ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:৩৯

প্রিন্ট

সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের বাড়তি চিন্তা

সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের বাড়তি চিন্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে হলে যে পরিমাণ ফি লাগে তার জন্য বাড়তি চিন্তায় থাকতে হয় বেকারদের। এতে মানসিকভাবে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন চাকরিপ্রত্যাশীরা। একদিকে বেকারত্বের অভিশাপ, অন্যদিকে আবেদন ফির নামে বাড়তি টাকার জোগান দেয়া খুবই কষ্টের। ফলে হতাশা বিরাজ করে অধিকাংশ বেকারের মধ্যে।

জানা যায়, সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে হলে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে পদভেদে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আবেদন ফি জমা দিতে হয়। কিছু কিছু চাকরিতে দিতে হয় তারও বেশি। প্রতিমাসে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য একাধিক আবেদন করতে হয়। ফলে প্রতি মাসেই চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের এক থেকে দুই হাজার টাকা খরচ করতে হয়। তাছাড়া পরীক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বেশ খরচ। চাকরির জন্য নিয়মিত যারা আবেদন করেন, তারা বলছেন, এটা এক ধরনের বাড়তি চাপ। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে হতাশার কারণ।

এদিকে চাকরির আবেদনের জন্য কোনো প্রকার ফি না নিতে ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, ব্যাংকের মতো সরকারি চাকরিতেও নিয়োগ কার্যক্রমের জন্য ফি নেয়া বন্ধ করা হোক। বেকারত্বকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে সরকার। বিভিন্ন সংস্থা বা বিভাগ নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ফি নিচ্ছে। নিরূপায় হয়ে বেকাররাও আবেদন করছেন। চাকরি অনিশ্চিত জেনেও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে একটি আসনের বিপরীতে আবেদন করছেন শতশত প্রার্থী।

সম্প্রতি শেষ হয়েছে প্রাথমিক ‘সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগ ও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে ‘মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগের আবেদন। এই দুটি নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন করেছেন রেকর্ড সংখ্যক চাকরিপ্রার্থী। আর এতে সরকারের আয় হয়েছে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে চলছে ৪০তম বিসিএসের আবেদনের সময়। ৪০তম বিসিএসে আবেদনের জন্য প্রত্যেক প্রার্থীকে ৭০০ টাকা ফি জমা দিতে হচ্ছে।

জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের প্রায় ১২ হাজার পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২৪ লাখ ১ হাজার ৫৯৭ জন প্রার্থী। প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে আবেদন ফি বাবদ ১৬৮ টাকা নেয়া হয়। এই হিসেবে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের আয় হয় ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৬৮ হাজার ২৯৬ টাকা। আর মাধ্যমিক সরকারী শিক্ষকের এক হাজার ৩৭৮ পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২ লাখ ৪৮ হাজার ৩২২ জন প্রার্থী। প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে ফি বাবদ নেয়া হয়েছে ৫০০ টাকা। এতে সরকারের আয় হয়েছে ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার নিয়োগের আবেদন অতিসম্প্রতি শেষ হয়েছে। চাকরির আবেদন করতে যে টাকা লাগে তা অধিকাংশ চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে বোঝা। তাই আবেদন ফি কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান বলেন, পড়া-লেখা শেষ করলেই চাকরি হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে অনেককে বেকার থাকতে হয়। চাকরি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়টা অভিশাপের মতই। এই সময়টায় একজন প্রার্থীকে একাধিক আবেদন করতে হয়, আর এর জন্য যে ফি গুনতে হয় তা বেকারদের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘার মতো।

তিনি আরো বলেন, সরকারি চাকরির আবেদনে বর্তমানে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকা পর্যন্তও ফি ধার্য করা হয়। তবে বেশিরভাগই ৫০০ থেকে ১০০০ এর মধ্যে। এই পরিমাণ টাকা দিয়ে আবেদন করা অধিকাংশ বেকারের জন্যই কঠিন। তাই ফি কমানো উচিত বলে আমি মনে করি।

রাশেদুজ্জামান নামের এক চাকরিপ্রত্যাশী বলেন, দেশের বেকারদের ওপর এটা কতটা বোঝা তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এ কষ্ট শুধু বেকাররাই বুঝতে পারে। সারা মাস কষ্ট করে টাকা জমিয়ে আবেদন করতে হয়। টাকার অভাবে আবেদন করতে পারে না এমন সংখ্যাও কম নয়। প্রতি মাসে কম পক্ষে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা লাগে।

সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় গত দুই বছর ধরে আবেদন করে আসছেন শায়লা পারভীন নামের এক চাকরিপ্রত্যাশী। জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, চাকরির আবেদন করতে গেলেই একগাদা টাকা লাগে। একটি আবেদন করতে হলে হাজার টাকা লেগে যায়। ছোটখাটো পদগুলোতে কম লাগলেও বড় পদে বেশি লাগে।

ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা শায়লা বলেন, সরকার বিভিন্ন জায়গায় ভর্তুকি দেয়, কিন্তু চাকরিতে আবেদন করতে হলে ঠিকই টাকা লাগে। তবে এটা যদি সব চাকরির ক্ষেত্রে এক-দুইশ হতো তাহলে সমস্যা হতো না।

ঢাকার বাইরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকায় এসেছেন রাজিব আহমেদ নামের এক চাকরিপ্রত্যাশী। দেড় বছর ধরে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় আবেদন করছেন তিনি। জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে বেকার রয়েছি। আগে বাসা থেকে টাকা নিতাম। এখন আর নিতে পারি না। বাড়ি থেকে টাকা নিতে গেলে অন্য ভাই-বোনদের লেখা-পড়া হবে না। এখানে টিউশনি করে যা পাই, তা দিয়ে থাকা-খাওয়া কোনো রকম চলে। কিন্তু যে মাসে আবেদন করতে হয় সেই মাসেই বিপত্তি বাঁধে।

খোঁজ নিয়ে যানা যায়, শুধু সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক বাদে প্রায় সকল চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রেই ফি লাগে। চাকরির ধরন ভেদে আবেদন ফির পরিমাণে কম-বেশি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর আতিউর রহমান দায়িত্বে থাকার সময় ব্যাংকে আবেদনের ফি বাতিল করে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখা-পড়া শেষ করা রায়হান মাহমুদ বলেন, আতিউর রহমান সাহেব ব্যাংকে আবেদনের ক্ষেত্রে ফি বাতিল করে লাখ লাখ বেকারের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, সব চাকরির ক্ষেত্রেই আবেদন ফি হয়তো বাদ দেয়া সম্ভব নয়। তবে সরকার চাইলে কমাতে পারে।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন অনেক আবেদনকারী। পরীক্ষা আয়োজন থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত যা খরচ হয়, আবেদন ফি থেকে এখন তার থেকে অনেক বেশি টাকা সরকারের আয় হয়। তাই সংশ্লিষ্টরা একটু পজিটিভ হলেই আবেদন ফি কমাতে পারে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত