ঢাকা, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮, ৯ আষাঢ় ১৪২৫ অাপডেট : ৩৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ১১:৩৭

প্রিন্ট

বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে আছে ওরা

বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে আছে ওরা
নড়াইল প্রতিনিধি

সারাদেশে কুমার শিল্প বিলীন হতে চললেও নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমারডাঙ্গা গ্রামের চিত্র ব্যতিক্রম। এ গ্রামের কুমাররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন হরেক রকম মাটির জিনিস তৈরির কাজে। এসব কাজ পুরুষের পাশাপাশি করছেন পরিবারের নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাও। শুভ্র হাওয়ার ভোর থেকে শুরু হয়ে কাজ চলে গভীর রাত পর্যন্ত। তবে আধুনিকতার আগ্রাসনে এখন এ কাজে তেমন লাভ নেই। পেটের দায়ে এবং বাপ-ঠাকুরদার দীর্ঘ দিনের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এখনও এ কাজকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা। 

লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী পাড়ের কুমারডাঙ্গা গ্রাম। এ গ্রামে মৃৎ শিল্পের ইতিহাস শতবছরের। এখানকার কুমারদের সুনিপুণ হাতে তৈরি মাটির জিনিস-পত্রের  ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এখনও। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাশের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার হাটবাজারেও বিক্রি হচ্ছে এখানকার তৈরি জিনিসপত্র। 

কালের বিবর্তনে মাটির তৈরি  হাড়ি পাতিলের চাহিদা কমতে থাকে। তার জায়গা দখল করে নেয় অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক-মেলামাইন সামগ্রী। এক সময়ের রান্নাঘরের হাড়ি, কড়াই, ঢাকনা, ফুলের টব, কলস, পিঠার ছাঁচ, মুড়ি ভাজার সামগ্রী তৈরী করে  গৃহস্থালীর চাহিদা মেটানো সেই সব কুমারদের অধিকাংশেরই চাকা ( মাটির সামগ্রী তৈরী করা যন্ত্র) বন্ধ  হয়ে গেলেও লোহাগড়া উপজেলার কুমারডাঙ্গা গ্রামে তা সচল রয়েছে। এই গ্রামে মোট ৭৮টি পরিবারের মধ্যে কুমার পরিবারের সংখ্যা ৩২। এসব পরিবারের দেড় শতাধিক সদস্য এখনও মাটির তৈরি জিনিসপত্র নিজ হাতে বানিয়ে বাজারে বিক্রয় করে সংসার চালায়। 

তবে প্লাস্টিকের তৈরি আধুনিক জিনিসপত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কদর কমেছে মাটির তৈরি জিনিস পত্রের। তাই বেকার হয়ে পড়েছে মাটির কারিগররা। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কুমাররা অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন তাদের কেউ ভ্যান রিক্সা, কেউ মাটি কাটা ইত্যাদি দিন মজুরের কাজ করছে। তবে পেটের দায়ে এবং বাপ-ঠাকুরদার দীর্ঘ দিনের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এখনও এ কাজ কে আকড়ে ধরে আছে কুমারডাঙ্গা গ্রামের কুমারেরা।

সরেজমিনে কুমারডাঙ্গা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এ গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে দিনরাত ঘুরছে কুমারের চাকা। কেউ মাটিতে পানি মিশিয়ে কাঁদা নরম করছে, কেউ মাটির তৈরী জিনিস রোদে শোকানোর কাজ করছে, কেউ ব্যস্ত এসব পোড়ানোর কাজে। আবার আনেকের মনোযোগ পোড়ানো জিনিসপত্রে রং-তুলির কাজে।

কুমারডাঙ্গা গ্রামের অরবিন্দু পাল জানান, মাঘ মাসের শুরু থেকেই তাদের কাজ শুরু হয়। চৈত্র-বৈশাখ এ দুমাসে রোদের তেজ বেশি থাকায় তখন তাদের কাজ আরও বেশি হয়। ওই গ্রামের অর্চনা পাল বলেন, ত্রখন কাজের খুব চাপ। তাই স্বামীর কাজে তিনি সহযোগিতা করেন। 
                                                                                                          
পঞ্চনন পাল অভিযোগ করে বলেন, এ পেশায় এখন আর লাভ নেই। অন্য কোন কাজ জানিনা। তাই বাপ দাদার পেশাকে কোনো রকমের আঁকড়ে ধরে আছি।
 
অনীল পাল জানান, নতুন কেউ এ কাজ শিখছে না, তাই আগামীতে কুমারের চাকা ঘোরোনোর মত কেউ থাকবে  না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে  প্লাস্টিক ও সিলভার এসে মাটির  তৈরী জিনিসের দাম কমে গেছে।

জেলায় কুমার পরিবার ও তাদের সংখ্যার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে  লিপিবদ্ধ নেই। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোন পৃষ্ঠপোষকতাও নেই এ শিল্পে। এমনটি চলতে থাকলে অচিরেই সম্পূর্ণ রূপে হারিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে মৃৎ শিল্পের। এজন্য এখনই  পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জেলার সচেতন মহল।
/আরএস/

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত