ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৮, ০৮:৩৫

প্রিন্ট

ফল বিপর্যয়ে ইংরেজি ও আইসিটি

ফল বিপর্যয়ে ইংরেজি ও আইসিটি
নিজস্ব প্রতিবেদক

গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সর্বনিম্ন ফল হয়েছে। এবারের সার্বিক পাসের হারে ধাক্কা লেগেছে ইংরেজি এবং আইসিটি বিষয়ে। দুই বিষয়েই ফেলের হার গত বছরের চেয়ে বেশি।

বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসিসহ (বিএম) মোট ১০ বোর্ডের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এতে সর্বমোট পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ পাসের হার গত বছরের চেয়ে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। গত ৬ বছরের মধ্যেও এবারের পাসের হার সর্বনিম্ন। শুধু পাসই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। এবার সর্বমোট ২৯ হাজার ২৬২ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর পেয়েছিল ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন। সেই হিসাবে জিপিএ-৫ কমেছে ৮ হাজার ৭০৭টি। তবে এবার ছাত্রীরা বেশ ভালো করেছে। ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।

এবারে ইংরেজিতে দেশের দশ শিক্ষা বোর্ডে ফেল করেছে ২৪ শতাংশ ছাত্রছাত্রী। অপরদিকে আইসিটিতে ফেল করেছে ১০ শতাংশ। পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় ২১ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে প্রায় ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এসবের প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলের ওপর।

পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার পেছনে পরীক্ষার হলে এবং খাতা মূল্যায়নে ‘কড়াকড়ি’কে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, 'এতদিন সংখ্যাগত উন্নয়ন হয়েছে। এখন আমরা গুণগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা ক্লাস নেয়া ও ভালোভাবে পরীক্ষা গ্রহণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ঠিকভাবে যেন পরীক্ষার খাতা দেখা হয়, সেদিকে নজর দিচ্ছি। কাজেই যা বাস্তব, যা সত্য সেই ফল বেরিয়ে এসেছে। আমরা কাউকে নম্বর বাড়িয়ে দিতে বলি না, কমাতেও বলি না। সঠিক মূল্যায়ন করতে আমরা শিক্ষকদের বাধ্য করেছি।'

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফলের সার-সংক্ষেপ তুলে দেয়া হয়। মূলত তখনই ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর দুপুর ১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ফল প্রকাশের ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণ পর থেকে শিক্ষার্থীরা কলেজ, মাদ্রাসায় গিয়ে ফল জানতে পেরেছে। এছাড়া অনলাইন এবং এসএমএসেও শিক্ষার্থীরা ফল জেনেছে।

বৃহস্পতিবার এইচএসসির সঙ্গে মাদ্রাসার আলিম এবং কারিগরি বোর্ডের এইচএসসি (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা) ফলও প্রকাশ করা হয়। এবার শুধু এইচএসসিতে পাসের হার ৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৫৫৬২ শিক্ষার্থী। অপরদিকে মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ দশ বোর্ডে মোট পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। দশ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ শিক্ষার্থী।

বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী হচ্ছে- ঢাকায় পাসের হার ৬৬.১৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ ১২৯৩৮ জন। রাজশাহীতে পাসের হার ৬৬.৫১ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৩৮ জন। কুমিল্লায় পাসের হার ৬৫.৪২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৪৪ জন। যশোরে পাসের হার ৬০.৪০ শতাংশ, ২০৮৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। চট্টগ্রামে পাস ৬২.৭৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬১৩ জন। বরিশালে পাস ৭০.৫৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭০ জন। সিলেটে পাস ৬২.১১ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৭৩ জন। দিনাজপুরে পাস ৬০.২১ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২২৯৭ জন। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৭৮.৬৭ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২৪৪ জন। কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৭৫.৫০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৪৫৬ জন। এছাড়া ঢাকা বোর্ডের অধীনে ডিপ্লোমা-ইন বিজনেস স্টাডিজ পরীক্ষা নেয়া হয়। এতে পাসের হার ৮৭.৮২ শতাংশ। এতে কেউ জিপিএ-৫ পায়নি।

এবারের পরীক্ষার সাতটি বিষয়ের পাসের হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলায় সারা দেশে পাশের হার গত বছরের চেয়ে বেশি। গত বছর ৯৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছিল। এবার সেই হার ৯৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু পাসের হার কমেছে ইংরেজি ও আইসিটিতে। গত বছর আইসিটিতে পাস করেছিল প্রায় ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী। এবার এ হার ৯০ শতাংশ। ইংরেজিতে গত বছর ফেলের পরিমাণ ছিল ২২ শতাংশ। এবার প্রায় ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী এ বিষয়ে ফেল করেছে।

বিজ্ঞান, মানবিক এবং বিজনেস স্টাডিজের শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিষয়ভিত্তিক পাসের হার গত বছরের চেয়ে কমেছে। বিজ্ঞান বিভাগে রসায়ন এবং পদার্থ বিজ্ঞানে গত বছর পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৯৪.৪০ এবং ৮৮.৮৮ শতাংশ। এ বছর এ দুই বিষয়ে পাসের হার যথাক্রমে ৯০.১২ এবং ৮৩.৯৮ শতাংশ। মানবিকে পৌরনীতিতে গত বছর পাস করেছে ৯৩.৬১ শতাংশ। এবার সেই হার ৯৩.৪১ শতাংশ। বিজনেস স্টাডিজের হিসাববিজ্ঞানে পাসের হার গত বছর ছিল ৮৭.৪৯ শতাংশ, এবার পাস করেছে ৮৫.৮৬ শতাংশ।

গত ৬ বছরের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮.৯১ শতাংশ। ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০১৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৮.৩৩ এবং ২০১৩ সালে ছিল ৭৪.৩০ শতাংশ। অপরদিকে রোববার প্রকাশিত ফলে দেখা গেছে, এইচএসসি, আলিম ও এইচএসসি (বিএম) পরীক্ষায় মোট পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

ভালো ফলের সূচক হিসেবে চারটি দিক ধরা হয়। এগুলো হচ্ছে- পাসের হার, মোট জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শতভাগ ও শূন্য পাস করানো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। এবার এর তিনটিই নিুমুখী। এ বছর ১০ বোর্ডে মোট পাসের হার গত বছরের চেয়ে কম। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অপরদিকে গত বছর শতভাগ পাস করা কলেজ ও মাদ্রাসা ছিল ৫৩২টি, এবার কমে দাঁড়িয়েছে ৪০০টি। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান অবশ্য কমেছে। গত বছর ছিল ৭২টি, এবার কমে হয়েছে ৫৫টি। এ শেষ সূচক শুধু ইতিবাচক।

এদিকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও এ ফলাফলকেই ‘বাস্তবসম্মত’ বলে মনে করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, পাসের হার বাড়তে বাড়তে মান নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, প্রশ্নফাঁসের বিস্তারে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে অনাস্থা তৈরি হচ্ছিল, এবারের ফলাফলে সেসব কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফেরার আভাস তারা পাচ্ছেন।

সারা দেশের ফলাফলে পাশের হার কমে যাওয়াকে ‘স্বাভাবিক ও ইতিবাচক’ প্রবণতা বলে মনে করছেন ঢাকার নটরডেম কলেজের অধক্ষ্য ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও। তিনি বলেন, 'গত কয়েক বছরে যে প্রশ্ন ফাঁস, নকল এসবের কালচার গড়ে উঠেছিল এবছর তার ব্যতিক্রম ঘটল। আমার মনে হয় এ বছর খাতার মূল্যায়নও ভালো হয়েছে। এই যে রেজাল্ট, আমি মনে করি এটাই বাস্তবসম্মত রেজাল্ট। স্বচ্ছ পরীক্ষা এবং স্বচ্ছ তার ফলাফল। স্টুডেন্টরা এভাবেই বুঝতে পারবে লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই।'

মতিঝিল আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম বলেন, 'হয়ত আগে লিবারেলি খাতা দেখত, অনেক কিছু ওভারলুক করে যেত, এবার যায়নি। এটা ভালো হয়েছে, মূল্যায়ন সঠিক হয়েছে।'

একই ধরনের মত প্রকাশ করেন ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলা বিভাগের প্রধান মো. সুলাইমান কবির। তিনি বলেন, 'প্রশ্ন ফাঁস না হওয়ায় এবার শিক্ষার্থীদের আনন্দটা দ্বিগুণ হয়েছে। রেজাল্ট যাই হোক, প্রকৃত মূল্যায়নে সবাই খুশি। প্রশ্ন ফাঁস হলে তো মেধার মূল্যায়নটা হয় না; ওই প্র্যাকটিসটাও খারাপ।'

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত