ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ১২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:১১

প্রিন্ট

ব্লাসফেমির জন্য যারা দেশছাড়া

ব্লাসফেমির জন্য যারা দেশছাড়া
আসিয়া বিবি
অনলাইন ডেস্ক

পাকিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অধিকার কর্মীরা ব্লাসফেমির অভিযোগ সামনে আনার জন্য সবসময় দেশটির সেনাবাহিনীরই সমালোচনা করে থাকে।

দেশটিতে ব্লাসফেমির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তবে আইনি শাস্তির বাইরেও ব্লাসফেমির অভিযোগে কয়েকজনকে খুন হতে হবে ক্রুদ্ধ গোষ্ঠীর হাতে।

এখন নতুন করে বিতর্কিত এই আইনটি আলোচনায় এসেছে খ্রিস্টান নারী আসিয়া বিবির ঘটনাকে ঘিরে।

তার আইনজীবী মনে করছেন, চার সন্তানের জননী এই নারী ও তার পরিবারকে নিরাপত্তার জন্যই এখন দেশ ছাড়তে হবে।

কিন্তু পাকিস্তানে এমন পরিস্থিতির উদাহরণ একমাত্র আসিয়া বিবিই নন, বরং একই ধরণের অভিযোগ তুলে পাকিস্তান ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে আরও অন্তত চারজনকে।

'পাকিস্তানই আমার দেশ'

জন (ছদ্ম নাম) খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন সুপরিচিত নাম যিনি পাকিস্তানেই ব্যাংকিং পেশায় কর্মরত ছিলেন এবং রাজনীতিও করতেন।

এই ব্যক্তির জীবনই পাল্টে যায় যখন তার মাত্র তের বছর বয়সী সন্তানকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করায় ব্লাসফেমির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি স্ত্রী ও দু সন্তানসহ যুক্তরাজ্যে শরণার্থীর জীবন যাপন করছেন কিন্তু ওই অভিযোগ এখনো তার পিছু ছাড়ছেনা।

প্রথমে বার্মিংহামের কাছে একটি মসজিদে অবস্থান নিয়েছিলেন কিন্তু ওই এলাকাতেই পাকিস্তানী বংশোদ্ভূতদের বসবাস ছিলো বেশি।

‘এক রাতে এক ব্যক্তি আমার ঘরের দরজায় নক করলো এবং আমার স্ত্রীকে মসজিদের দেয়ালের পাশে ময়লার ব্যাগ রাখার মাধ্যমে মসজিদকে অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করলো।’

পরে সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ হলো এটি আসলে অন্য এক নারী ছিলেন।

তিনি জানান, তার সন্তানরা এখনো আতঙ্কিত এবং তারা আর পাকিস্তানে ফিরে যেতে চাইছেনা। জন অবশ্য যেতে চান।

তিনি বলেন, ‘আমি ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই যেতে চাই, কারণ ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে আমি বেশি নিরাপদ বোধ করবো।’

আপনাদের কিছু করতে হবে বা বলতে হবে

আসিম সাইদ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি সম্প্রদায়েরই সদস্য। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করে পোস্ট দেয়ার পরই তিনি টার্গেটে পরিণত হন।

২০১৭ সাল 'রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা' যে পাঁচজন ব্লগারকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ উঠেছিলো আসিম ছিলেন তাদেরই একজন। পরে ব্লাসফেমির অভিযোগ করা হয় যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

তার দাবি সেনাবাহিনীর সমালোচনার কারণেই তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়।

এক বছর আগে যুক্তরাজ্যে আসার পর থেকেই অনেকটা নীরবেই রয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ব্রিটিশ মুসলিমদের মধ্যেও অনেক অসহনশীল ব্যক্তি আছেন। তার ভয় তিনি আক্রান্ত হতে পারেন যে কোনো সময়।

পাকিস্তানে আটক থাকা অবস্থায় করার নির্যাতনে অভিজ্ঞতা এখনো তাকে আতঙ্কিত করে।

‘একবার ব্লাসফেমির সুর উঠলে কারও পক্ষে পাকিস্তানে ফেরা বিপজ্জনক। এক দশক পরে ফিরলেও আপনি খুন হতে পারেন।’

এখন আসিয়া বিবির খালাসের ঘটনাকে স্বাগত জানালেও তার মতে পাকিস্তান কখনোই বদলাবেনা।

আমি কখনোই ফিরবো না

তাহির মাহদি আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য। তিনি তার সম্প্রদায়ের সমর্থনে কাজ করে এমন একটি পত্রিকার প্রকাশক ও ব্যবস্থাপক ছিলেন। সত্তরের দশকেই আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয় পাকিস্তানে।

তাহিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তিনি এমন কিছু প্রকাশ করেছেন যা ধর্ম অবমাননাকর। যদিও এ অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কিন্তু এ অভিযোগেই তাকে আড়াই বছর জেল খাটতে হয়। এমনকি এসময় তার দু ভাই মারা যান কিন্তু তাহির তাদের শেষকৃত্যে পর্যন্ত অংশ নিতে পারেননি।

এখন আসিয়া বিবির খালাস পাওয়ার খবরে দারুণ খুশি তিনি। কিন্তু তিনিও বিশ্বাস করেন পাকিস্তানে তার সম্প্রদায়ের জন্য কোনো পরিবর্তন আসবেনা।

জীবন কখনোই এক ধরণের ছিলো না

জাহিদার বাবা হামিদুল্লাহ রেহমাতুল্লাহ খুবই জনপ্রিয় একজন দন্ত চিকিৎসক ছিলেন। সমাজের সব স্তরের রোগীই তার ছিলো ও তারাও তাকে ভালোবাসতো। তার মতে, ধর্মান্ধরা তাকে ঘৃণা করতো শুধু তিনি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বলে।

তিনি নিজের মতো করে প্রার্থনা ঘর তৈরি করেছিলেন আর এটাকেই আখ্যা দেয়া হয়েছিলো ব্লাসফেমি হিসেবে।

দু'বার তার ওপর আক্রমণও হয় এবং শেষে প্রায় এগার বছর আগে রোজার সময়ে তাকে অপহরণ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবাকে নির্যাতন করা হয়েছে। সুন্নি মুসলিম হতে জোর করা হয়েছে কিন্তু তিনি যখন অস্বীকার করলেন তখন তাকে মাথায় ও বুকে গুলি করা হয়।’

তার এক ভাই তখন যুক্তরাজ্যেই ছিলেন। ওই খুনের পর তাদের পরিবার আহমদিয়ারা থাকে এমন একটা জায়গায় সরে আসেন ও যুক্তরাজ্যে আসার আগ পর্যন্ত অনেকটা পালিয়েই ছিলেন তারা সেখানে।

জাহিদা বলেন, আসিয়া বিবির ঘটনা সংখ্যালঘুদের জন্য আশার আলো তৈরি করেছে।

তিনি অবশ্য বলেন, ‘কিন্তু কে জানে। ধর্মান্ধরা হয়তো সরকারকে জোর করবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত