ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:১৮

প্রিন্ট

‘দেবী’ চলচ্চিত্রের রিভিউ

অনম বিশ্বাসকে টুপি খোলা অভিবাদন

অনম বিশ্বাসকে টুপি খোলা অভিবাদন
রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ

ভালো গল্প খারাপ নির্মাতার হাতে পড়লে যেমন নিম্নমানের সিনেমা পয়দা হয় আবার খারাপ গল্প ভালো নির্মাতার হাতে পড়লে সেটা হয়ে উঠতে পারে মাইলফলক। (বিধান রিবেরু, চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা ২০১১:৯০)

যে কোনো সিনেমা দেখার পর সেটা নিয়ে লেখা বেশ চাপের কাজ। একজন নির্মাতা তার নিজস্ব চিন্তাধারা থেকে সিনেমা বানান। লেখককে সেই চিন্তাধারা গভীরে প্রবেশ করে সুক্ষ্ম পর্যালোচনা করে লিখতে হয়। অনেকসময় সেই লেখা সংশ্লিষ্টদের মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার সিনেমা ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবুও এসব সম্ভাবনার উর্ধ্বে গিয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে গঠনমূলক সমালোচনা করাটাই চলচ্চিত্র সমালোচকের নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলা সিনেমা নিয়ে উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ খুব কম আসে সিনেমাপ্রেমীদের জন্য। দীর্ঘ বিরতির পর মানুষ ‘দেবী’ সিনেমা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। এর কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত, এটি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। দ্বিতীয়ত, সিনেমার ভিন্নমাত্রার চমক লাগানো প্রচারণা।

প্রচারণা দর্শকের মধ্যে সিনেমা দেখার প্রাথমিক আগ্রহ তৈরী করে দেয়। তাই দর্শক টানতে প্রচারণার বিকল্প কিছু নেই। প্রযোজক জয়া আহসান সেটা জানেন বলে এতো প্রচারণা। জয়া গত কয়েকবছর ধরে কলকাতার সিনেমায় সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। অল্প সময়ে সেখানকার প্রথম সারির অভিনেত্রীদের মধ্যে নিজের নাম লিখিয়েছেন। তিনি সেখানে দেখেছেন, কিভাবে সিনেমার প্রচারণা করতে হয়! কিভাবে সিনেমা নিয়ে দর্শকের কানের কাছে গিয়ে বলতে হয়, সিনেমাটি দেখবেন কিন্তু! তা তিনি দেখি দিয়েছেন!

এবার ‘দেবী’ সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সিনেমার কাহিনীর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে চাইনা। শুধু সিনেমার বস্তুগত বিষয় নিয়ে লিখতে চাই। উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় গল্প কিছুটা এদিক সেদিক হয়। তাই উপন্যাসে কি ছিল, সিনেমায় কোন দিকটি মেলেনি- এসব এড়িয়ে যাওয়া শ্রেয় বলে মনে করছি।

প্রায় পৌনে দুই ঘন্টার সিনেমার ৯৫ শতাংশ পর্দায় উপস্থিতি ছিল জয়া আহসানের। তার চরিত্রকে এগিয়ে নিতে সৃষ্টি হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি চরিত্র। মূলত জয়া আহসানকে কেন্দ্র করেই সিনেমার গল্পের ডাল পালা গজিয়েছে। অভিনেত্রী হিসেবে জয়া আহসান মেধাবি। যেকোনো ধরনের চরিত্রে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন সহসাই। ‘দেবী’তেও তিনি নিজেকে প্রচলিত চরিত্রের বাইরে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। নিজেকে ভেঙে প্যারাসাইকোলজিক্যাল চরিত্র রানুকে সপে দিয়েছেন।

রানু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন বিবাহিতা নারী। ছোটবেলার একটি ঘটনার পর তার জীবনে অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন। ছাপোষা একজন চাকুরিজীবির স্ত্রীর চরিত্রে জয়া আহসান মানিয়ে গিয়েছেন ভালোভাবে। মাড় দেয়া শাড়ি পরা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর গোছানো খোলা চুলে তিনি গৃহবধুর প্রতিরুপে ধরা দিয়েছেন।

আগেই বলে রেখেছি জয়া আহসান ভালো অভিনেত্রী, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও ভালোরও রকমফের আছে। পরিমান আছে। জয়া এই ছবিতে কতটা ভালো অভিনয় করেছেন? যতটা ভালো অভিনয় করার প্রয়োজন ততটা করেছেন! নিলুকে গাড়িতে চমকে দেয়ার সংলাপ- ‘আজকে গাড়িতে কোথাও যাবেন না প্লিজ’ ভালো লেগেছে। তবে সবথেকে তিনি বেশি ভালো করেছে অতিপ্রাকৃত দৃশ্যের সময়। এর বাইরে স্বাভাবিক কথা বলা দৃশ্যের সময় চিরচেনা জয়াকে দেখা গিয়েছে। অন্য নাটক বা সিনেমায় যেমনটা দেখা যায়। চরিত্র যদি এমনটা ডিমান্ড করে তাহলে ঠিক আছে। নতুবা আরও একটু ভালো চেষ্টা করা যেতে পারত। তিনি যেহেতু সব বলে দিতে পারেন সেহেতু তার বলার ধরন আর শারিরীক ভাষা আরও একটু রহস্যাবৃত করতে পারলে নেহায়েত মন্দ হতনা। সবমিলিয়ে তার অভিনয় বৈচিত্র্যে ঠাঁসা।

সিনেমার বড় আকর্ষনের জায়গা ছিল মিসির আলীরুপী চঞ্চল চৌধুরী। তাকেই সিনেমার নামের ব্র্যান্ড করা হয়েছে। ট্যাগ লাইনে যুক্ত করা হয়েছে- ‘মিসির আলী প্রথমবার’। অথচ পুরো সিনেমাতে মিসির আলী যেনো পাত্তাই পায়নি রানুর কাছে। মিসির আলী একজন অসম্ভব যুক্তিবাদি মানুষ। সিনেমায় তিনি যেন কোন যুক্তির ধারে কাছে ঘেঁষলেন না। যেসব দৃশ্যে চঞ্চল চৌধুরী আবির্ভূত হয়েছেন সেসব দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে কেবল দৈর্ঘ্য বাড়ানোর জন্যই মিসির আলী চরিত্রকে রাখা হয়েছে। কেনো ছবিতে তার চরিত্রটিকে প্রতিষ্ঠিত করা হলো না বোধগম্য নয়।

যুক্তি তক্কে বুদ হওয়ার নেশায় অনেক দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়েছিলেন। পর্দায় তার প্রতিফলন দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। মিসির আলীকে কেবল সংলাপেই আটকে রাখা হয়েছে। কিছু সময় পর পর তিনি কেবল সংলাপ বলে চলে গিয়েছেন। এমনকি প্রথম দিকে গলায় ঝুলানো নোকিয়া ১১০০ মডেলের মোবাইল সেটও পরে পরিবর্তন হয়ে যায়। এধরণের অসঙ্গতি চোখে লাগে। দৃশ্যধারণের সময় খেয়াল করা উচিত ছিল।

দিয়াশলাইয়ে এক ঘঁষাতে সবাই আগুন জ্বালাতে পারেনা। কারও কারও একাধিক ঘঁষার প্রয়োজন হয়। প্রথমবারের মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন শবনম ফারিয়া। টেলিভিশন নাটকে তিনি জনপ্রিয় অভিনেত্রী। সিনেমাতে তাই তাকে নিয় আগ্রহ ছিল। ভালোকিছু প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা যে আকাশ সমান ছিল তা নয়। তিনি যেসব দৃশ্যে হাজির হয়েছেন তাতে খুব একটা অভিনয় দেখানোর কিছু ছিল না। শুধুমাত্র শেষ দৃশ্য ছাড়া। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ের চরিত্র হিসেবে তিনি ঠিকঠাক অভিনয় করেছেন। গাড়িতে চমকে ওঠার দৃশ্য ভালো হয়েছে। আবার কখনো কখনো অতি মুখভঙ্গি দেখিয়েছেন। শেষ দৃশ্যে তাকে সাইকোর মেরে ফেলার চেষ্টা। তারপর তার শরীরে দৈব শক্তির আগমন- এসময়ে আরও অভিনয়ের সুযোগ ছিল। দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার চেষ্টা করতেই পারতেন। দিয়াশলাইয়ে আগুন জ্বালাতে আরও কয়েক ঘঁষার প্রয়োজন হবে তার।

রানুর স্বামী চরিত্রে অনিমেষ আইচ ও সাইকো চরিত্রে ইরেশ জাকের ভালো করেছেন। বিশেষ করে ইরেশ জাকেরের কথা বলতে হয়। পর্দায় তার আচমকা আগমন দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে। সাইকো চরিত্রে তার হিংস্রতা দেখে দর্শক ভয় পেয়েছে। একজন সাইকোর চরিত্র সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে তিনি পারদর্শীতা দেখিয়েছেন।

এই সিনেমার অলংকার ছিল ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক আর ভিএফক্সের কাজ। দৃশ্য অনুযায়ী ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক মানানসই মনে হয়েছে। অতিপ্রাকৃত বস্তুর আগমনের সময় যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার ভয় ধরিয়ে দিতে যথেষ্ট। অন্যদিকে ভিএফএক্সের কাজ আহামরি না হলেও ভালো হয়েছে। কিছুটা ধীরগতির মনে হয়েছে। তাতে মনযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়েছে বটে, তবে পরবর্তীতে পুনরায় মনযোগী হতে সমস্যা হয়নি।

‘প্রোডাক্ট রিপ্লেসমেন্ট’ বা ‘পণ্য প্রতিস্থাপন’ বাংলাদেশের সিনেমার জন্য নতুন কিছু নয়। গত কয়েকবছর ধরে সিনেমায় কৌশলে পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এমনটা অহরহ দেখা যায়। এতে করে প্রযোজক লাভবান হয়। বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার মানে হয়না। পুঁজিবাদের কাছে সপে দেয়াটাই সবথেকে বুদ্ধিমানের কাজ এখন।

অনম বিশ্বাসের প্রথম সিনেমা ‘দেবী’। প্রথম সিনেমাতেই তিনি শতভাগ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে পেরেছেন কিনা সেটা সময় বলে দেবে। তিনি আশা জাগিয়েছেন। সিনেমায় সেরকম কোনো উল্লেখ করা মতো ফ্রেমিং ছিলনা। যদিও তাতে দৃষ্টিকটু মনে হয়নি। কোনো পরিচালক যদি তার সিনেমায় চোখ ধাঁধানো কিছু ফ্রেমিং করতে পারেন তাহলে শিক্ষানবিশ পরিচালকদের জন্য শিক্ষনীয় হয়ে থাকে। সাধারণ দর্শক ফ্রেমিং বোঝেনা। যেভাবেই ফ্রেমিং করা হোকনা কেন তারা ফ্রেম দেখেনা, দেখে সিনেমা।

প্রথম সিনেমায় অনম বিশ্বাস ‘এ প্লাস’ পেয়ে পাশ করেছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই। নতুন আসা নির্মাতার কিছু ভুল ভ্রান্তি থাকতেই পারে। সেগুলো সামনে সিনেমায় হয়ত তিনি শুধরে নেবেন। তাই দাঁতভাঙা সমালোচনা করা সমিচীন হবেনা। তাকে আরও সুযোগ দিতে হবে। আমি বলব ভাল গল্প ভালো নির্মাতার হাতে পড়েছে। তাই সিনেমাটি মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে।

দিন গড়ানোর সাথে সাথে অনম বিশ্বাস তার প্রথম সন্তানের জন্য প্রশংসায় ভাসবেন বলে আমার বিশ্বাস। গান ভালোবাসা অনম বিশ্বাস সিনেমা বানিয়েছেন। সেজন্য তিনি টুপি খোলা অভিবাদন পেতেই পারেন।

লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত