ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:০৮

প্রিন্ট

‘ওরা আমার শহরের আত্মাকে খুন করেছে’

‘ওরা আমার শহরের আত্মাকে খুন করেছে’
অনলাইন ডেস্ক

আপনার নাম কি? আপনি কোন রাজ্য থেকে এসেছেন? ভারতে এ দুটি প্রশ্ন খুবই জনপ্রিয়। কেননা সেখানে অপরিচিত ব্যক্তিরা নিজেদের মধ্যে আলাপ শুরুই করেন এই প্রশ্ন দুটি দিয়ে। কিন্তু এলাহাবাদ শহরের নাম বদলে ফেলায় বিপদে পড়েছেন শহরবাসী। কেননা এখন তারা আর নিজেদের ‘এলাহাবাদী’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে না।

এ শহরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত রয়েছে এলাহাবাদ নামটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং বলিউডের কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন এই শহর থেকেই উঠে এসেছেন। কিন্তু এখন তো আর কেউ একে এলাহাবাদ বলতে পারবে না। তাদের বলতে হবে প্রয়াগরাজ।

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী এলাহাবাদের নাম বদলে ফেলেছে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি। রাজ্য সরকার বলছে, শহরের প্রাচীন ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতেই নাকি এর নাম বদলানো হয়েছে। আর এই ছুতো ধরেই তারা বদলে ফেলেছে ৪৩৫ বছরের পুরনো নামটি। এলাহাবাদ শহরের নামটি দিয়েছিলেন মুগল সম্রাট আকবর। মুগল যুগে প্রশাসনিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এলাহাবাদ।

মোগলসরাই রেলস্টেশন

এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি ১২ বছর অন্তর এখানে গঙ্গা, যমুনা নদীর সংযোগস্থলে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী কুম্ভ মেলা। এ মেলায় অংশ নেয় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ হিন্দু।

শুধু মুসলিম বা হিন্দু নয়, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ এলাহাবাদ। এই শহরের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস ঐতিহ্য। যেমন নেহেরুর বাড়ি আনন্দ ভবন, দুই নদীর মোহনায় সংগম, আকবরের তৈরি বিশাল দুর্গ যা শহরটিকে বন্যা থেকে রক্ষা করে। এ কারণেই এর নাম বদলে দেয়ায় নাখোশ এলাকাবাসী।

এ প্রসঙ্গে ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক আজিমুর সিদ্দিক বলেন, ‘এই স্থাপনার সঙ্গে আসলে অন্য কোনো নাম যায় না। এগুলো এলাহাবাদকে উপস্থাপন করে।’

কেন বদলালো এ শহরের নাম?

এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হেরাম্ব চতুর্ভেদী মনে করেন কেবল রাজনৈতিক কারণেই বদলে ফেলা হয়েছে এলাহাবাদের নাম। তিনি বলেন, ‘আগামী বছর দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থন পাবার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

এমন নয় বিজেপি কেবল এ শহরের নামই বদলেছে। এর আগে উত্তর প্রদেশের সরকার ব্রিটিশ যুগের ঐতিহ্যবাহী মোগলসরাই রেলস্টেশনের নাম বদলে তাদের আদর্শিক নেতার নামে এর নামকরণ করেছে দীনদয়াল উপাধ্যায়।

গঙ্গা আর যমুনার সংযোগস্থল

অনেকেই বিজেপির এই নামবদলকে উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন শহর ও নগরের মুসলিম নামগুলোকে বদলে হিন্দু নাম দেয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। যদিও বিজেপি বলছে, তারা এ নিয়ে কোনো রাজনীতি করছে না। বরং প্রয়াগরাজ-ই এলাহাবাদের প্রাচীন নাম। ১০৮৩ সালে সম্রাট আকবর এই নাম বদলে এরঅহাবাদ করেন, যার অর্থ আল্লাহর স্থান।

তবে বিজেপির এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর এনআর ফারুকি বলেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য ও বই থেকে জানা যায়, এ শহরের নাম কখনই প্রয়াগরাজ ছিলো না।

তিনি আরো বলেন, ‘প্রয়াগ মানে ঝাঁসি প্রয়োগ। আর এটি একটি তীর্থস্থান হিসেবেই পরিচিত ছিলো। এটা কোনো শহরের নাম ছিলো না।’

তার দাবি, ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর একটি নতুন শহরের গোরপত্তন করে এর নাম দেন এলাহাবাদ। এখানে তিনি একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। আর এটি ছিলো উত্তর ভারতের প্রাশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র। ১৫৭৪-২০১৮ পর্যন্ত বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই শহর।

ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতা জওহরলাল নেহেরুর বাসভবন আনন্দ ভবন থেকেই পরিচালিত হয়েছিলো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। ভারতের স্বীনতা আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রয়েছে এই বাড়ির। কংগ্রেস পার্টির জন্ম এই আনন্দ ভবনেই। স্বাধীনতা লাভের কয়েক দশক পরও ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র ছিলো এই এলাহাবাদ শহর। ভারতের বহু বিখ্যাত হিন্দি লেখক, রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, বিজ্ঞানী ও সরকারি কর্মকর্তা উঠে এসছেন এই শহর থেকে। কিন্তু এখন এটা শেষ হয়ে গেল।

এ নিয়ে আক্ষেপ করে অধ্যাপক চতুর্ভেদী বলেন, ‘এটা অবাক হওয়ার মত বিষয় যে, এরকম ছোট্ট একটা শহর থেকে এতসব বিখ্যাত মনীষী উঠে এসেছেন। তারা হিন্দু না মুসলিম এটা কোনো বিষয় নয়, এই শহর সবাইকে বুকে টেনে নিয়েছে।’ তিনি মনে করেন, এর নাম সরকারিভাবে প্রয়াগরাজ করা হলেও এখানকার লোকজন নিজেদের এলাহাবাদের বাসিন্দা বলেই পরিচয় দেবে।

তিনি আরো বলেন, ‘আপনি একে প্রয়াগরাজ বলেন বা নাই বলেন তাতে কিছু যায় আসে না। কেননা এটা বরাবরই হিন্দু তীর্থযাত্রার জন্য সমাদৃত। এখন এলাহাবাদ নামটিকে মুছে দিয়ে এ শহরের আত্মাকে খুন করা হয়েছে।’

একই মত পোষণ করেন অধ্যাপক এনআর ফারুকিও। তিনি বলেন, ‘আপনি কেবল ৫শ বছরের ইতিহাসকেই মুছে ফেলেননি, আপনি শহরের প্রতিটি মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছেন, যারা এই শহরে বেড়ে উঠেছেন।’

এই শহরের অনেক বাসিন্দাও নতুন নামটিকে মেনে নিতে পারছেন না। কেননা তারা সবসময় নিজেদের এলাহাবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতো। বিখ্যাত উর্দু কবি নিজের নাম দিয়েছিলেন আকবর এলাহাবাদী।

তাই অনেকে ভেবেই পান না এখন তারা ওই কবিকে কীভাবে ‘আকবর প্রোয়োগরাজ’ বলে ডাকবেন।

জওহরলাল নেহেরুর বাসভবন আনন্দ ভবন

বিবিসি অবলম্বনে মাহমুদা আকতার

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত