ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১ পৌষ ১৪২৪ অাপডেট : ৪৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৭:০৯

প্রিন্ট

স্মৃতির জাদুঘরে টেলিগ্রাম

অনলাইন ডেস্ক

১৮৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বপ্রথম যন্ত্রের সাহায্যে পাঠানো হয় ছোট্ট একটা বার্তা। আধুনিককালের এসএমএস-এর আদি সংস্করণ বলা যেতে পারে একে। মাধ্যমটির নাম টেলিগ্রাম। টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল যখন টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার করেন সারা পৃথিবীতে পড়ে যায় হৈ চৈ। এরপর প্রায় টানা ১৭০ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে বিশ্বজুড়ে খবর আদান-প্রদানে ব্যবহার হয় এই মাধ্যম। কি আনন্দ, কি বেদনা সব সংবাদই মুহূর্তে পৌঁছে গেছে প্রাপকের কাছে। বহু সংবাদ টেলিগ্রাম নিজেই বয়ে নিয়ে গেছে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

বাংলাদেশে টেলিগ্রাম

বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ টেলিগ্রাফ অফিস ছিল। আর এখন ৬৪ জেলার আছে ৪০টির মতো অফিস। তাও চলছে ধিক ধিক করে। কোথাও ঘরটি পরিত্যক্ত হয়েছে। আর কোন ঘরে জমেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। তবে ওই ঘরগুলোতে এখন আর নেই টেলিগ্রাফের টরে টক্কা যন্ত্র। কোথাও আছে একটি ফ্যাক্স মেশিন, আবার কোথাও আছে একটি ল্যান্ড টেলিফোন। টরে টক্কা যন্ত্রগুলো কেজির দরে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এখন আবহাওয়া অধিদফতরই একমাত্র নিয়মিত গ্রাহক তাদের। এক-দেড় লাখ টাকা তাদের সেখান থেকে আয় হয়। সব জেলায় আবহাওয়া অফিস না থাকায় আবহাওয়া বার্তা পাঠানো হয় টেলিগ্রামের মাধ্যমে। এগুলো তারা টরে টক্কা যন্ত্র দিয়ে নয়, ফ্যাক্সের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। যেখানে ফ্যাক্স নেই সেখানে পাঠানো হয় ল্যান্ডফোনের মাধ্যমে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যদের ছুটির জন্য এখনো কোথাও কোথাও টেলিগ্রামের দরকার হয়। কোন সদস্য ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার পর বিপদ-আপদে ছুটি বাড়াতে শরণাপন্ন হন টেলিগ্রামের। কিছুদিন আগ পর্যন্তও বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন তথ্য আদান-প্রদান হতো টেলিগ্রামেই। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের শুরু থেকেই দাপটের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করেছে এই টেলিগ্রাম মাধ্যমটি। ১৯৮১ সালে সৌদি সরকারের অনুদানে টেলিগ্রাফ অফিস থেকে টাইপ রাইটার তুলে দিয়ে বসানো হয় টেলিপ্রিন্টার। তখন এক অফিসে বসে কোড ব্যবহার করে মোর্স কি দিয়ে লিখলে সংশ্লিষ্ট অফিসে কয়েক শব্দের একটা লেখা বের হত। যদিও তাতে অনেক সময় ভুল হলেও পরে তা ঠিক করার ব্যবস্থাও ছিল।

বাংলাদেশে টেলিগ্রাম চালু থাকলেও এর মূল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) তাদের ওয়েবসাইটে টেলিগ্রামকে পাঠিয়ে দিয়েছে ‘জাদুঘরে’। টেলিগ্রামের বর্ণনা, এটি কী এবং এই সংক্রান্ত নানা তথ্য রাখা হয়েছে সংস্থাটির ওয়েবসাইটের ‘মিউজিয়াম’ লিংকে।

মুক্তিযুদ্ধে টেলিগ্রামের ভূমিকা

যখন ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করে। ৬ এপ্রিল ১৯৭১ ঐতিহাসিক মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে। ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তারা ২৫ মার্চের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা খুব ভেবেচিন্তে একটি তারবার্তা লিখেছিলেন যাতে স্বাক্ষর করেছিলেন বাড ও তার ২০ জন সহকর্মী। তারা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন। বাড তাতে কেবল স্বাক্ষরই দেননি, বাড়তি এক ব্যক্তিগত নোটও দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’

এক সময় এদেশের সংবাদপত্রগুলোও এই টেলিগ্রামের নিউজে নির্ভর করতো। বিশেষ করে জরুরি নিউজগুলো মফস্বল শহর থেকে সংবাদদাতারা পাঠাতেন টেলিগ্রামের মাধ্যমে। আর তাই সে সময় সংবাদের শুরুতেই লেখা হতো ‘নিজস্ব সংবাদদাতার তার’। এমনিভাবে সংবাদপত্রসহ বহুবিধ কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এই টরে-টক্কার টেলিগ্রাম। টেলিগ্রাম অফিসে গেলে সেই টরে-টক্কার শব্দ শোনা যেতো। কিন্তু এখন আর সেই টরে-টক্কা নেই। নেই টেলিগ্রাম অফিসও।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত