ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮, ২ শ্রাবণ ১৪২৫ অাপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:০০

প্রিন্ট

‘বেশিরভাগ শিল্পী অনুষ্ঠানের কনসেপ্ট সম্পর্কে জানতে চান না, সম্মানি নিয়ে ভাবেন’

‘বেশিরভাগ শিল্পী অনুষ্ঠানের কনসেপ্ট সম্পর্কে জানতে চান না, সম্মানি নিয়ে ভাবেন’
কামরুল ইসলাম

সৈকত সালাহউদ্দিন। শোবিজ অঙ্গনের অনেক পরিচিত একটি মুখ। বিনোদন সাংবাদিকতায় সাফল্যের পাশাপাশি যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল উপস্থাপক, টেলিভিশন কর্মকর্তা, আর জে ও গণমাধ্যম পরামর্শক হিসেবে। টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় তার দীর্ঘ দিনের পথচলা। ‘নয় থাকলে আরও কিছুক্ষণ’, ‘ফ্রাইডে স্টারস’, ‘সুপার স্টার’, ‘পিপলস স্টার’-এর মতো জনপ্রিয় শো তিনি উপহার দিয়েছেন। এছাড়া সৈকত সালাহউদ্দিন জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘মুভি বাজার’-এর ১৪৯টি পর্বের পরিকল্পক ও সঞ্চালক ছিলেন। যেটাকে বলা হয়ে থাকে চলচ্চিত্র বিষয়ক অন্যতম দর্শকপ্রিয় ও সফল অনুষ্ঠান। বর্তমানে সৈকত সালাহউদ্দিন ‘বিহাইন্ড দ্য স্টোরি’ ও ‘মুভি টাইম উইথ সৈকত সালাহউদ্দিন’ নামের দুটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন। এছাড়াও বাংলাদেশের সিনেমার আন্তর্জাতিক পরিবেশক স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো’র বাংলাদেশ বিভাগের প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং প্রেজেন্টার্স প্ল্যাটফর্ম অব বাংলাদেশ’র কার্যনির্বাহী পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসবে দায়িত্ব পালন করছেন।

চলচ্চিত্র ও টিভি অনুষ্ঠান নিয়ে সৈকত সালাহউদ্দিনের অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক ভারি। তাই বর্তমান চলচ্চিত্রের বাজার, টিভি অনুষ্ঠান ও তার সঞ্চালনার অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানার জন্য বাংলাদেশ জার্নাল হাজির হয়েছে তার কাছে। বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন তার পথচলার হালচাল। লিখেছেন কামরুল ইসলাম।

একসঙ্গে দুটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন। কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: ‘মুভি বাজার’-এর পর তো অনেক দিনের একটা বিরতি নিলাম। তাছাড়া দুটি অনুষ্ঠানই তো নতুন। দর্শক-শ্রোতার কথা ভেবে খানিকটা ভিন্নতা রাখার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে সন্তোষজনক সাড়া পাচ্ছি। আশা করি ধীরে ধীরে আরও জমে উঠবে।

'বিহাইন্ড দ্য স্টোরি' অনুষ্ঠানের সেটে সৈকত সালাহউদ্দিন ও তারকারা 

দুটি অনুষ্ঠানের মধ্যে তফাৎ কেমন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: ‘বিহাইন্ড দ্য স্টোরি’ হচ্ছে বিনোদন অনুসন্ধানীমূলক অনুষ্ঠান। অর্থাৎ বিনোদনের অন্তরালের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। বিষয়টাকে আমরা এভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছি যে, ঘটনাগুলো আপনার চোখে একরকম, আমার চোখে একরকম, কিন্তু ঘটনাটা হয়ত অন্যরকম। তো এই বিষয়গুলো খুঁজে বের করার প্রয়াস অনুষ্ঠানটিতে থাকছে। এটা প্রতি শুক্রবার রাত ৯টা ৩০ মিনিটে একুশে টিভিতে প্রচার হচ্ছে। অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করছেন এনামুল হক। আর ‘মুভি টাইম উইথ সৈকত সালাহউদ্দিন’ তো রেডিও অনুষ্ঠান। রেডিওতে চলচ্চিত্রের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান এটাই প্রথম। রেডিও টুডে’র দশটি স্টেশনের মাধ্যমে একসঙ্গে প্রায় ১২ কোটি শ্রোতার কাছে চলচ্চিত্রের খবর পৌঁছে দিচ্ছি। এখানে শ্রোতারা নানান প্রশ্ন করতে পারেন, আমি উত্তর দিই। তারকারা স্টুডিওতে আসেন আবার ফোনের মাধ্যমেও সংযুক্ত হন। এই অনুষ্ঠান প্রতি শুক্রবার বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রেডিও টুডে’তে সরাসরি প্রচার হয়। এটা প্রযোজনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন টুটুল জহিরুল হক। এগুলোর মাধ্যমে সমাজের কাছে আমাদের মিডিয়াকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারছি, এটাই বড় ব্যাপার।

মুভি বাজার’-এর অভাব কি এই দুই অনুষ্ঠানে পূরণ হচ্ছে?

সৈকত সালাহউদ্দিন: আসলে ‘মুভি বাজার’ অনুষ্ঠানের কনসেপ্টটা একদম অন্যরকম ছিলো। ওখানে আমরা শুধুমাত্র চলচ্চিত্রের বাজার নিয়ে বিশ্লেষণ করতাম। তবে ওটার সঙ্গে এখনকার ‘মুভি টাইম উইথ সৈকত সালাহউদ্দিন’ অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া চলচ্চিত্রের বাজার বড় হয়েছে। এটা নিয়ে নতুন নতুন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব পাচ্ছি। নতুন বছরে আশা করি আরও কিছু চমক দিতে পারবো।

'মুভি টাইম উইথ সৈকত সালাহউদ্দিন' 

সম্প্রতি কয়েকটি টিভি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে চাই, সমালোচনাটা আসলে কারা করছেন? নিশ্চয়ই শোবিজের মানুষরাই করছেন। আবার শোবিজের মানুষরাই কিন্তু এই অনুষ্ঠানগুলোতে যাচ্ছেন। হ্যাঁ একটা কথা সত্য যে, ভালো কনসেপ্টের অভাব রয়েছে। তবে আমি সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, বেশিরভাগ শিল্পীরা অনুষ্ঠানের কনসেপ্ট সম্পর্কে জানতে চান না, সম্মানি নিয়ে ভাবেন। খুব কম সংখ্যক শিল্পী আছেন, যারা অনুষ্ঠানের কনসেপ্ট সম্পর্কে জানতে চান। মিডিয়া বা টিভি শো’গুলো হচ্ছে ভাবমূর্তি তৈরির জায়গা। অর্থটা এখানে মুখ্য না। যখনই অর্থটাকে মুখ্য বিষয় করে ফেলেন তারা, তখনই কিছুটা বিপত্তি ঘটে। তাছাড়া কোনও সঞ্চালক তার অনুষ্ঠানে কাউকে জোর করে তো নিয়ে যান না। তারকাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, তারা বুঝে-শুনেই আসেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পর যদি সমালোচনা করেন কেউ, তাহলে তো ব্যাপারটা দ্বিমুখী আচরণ হয়ে গেলো। তাই তারকাদের উচিৎ কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে সে অনুষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেয়া।

একজন সিনিয়র সাংবাদিক এবং সিনেমার বাজার বিশ্লেষক হিসেবে সিনেমার বর্তমান বাজার নিয়ে কী বলবেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: আসলে আমাদের সিনেমার বাজার বর্তমানে একটা রূপান্তর পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের সিনেমার বাজারটা অনেক বড় হবে, সেটার ঠিক আগের মুহূর্তটায় আছি আমরা। সুতরাং এই সময়টাকে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর নির্ভর করবে আমাদের বাজার কতো বড় হবে। যেমন এবার ‘ঢাকা অ্যাটাক’ দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের বাজারেও অনেক টাকা আছে। আবার স্বপ্ন স্কেয়ারক্রোর মাধ্যমে বিদেশেও আমরা দেখিয়েছি যে, ‘ঢাকা অ্যাটাক’র মতো ছবির টাকা আছে। এছাড়া ‘হালদা’র মতো একটা ছবি আন্তর্জাতিক বাজারে গিয়ে রেকর্ড সংখ্যক শো পাচ্ছে। এটা তো বিশাল ব্যাপার। তো আমার মনে হয়, আমরা দেশে ২-৩ কোটি টাকার বাজার নিয়ে কথা বলি, আর দেশের বাইরেও এর থেকে দুই-তিন গুন বড় বাজার তৈরি হতে যাচ্ছে। সুতরাং এই সময়টাতে আমাদের খুব সচেতন থাকতে হবে।

সিনেমার বাজার সম্প্রসারণে সিনেমার লোকদের কী করা উচিৎ বলে মনে করেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: যেহতু আমরা ট্রানজেশন পিরিয়ডে আছি, তাই সিনেমার মানুষদের উচিৎ, কাদা ছোঁড়াছুড়ি না করে মিলেমিশে ভালো কাজ করা। নির্মাতা, প্রযোজক, স্পন্সর কিংবা যারা টিভি ও রেডিও অনুষ্ঠানগুলো করছেন, কেউ কাউকে বাধা না দিয়ে সবার উচিৎ একসঙ্গে কাজ করা। আমার মতে, সব ধরণের সিনেমা হওয়া উচিৎ। শুধু মাত্র জীবনঘনিষ্ঠ গল্প নিয়েই কেন সিনেমা হতে হবে? বহির্বিশ্বের ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে কত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে সিনেমা নির্মাণ হয়। সব ধরণের সিনেমা নির্মাণ হোক। তার মধ্য থেকে দর্শক তার পছন্দমতো সিনেমা গ্রহণ করে নেবেন।

আমাদের চলচ্চিত্রের সঙ্গে ‘মানহীন’, ‘অশ্লীলতা’, ‘গল্পের অভাব’- এই শব্দগুলো অনেক দিন ধরেই জড়িয়ে আছে। এগুলো এড়ানো যাচ্ছে না কেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: আসলে সিনেমার সমস্যাগুলো নিয়ে এতো দিন সিনেমার মানুষরাই ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করে আসছেন। উল্লেখযোগ্য কোনও পৃষ্ঠপোষকতা কিন্তু ছিলো না। ২০০০ সালের দিকে যখন বেশ কয়েকজন শিল্পী অভিনয় থেকে সরে গেলেন, তখন একটা বড় শিল্পী সংকট দেখা দেয়। প্রযোজকরা দিশা পাচ্ছিলেন না। ঠিক তখনই অশ্লীল সিনেমার জোয়ার আসে। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে, সেই সময় অনেক বড় বড় শিল্পীরাও দূরে সরে যান। অথচ তারা চেষ্টা করলে প্রেক্ষাপট আরও ভালো হতে পারতো। আর নকল নিয়ে যদি বলতে হয়, তাহলে বলবো বলিউডেও প্রচুর নকল সিনেমা হয়। পার্থক্য একটাই, তারা নকল করার সময় বলে দেয় অমুক ছবির রিমেক বা ইম্প্রোভাইজেশন। কিন্তু আমাদের নির্মাতা-প্রযোজকরা সেটা স্বীকার করেন না। এই অস্বীকার করার কারণেই সমালোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

দেশের সিনেমার বাজারের ক্ষেত্রে যৌথ প্রযোজনার প্রভাব কেমন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: যৌথ প্রযোজনা অবশ্যই সিনেমার জন্য ভালো। যেটা বলা হয়ে থাকে যে, দুই দেশের লগ্নি, শিল্পী, বাজার। সবমিলে বড় ধরণের আয়োজন সম্ভব হয়। কিন্তু আদতে যেই যৌথ প্রযোজনা হচ্ছে, সেটা আসলে কতটা ফলপ্রসূ এটা প্রশ্নবিদ্ধ।

সিনেমার জন্য সাফটা চুক্তি নিয়ে কী বলবেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: এক বাক্যে আমি এই চুক্তির ঘোর বিরোধী। এই চুক্তির মাধ্যমে কোনও ভালো কিছু আশা করা যায় না। বরং দেশের সিনেমার বাজার নষ্ট হচ্ছে।

কয়েক বছর ধরেই সিনেমা নির্মাণের পরিমাণ কমছে। অন্যদিকে সিনেমার বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বিষয়টা কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: সিনেমা নির্মাণের পরিমাণ কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ, ব্যবসা না হওয়া। অর্থাৎ প্রযোজক তার লগ্নি ফেরত পাচ্ছেন না। এখন ২০১৭ সালের প্রেক্ষাপটে যদি বলি, এ বছর কিন্তু দর্শক বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা কী চায়, আমাদের ট্রেন্ড কী হওয়া উচিৎ। দর্শক ‘ঢাকা অ্যাটাক’র মতো ছবি গ্রহণ করছেন আবার ‘দুলাভাই জিন্দাবাদ’ গ্রহণ করছেন না। সুতরাং এটা থেকেই বোঝা যায়, তারা কী ধরণের ছবি চাচ্ছেন। তাই দর্শকের কথা বিবেচনা করে তবেই সিনেমা নির্মাণ করা উচিৎ।

এবার একটু ‘স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো’ প্রসঙ্গে আসি। বিদেশের বাজারে যে আপনারা সিনেমা পরিবেশনা করছেন, এটার প্রক্রিয়াটা কেমন?

সৈকত সালাহউদ্দিন: এক্ষেত্রে একটু শুরু থেকে বলি। আমি নিজেই নব্বই দশক থেকে শুনে আসছি যে, সিনেমার বাজার বড় করতে হবে। সবাই কেবল মুখে মুখে বলেই এসেছে। এমনকি আমাদের দূতাবাসগুলোও এ ব্যাপারে উদাসীন। অর্থাৎ ঘন্টাটা আসলে কেউ বাঁধেনি। তবে আমাদের ‘স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো’র প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ অলিউল্লাহ সজীব সেই ঘন্টাটা বেঁধেছেন। প্রায় সাড়ে তিন বছর চেষ্টা করে তিনি কানাডার বাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এরপর ধীরে ধীরে বাজারটা বড় করছেন। আমাদের ‘স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো’র যেটা সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য বা বাংলাদেশের জন্য যেটা গর্বের বিষয় সেটা হচ্ছে, আমরা আন্তর্জাতিক চেইনে অফিশিয়ালি সিনেমা রিলিজ দিচ্ছি। যেভাবে হলিউড-বলিউডের সিনেমাগুলো রিলিজ হয়। কানাডা, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমরা এরই মধ্যে বেশ ভালো সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের জন্য প্রায় ১৪ হাজার স্ক্রিনে সিনেমা রিলিজ দেয়ার সুযোগ আছে। এজন্য কেবল ভালো মানের সিনেমা নির্মাণ আর দর্শকের সহযোগিতা প্রয়োজন।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।

সৈকত সালাহউদ্দিন: আপনাকে এবং বাংলাদেশ জার্নালকেও ধন্যবাদ।  

কেআই/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত