ঢাকা, শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ অাপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:৩৫

প্রিন্ট

ভারতের অ্যাম্বুলেন্স দাদা

অনলাইন ডেস্ক

১৯৯১ সালের গ্রীস্মের এক রাত। কাজ থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে সবে খেতে বসেছেন চা বাগানের শ্রমিক করিমুল হক। এ সময় তার ১০ বছরের ভাইপো দৌড়ে এসে জানায়, তার দাদি অজ্ঞান হয়ে গেছেন। খাওয়া ফেলে ছুটে যান করিমুল। দেখেন মেঝেতে পরে আছেন তার মা। এরপর কেটে যায় আরো সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। কিন্তু সেদিন ৪৫ বছর বয়সী মাকে আর হাসপাতালে নেয়া হয়নি তার। সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করার মত টাকা ছিলো না। আমি প্রতিবেশীদের প্রতিটি দরজায় কড়া নেড়েছি। তাদের কাছে আমার মাকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য অর্থ ভিক্ষা করছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। কেউ আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।’

সেদিন বিনা চিকিৎসাতেই মারা যান তার মা জাফরান নেসা। অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেননি এই মনোকষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো করিমুলকে। এরপর তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, হাসপাতালে নেয়ার অভাবে যেন মারা না যায় ধলাবাড়ি এলাকার একটিও মানুষ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি জেলার এই ধলাপুর এলাকারই বাসিন্দা কারিমুল। 

অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে একটি মোটরসাইকেল কেনেন কারিমুল। সেটিকেই অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে প্রায় আশপাশের ২০ গ্রামের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তিনি। যখনই কারও অসুস্থতার খবর পেয়েছেন, তখনই চা-শ্রমিকের কাজ ফেলে সেই রোগীকে নিজের মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। 

চা বাগানে কাজ করে দৈনিক মাত্র ১.৮০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড়শ’টাকা) আয় করে সেখানকার শ্রমিকরা। অবশ্য এই টাকা আয় করার জন্য রোজ এক একজনকে ২৪ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। তাই তাদের পক্ষে চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য হাসাপাতালে যাওয়াটা তো একটা বিলাসিতা। কিন্তু তাদের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়াটা সহজ করে দিয়েছে করিমুল। বিনা পয়সায় তাদের চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যান। তার সেবার কারণে এ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচেছেন ৪ হাজারের বেশি মানুষ। এই কাজের স্বীকৃতিও পাচ্ছেন করিমুল। তার ছোট্ট ঘরটা ভরা পুরস্কার আর সার্টিফিকেটে। চলতি বছরের গোড়ার দিকে পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ বেসরকারি পুরস্কার পদ্মশ্রী।

তার এই সেবাকর্মে খুশি তার চাবাগানের মালিকও। তিনি তাকে অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। আর যেদিন তিনি কাজে ব্যস্ত থাকেন সেদিন তার দুই ছেলে রাজু আর রাজেশ অসুস্থদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেন। তবে শুধু লোকজনকে হাসপাতালে পেঁছে দিয়েই সুখী নন করিমুল। তার স্বপ্ন, ‘আমি আমার বাড়ির বাইরে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলতে চাই। যাতে চিকিৎসার জন্য লোকজনকে আর দূরে যেতে না হয়। নিজের জীবদ্দশায় এই স্বপ্ন যদি পূরণ করতে না পারি তবে আমার দুই ছেলে তা করবে।’

গত ২৬ বছর ধরে নিজের মোটর সাইকেলে করে লোকজনকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার কাজ করছেন তিনি। প্রায় ২৪ ঘণ্টাই নিজের মোটরসাইকেলে আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামের দরিদ্র রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স-সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ৫২ বছর বয়সী কারিমুল। দিন নেই রাত নেই যখনই কেউ অসুস্থ হয়, তখনই ডাক পড়ে তার। এই কাজে তার কোনো আলস্যি নেই। এজন্যই সবাই তাকে ডাকে ‘অ্যাম্বুলেন্স দাদা’। তিনি এখন এতটাই বিখ্যাত যে তাঁর ওপর ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা। 

সূত্র: আল জাজিরা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত