ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৮, ২১:৫১

প্রিন্ট

প্রবাসীদের স্বপ্নের সারথি কেউ হয় না!

প্রবাসীদের স্বপ্নের সারথি কেউ হয় না!
রিফাত কান্তি সেন

নিজের স্বপ্নকে মেলে ধরতে দেশ ছেড়ে জীবিকার টানে বিদেশে গমন। রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যে অর্থ কামান সেটাও পাঠিয়ে দিতে হয় দেশে। কি রৌদ্র, কি বৃষ্টি কাজ থেমে নেই। মাঝে মাঝে নিজের জীবনটাও অকালে চলে যায়। ফিরে না আর পৃথিবীতে। শত কষ্ট, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা সহ্য করে আপনজনের মুখে হাসি ফুটাবার তাগিদে দিনের পর দিন কলুর বলদের মত খেঁটে চলেছেন দিবস-রজনী। সেই মানুষগুলোর সুখ-দুখের খবর ক'জনাই বা রাখে। বলছিলাম প্রবাসীদের কথা।

 

দেশে কাজ না পেয়ে অনেকেই ছুটছেন প্রবাসে। দেশের মায়া-মমতা ত্যাগ করে আপনজনদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য নিজ দেশ ছেড়ে বিদেশে যাত্রা। তারপর ভিনদেশে কষ্টের জীবন। তবু কী তাদের সুখ তাদের কখনো ধরা দেয়? প্রিয় পাঠক, তেমনই একটি গল্প তুলে ধরলাম আপনার সামনে। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়!

 

রমজান মিয়া (ছদ্মনাম) থাকেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে। ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা, ভাই-বোন,আত্মীয় স্বজন সবই আছে তার। সংসারের হাল ধরতে গিয়েছেন বিদেশে। নিজের ভাগ্য বদলের আশায় প্রবাসে গেলে ও ভাগ্য তার সাথে করছে নিষ্ঠুর আচরণ। অর্থ কামালেও তার মাঝে নেই সুখ। প্রচণ্ড চাপা কষ্ট বিরাজ করছে তার মনে।

 

ছেলে এবার মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। বায়নার শেষ নেই। এটা দেও, ওটা দেও কত রকমের যে বায়না। বেচারা বায়না মিটাতে মিটাতে অস্থির প্রায়। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও সন্তানদের মানুষ করার জন্য সব আকুতি-মিনতিই মেনে নেন তিনি।

 

মেয়ে এবার মাধ্যমিকের ছাত্রী। বায়নার শেষ তারও কম নয়। স্ত্রী তো যেন মনে করেন তিনি টাকার মেশিন। মাস না শেষ হতেই ফোন আর ফোন। তখন যেন ভালবাসা তিন গুণ বেড়ে যায়। বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয় থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব কত লোকের যে আবদার এখন রমজান আলীকে মেটাতে হয় তার খবর কে-ই বা রাখে।

 

সকলের আবদার মেটাতে গিয়ে বহু বছর দেশে ফেরা হয়নি তার। মায়া-মমতায় জড়ানো এ দেশটাকে ছেড়ে স্বপ্নের বাগান গড়তে ছুটে গিয়েছেন প্রবাসে। আসলেই কী ওই প্রবাসীর স্বপ্নের সারথি আজও কেউ হয়েছে?

 

অনেক বন্ধুই এখন আর তার সাথে যোগাযোগ করেন না। আবদার যে মেটাতে পারেননি! এমনকি অনেক আত্মীয়-স্বজনরা দিন-রাত গালাগালি করেন। কিন্তু সে মানুষটা ভাল আছে কী না সে খবরটা আদৌ কেউ জানতে চায়নি।

 

একমাসে টাকা না পাঠালে স্ত্রী, সন্তানদের অভিমান চরমে। বেতন পেয়েছে কি না সে খবরটা নেয় না, প্রয়োজনে ধার করে হলেও পাঠাতে হবে টাকা তাদের। ছেলে, সন্তান পরিজন সবাই মিলে দেশে ফুর্তিতে থাকলেও বিদেশের মাটিতে (ছদ্মনাম) রমজান আলী আছেন বহু কষ্টে।

 

শুধু কী বিদেশেই কষ্ট? না এবার দেশের কষ্টের পথে আসা যাক। এক দশক পর দেশের মাটিতে পা রেখেছেন তিনি। লাগেজ ভর্তি মালামাল। এয়ারপোর্ট এর ঝক্কি-ঝামেলা সামলে বাড়ি ফেরার পালা। সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন, কী এনেছেন তিনি! কেউই জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছে!

 

বাড়ি ফেরার পর সকলের চাহিদা অনুযায়ী জিনিসপত্র পৌঁছে দিয়ে শূন্য লাগেজটাকেই সঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন তিনি। বুক ফেটে কান্না রোল উঠবে, কিন্তু লোক লজ্জার ভয়ে কান্না যে করতে পারছেন না তিনি।

 

কত লোকে যে ভিড় জমাবে। আসলেই কী তিনি দাতা হয়ে গেছেন? তিনি বিদেশ করছেন বলে কী মহাকাশটা কিনে ফেলেছেন? এমন প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খায় তার মনে। কিন্তু সমাজের কাছে ছোট না হতে চাইলে তো আবদার যেভাবেই হোক মেটাতে হবে।

 

সবাই শুধু দেখা হলেই তাকে জিজ্ঞেস করে কবে আবার ফিরবে বিদেশের মাটিতে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন তিনি। যে মাটির টানে বহু বছর পর দেশে ফিরেছেন। আলো-বাতাসে নিজের দেহটাকে ভাসিয়েছেন। যে দেশটার জন্য হাজার হাজার টাকা রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছেন। সে দেশের লোকেরাই কিনা তাকে বলছে, এ দেশ ছেড়ে কবে যাবে ভিনদেশে। তিনি যেতে চান না, একথা সবাই অগ্রাহ্য করলেও ঠিক একজন করেন না। তিনি মা। মা বলে বাবা তোর আর বিদেশ যাওয়ার দরকার নেই। তুই দেশেই থেকে যা। সবাই স্বার্থপর হলেও তিনি হননি।

 

এবার আরেক তরুণের গল্প শোনা যাক। আবদুর রহিম(ছদ্মনাম)। দেশে চাকরি না পেয়ে গিয়েছেন প্রবাসে। টাকা কামাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু এতে নেই কোন তৃপ্তি। ঘরের বড় বলে সমস্ত টাকা সংসারের পেছনেই ব্যয় করছেন। দেখতে দেখতে ৮ বছর হয়ে গেলো প্রবাস জীবন। দেশে থাকতে ভালবাসতেন গ্রামের নীলা আক্তার (ছদ্মনাম) নামে এক তরুণীকে। স্বপ্নকে সাজাতে গিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন দূর প্রবাসে। কে জানতো ভালবাসা এতটা নিষ্ঠুর। যাওয়ার ক'মাসের মধ্যেই ভাল ঘরে বিয়ে হয়ে যায় নীলার। দেশে ফিরে দেখা করতে চান তার সাথে। পরিবার-পরিজন সকলেরই চাহিদা মিটিয়ে নিজের জীবনটা শুধু শূন্যের খাতায়ই রেখে দিয়েছেন তিনি। বুক ফাটা আর্তনাদ, যেন দেখার কেউ নেই। প্রবাস জীবনে কষ্টের কথা কাউকে না বললেও এবার মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন আর যাবেন না বিদেশে। ঐদিকে এ খবর পরিবারে জানাজানি হলে শুধু মা-ই বারবার বলছিলো, থেকে গেলে হয় না বাবা। একমাত্র জগত জননী চায় ছেলে দেশে থাকুক, মায়ের কোলে থাকুক। অন্যদিকে স্বার্থপর দুনিয়ার মানুষগুলো নিজেদের স্বার্থের জন্য অন্যকে দূরে ঠেলে দিতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভাই,বোন,বাবা,বন্ধুবান্ধব সবাই যেন শুধু দিতে পারলেই খুশি।

 

ওই ছেলেটার মনের অবস্থা কেউই বুঝতে চাইলো না। প্রবাসীদের যেন স্বপ্ন থাকতে নেই। জীবন-যৌবন টাকার পিছনে ছুটে বড় ক্লান্ত তারা। নিজ দেশে, নিজ মাটিতে এসে একটু শান্তির পরশ আঁকবে সেখানেও বাঁধা। দুনিয়াটা যেন মস্তবড় স্বার্থপরের কারখানা হয়ে গেছে। এখানে শুধু স্বার্থপরদেরই বসবাস।

 

বছরে দু'বার ঈদ আসলেও সে ঈদটা যেন বিষাদময় হয় প্রবাসীদের। নিজ আত্মীয়-স্বজন, পরিবার পরিজনকে রেখে ঈদ উদযাপন করাটা খুবই কষ্টের। কিন্তু তারা কী এটা বুঝে? রোজা অর্ধেক গেলেই তো পরিবারের লোকজন মার্কেটিং এর টাকা পাঠানোর জন্য গরমা-গরমি দিতে থাকেন। কিন্তু রোজা থেকেও যে প্রচণ্ড তাপদাহে কাজ করছেন সে চিন্তাটা কটা পরিবারই বা করে! প্রবাসী মানুষগুলো দিনের পর দিন শুধু খেঁটেই যাচ্ছে, বিনিময় শুধু লাঞ্ছনা আর বঞ্চনাই পাচ্ছে।

 

অতঃপর প্রবাসীরা ভাল থাকুক। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সেই আমাদের অর্থনীতির চাকা হয় বেগবান। আমরা সমৃদ্ধির পথে এগুচ্ছি। সম্মান করা উচিত সকল প্রবাসী ভাইদের। আর কোন প্রবাসী ভাই যেন দুশ্চিন্তা করে বিদেশের মাটিতে প্রাণ না হারায় সেই কামনা। ভাল থাকুক প্রবাসীরা।

 

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডএইচ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত