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ব্রিফিংকালে গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, এবার ইজতেমা মাঠের নিরাপত্তার জন্য প্রথম পর্বে ৬ হাজার পুলিশসহ র‌্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, সাদা পোশাকধারী বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় সাত হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইজতেমা ময়দান ছাড়াও আশপাশের এলাকাগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশ পৃথক পৃথকভাবে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ইজতেমা ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করছে। এছাড়াও ময়দানে আগত মুসল্লিদের মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। ইজতেমা ময়দানের সব প্রবেশ পথে শতাধিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে।

মাওলানা সা’দ এর বিশ্ব ময়দানে আসা নিয়ে উদ্বুত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা শুধু ময়দানের আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি। মাওলানা সা’দ সাহেবের ময়দানের আসার বিষয়টি সম্পূর্ণ ইজতেমা আয়োজক কমিটির মুরুব্বি ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আওতাধীন।

মুসল্লিদের গাড়ি পার্কিংয়ে নির্দেশনা

বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঢাকা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর এলাকা: চট্টগ্রাম বিভাগের মুসল্লিরা উত্তরা গাউছুল আজম এভিনিউ (১৩নং সেক্টর রোডের পূর্ব প্রান্ত হতে পশ্চিম প্রান্ত হয়ে গরিবে নেওয়াজ রোড), ঢাকা বিভাগের মুসল্লিরা সোনারগাঁও জনপথ চৌরাস্তা হতে দিয়াবাড়ি খালপাড় পর্যন্ত, সিলেট বিভাগের মুসল্লিরা উত্তরাস্থ ১২নং সেক্টর শাহমখদুম এভিনিউ, খুলনা বিভাগের মুসল্লিরা উত্তরা ১৬ ও ১৮নং সেক্টরের খালি জায়গা, রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের মুসল্লিদের পার্কিং প্রত্যাশা হাউজিং, বরিশাল বিভাগ থেকে আসা মুসল্লিরা ধউড় ব্রিজ ক্রসিং সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ ল্যান্ডিং স্টেশন এবং ঢাকা মহানগরীর মুসল্লিদের বহনকারী যানবাহন উত্তরাস্থ শাহজালাল এভিনিউ, নিকুঞ্জ-১ এবং নিকুঞ্জ-২ এর আশপাশের খালি জায়গায় পার্কিং করতে বলা হয়েছে।

এদিকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে আগত মুসল্লিদের বহনকারী যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য মহাসড়ক পরিহার করে টঙ্গীর কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিলস কম্পাউন্ড, মেঘনা টেক্সটাইল মিলের পাশে রাস্তার উভয় পাশ, টঙ্গী সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি এন্ড কলেজ মাঠ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে টিআইসি মাঠ, গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ, চান্দনা চৌরাস্তা হাইস্কুল মাঠ, জয়দেবপুর চৌরাস্তা তেলিপাড়ার ট্রাকস্ট্যান্ড এবং নরসিংদী-কালীগঞ্জ হয়ে আগত মুসল্লিদের বহনকারি যানবাহন টঙ্গীর কে-টু (নেভী) সিগারেট কারখানাসংলগ্ন পাশের খোলা স্থান ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মুসল্লিদের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম

ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে প্রথম পর্বে ব্যাপক প্রস্তুতি হাতে নেয়া হয়েছে। গাজীপুর সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘গাজীপুর সিভিল সার্জন টঙ্গী ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালকে ইজতেমার জন্য অস্থায়ীভাবে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, বক্ষব্যাধি/অ্যাজমা ইউনিট, হৃদরোগ ইউনিট,  ট্রমা (অর্থোপেডিক) ইউনিট, বার্ণ ইউনিট, ডায়রিয়া ইউনিট, স্যানিটেশন টিম এবং ১২টি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও চক্ষু, মেডিসিন ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞসহ চিকিৎসক রোস্টার অনুযায়ী চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকবেন।

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত