ঢাকা, শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ অাপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৯:৪৭

প্রিন্ট

শুক্রাণু ‘পাচারকারীরা’!

প্রতীকী ছবি
জার্নাল ডেস্ক

‘আমার ইচ্ছা তার সন্তানকে বড় করে তোলা এবং দেখভালের জন্য তিনি এখন আমাদের সঙ্গে এসে থাকুন’, বলছিলেন ইসরায়েলের কারাগারে ২২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দি ফাহমি আবু সালাহ’র স্ত্রী মে। মে-এর মতে, ‘এটা হবে সবচেয়ে বড় সুখকর অনুভূতি।’

মে এবং ফাহমি দম্পতির সন্তান আসাদের জন্ম ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (পুরুষের সরাসরি অংশগ্রহন ছাড়াই সন্তান জন্মদান পদ্ধতি) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। জেল থেকে ফাহমি’র শুক্রাণু গাজা উপত্যকার একটি হাসপাতালে ‘চোরাচালান’ হয়ে এলেই জন্মগ্রহন প্রক্রিয়া শুরু হয় তার সন্তান আসাদের। আসাদ হল সেই ৩২ ফিলিস্তিনি শিশুর মধ্যে একজন, যাদের জন্মদাতা কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেই তাদের শুরু হয়েছিল জন্মদান প্রক্রিয়া।

আসলে একজন কারাবন্দি তার স্ত্রী-কে কী নিশ্চয়তা দিতে পারেন? এই শুক্রাণু পাচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা আসলে নিশ্চিত হতে চান যে, স্ত্রী তাকে ছেড়ে যাবেন না। আর এভাবে স্ত্রী-ও নিরাপদ থাকবেন আর কোনো না কোনো উপায়ে তাদের জীবন পার হয়ে যাবে।

এভাবে ইসরায়েলি কারাগার থেকে পাচার হয়ে আসা শুক্রাণুর মাধ্যমে জন্ম নেয়া সন্তানকে আসলে বিবেচনা করা হয় আশার প্রতীক হিসেবে। পাশাপাশি সেই সন্তান বিবেচ্য হয় ফিলিস্তিনি বন্দি, তাদের স্ত্রী এবং পরিবারের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদ হিসেবে।

এমনই একজন বন্দির নাম রওহি মুশতাহা। ২০০৪ সালে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি থাকার সময়ে তার মাথায়ই প্রথম নিজের শুক্রাণু পাচার করার বুদ্ধির উদয় হয়। তার ভাষায়, ‘প্রথমে পরিবারকে বিষয়টি বোঝানো আমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে হয়েছিল। বন্দিরাই সহজে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাজি হতে চাইত না, তাহলে পরিবার কেন রাজি হবে? বন্দি থাকা অবস্থায় নিজের স্ত্রীকে গর্ভবতী হতে দেখাটা সহজে মেনে নেয়ার মতো কোনো বিষয় না।’

রাওহি তার পরিবারকে একটা চিঠি লিখলেন। ঠিক পরের বারই যখন তারা তার সঙ্গে জেলে দেখা করতে এলেন, তখন রাওহির বাবা বললেন, ‘তুমি এই বিষয়টি আগে কেন ভাবনি?’

‘যা আমাকে রীতিমত চমকে দিয়েছিল’, জানান রাওহি। পরে তিনি স্ত্রী রায়েদার কাছে তিনটি ‘স্পার্ম স্যাম্পল’ পাঠান। কিন্তু বেশ কয়েকবারের চেষ্টা আর হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি নিষ্ফল হয়।

রায়েদার ভাষায়, ‘যদি সৃষ্টিকর্তা চাইতেন যে আমাদের সন্তান হোক, তবে অবশ্যই ওই দশবারের চেষ্টা একবারের জন্য হলেও কাজে লাগত। কিন্তু সবকিছুই তো ভাগ্যের লিখন। আমি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বিশ্বাসী।’

কিন্তু তীব্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিই এই বুদ্ধির উদ্রেক এবং বাস্তবায়নের জন্য দায়ী।

আরেকজন সাবেক বন্দি তওফিক আবু নাইম বলেন, ‘বন্দিরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এটা আসলে সামাজিকভাবে মর্যাদাহানিকর এবং রীতিনীতির বাইরে। কিন্তু এটা একসময় বন্দি এবং জেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে এটা একটা যুদ্ধের অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায়। তারা বুঝে গিয়েছিলেন কাজটা কতটা শক্ত। আর তাই সর্বাত্মক চেষ্টা থাকত এই বাঁধা উতরে যাওয়ার। নিজের শুক্রাণুকে জেলের বাইরে বের করা, জেল কর্তৃপক্ষকে পরাস্ত করা এবং জেলে বন্দি থাকা অবস্থাতেই সন্তানের জন্মদান ছিল তাদের কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জের নাম।

কিন্তু ২০১৫ সালে জেলে বসে বাইরে থাকা স্ত্রীর গর্ভে সন্তান জন্মদানের এই প্রক্রিয়ায় ভাটা লাগে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝে যাওয়ার পর দর্শনার্থী আইনে কড়াকড়ি আরোপ করে এবং বন্দিদের জন্য তাদের শুক্রাণুকে বাইরে পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে দেয়।

বাড়তি কড়াকড়ি হিসেবে জেলে বসে শুক্রাণু পাচারের মাধ্যমে জন্ম দেয়া এসব শিশুকে কোনোরকম আইনি পরিচয় কিংবা তার জন্মদাতার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় ইসরায়েল।

সাবেক একজন বন্দি আসাদ আবুল সালাহ্‌ তার ছেলে পূর্বোক্ত বন্দি ফাহমি সঙ্গে তার শিশুপুত্রকে দেখা করানোর আবেদন করেছিলেন। সালাহ্‌ জানান, ‘আমরা রেডক্রসের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তাদের কোনোরকম স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাদের আচরণ এমন যে, এই বাচ্চাটার কখনো জন্মই হয়নি!

কিন্তু এত কড়াকড়ি স্বত্বেও তার মা মে’র জন্য বিশাল এক আশার নাম ‘আসাদ’।

মে বলেন, ‘তিনি (স্বামী) যেভাবে নিজের শুক্রাণুকে জেলের বাইরে বের করেছেন ঠিক সেভাবেই তিনি একদিন জেলের বাইরে বেরোতে পারবেন। আমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। আশা করছি, আমার স্বামীর মুক্তির মাধ্যমে তা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করবে।’

সূত্র: আল জাজিরা

/এসএস/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত