ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫ অাপডেট : ৫ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:২৩

প্রিন্ট

গোপাল ভাঁড় কে ছিলেন? (দ্বিতীয় অংশ)

গোপাল ভাঁড় কে ছিলেন? (দ্বিতীয় অংশ)
আলতাফ শাহনেওয়াজ

বাঙালের গোপাল ভাঁড়-দর্শন

নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দরবার। তাঁর সভাকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (কৃষ্ণচন্দ্রই ভারতচন্দ্রকে রায়গুণাকর উপাধি দিয়েছিলেন) অন্নদামঙ্গল কাব্যের ‘বিদ্যাসুন্দর’ অংশ লিখে শেষ করেছেন। এখন সেটি পড়া হচ্ছে। রচনাটি দুহাতে ধরে পাঠ করছেন স্বয়ং ভারতচন্দ্র। এমন সময় দরবারে প্রবেশ করলেন গোপাল এবং কেউ কিছু বলার আগেই ভারতচন্দ্রকে উদ্দেশ করে হইহই করে উঠলেন তিনি, ‘ও হে কবিমশায়, করছেনটা কী, খাতাটা অমন কাত করে রেখেছেন কেন? রস যে গড়িয়ে পড়বে!’

উজ্জ্বলকুমার দাস সংকলিত গোপাল ভাঁড়ের সেরা ১০০ গল্প বইয়ে স্থান পাওয়া এই গল্পটি অবশ্যই রসে টইটম্বুর, তবে এখানে গোপালের তত্ত্ব-তালাশের প্রাথমিক একটি সূত্র হাজির আছে। সূত্রটি হলো কৃষ্ণচন্দ্র।

বাংলা অঞ্চলের প্রবল প্রতাপশালী চরিত্র নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭১০-৮৩) রাজত্বকাল ৫৫ বছরের। ১৮ বছর বয়সে তিনি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন ১৭২৮ সাল। শাক্ত ধর্মে বিশ্বাসী কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও শিল্প-সাহিত্যানুরাগী। যদিও ১৭৫৭-তে পলাশীর প্রেক্ষাপটে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের দায়ে ইতিহাসে তিনি ‘বেইমান’ হিসেবে চিহ্নিত, তবু এতে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগের কাহিনি মুছে যায় না। তাঁর সভাসদ ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত প্রমুখ।

এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়—এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। এ বিষয়ে তাঁরা স্থির সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষেই রয়েছে অধিকাংশের সায়। যেমন বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘গোপাল রসিক-চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন।’

১৯৫২ সালে হোমশিখা পত্রিকা গোপাল ভাঁড়ের ওপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে নতুনভাবে বোঝাপড়াই ছিল পত্রিকাটির উদ্দেশ্য। সেখানে ‘গোপাল ভাঁড়ের নামে প্রচলিত গল্পসংগ্রহ’ নামের প্রবন্ধে অধ্যাপক মদনমোহন গোস্বামী লেখেন একই কথা, ‘শোনা যায়, মহারাজের (রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের) সভায় আরেকটি রত্ন ছিলেন—তিনি স্বনামখ্যাত রসসাগর গোপাল ভাঁড়।’

তাহলে কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের সময় থেকে আমাদের এই সময়ের দূরত্ব ১৭০০ থেকে ২০০০—৩০০ বছরের। কিন্তু মাত্র ৩০০ বছরের আগেকার মানুষ গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে এত ধোঁয়াশা থাকবে কেন, যেখানে তাঁর সমসাময়িক কৃষ্ণচন্দ্র, ভারতচন্দ্র সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব নেই? এর কারণ, একেক মুনির একেক মত।

সুকুমার সেন, পরিমল গোস্বামী, অতুল সুর কি অজিতকৃষ্ণ বসু প্রমুখ পণ্ডিত গোপাল ভাঁড়ের বিভিন্ন প্রসঙ্গে যখন দ্বিধাবিভক্ত, তখন ১৯২৬-এ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) বঙ্গভূমিতে মৃদু কম্পন জাগাল নবদ্বীপ কাহিনী বা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড় নামের একটি পুস্তক। লেখক শ্রীনগেন্দ্রনাথ দাস। তিনি নিজেকে গোপাল ভাঁড়ের বংশধর দাবি করলেন। শুধু কি দাবি? তাঁর বক্তব্যে প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত হলেন গোপাল ভাঁড়।

আগে কেউ কেউ গোপালের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তাঁর বংশের ঠিকুজি মেলে ধরতে পারেননি। নগেন্দ্রনাথের মতে, গোপালের প্রকৃত নাম গোপাল চন্দ্র নাই। তিনি ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ অন্তঃপুরের ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক। তাই গোপাল চন্দ্র নাই থেকে তাঁর পদবি হয়ে গেল ভান্ডারি। ভান্ডারি থেকে আরও পরে ভাঁড়। তাঁর বাবার নাম দুলাল চন্দ্র নাই। প্রপিতা আনন্দরাম নাই। জাতিতে তাঁরা নাপিত। তবে দুলাল চন্দ্র ছিলেন নবাব আলিবর্দী খাঁর শল্যচিকিৎসক বা বৈদ্য। ‘তৎকালে অস্ত্র-চিকিৎসা নাপিত জাতির অধিকৃত ছিল’ মন্তব্য করে নগেন্দ্রনাথ দাস নবদ্বীপ কাহিনীতে তথ্য দিয়েছেন, গোপালরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই কল্যাণ আর ছোট ভাই গোপাল।

তাঁর জন্ম অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি, মুর্শিদাবাদে। নগেন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় গোপালের গুণে মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগরে লইয়া যান। গোপাল অতি সুপুরুষ ও বাল্যকাল হইতে সুচতুর ও হাস্যোদ্দীপক বাক্যাবলী প্রয়োগে বিশেষ পটু ছিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ন্যায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের একটি পঞ্চরত্নের সভা ছিল। মহারাজ কৃষ্ণ গোপালের প্রত্যুৎপন্নমতি ও বাকপটুতা দেখিয়া তাঁহাকে স্বীয় সভায় অন্যতম সদস্য পদে নিযুক্ত করেন।...গোপালের একটি পুত্র ও রাধারাণী নামে একটি কন্যা ছিল। রাধারাণীর দুই পুত্র রমেশ ও উমেশ। বহুদিন হলো সে বংশ লোপ পাইয়াছে।’

এসব বলে শেষে নরেন্দ্রনাথের ভাষ্য এমন: গোপালের বংশ লোপ পেলেও তিনি তাঁর ভাই কল্যাণের নবম অধস্তন পুরুষ।

( দ্বিতীয় অংশ )

পড়ুন প্রথম অংশ

আর/এ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত