ঢাকা, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮, ৯ আষাঢ় ১৪২৫ অাপডেট : ৩৬ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ০৪:১৪

প্রিন্ট

৩৭ তম বিসিএসের ভাইভা প্রস্তুতি

৩৭ তম বিসিএসের ভাইভা প্রস্তুতি
প্রতীকী ছবি
তানিয়া মুন

ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে অনেকেরই স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তবে বিসিএস ক্যাডার হতে চাইলে ঝক্কি কম নয়। প্রথমে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, তারপর লিখিত পরীক্ষা এবং সবশেষে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই শেষ পর্যন্ত মিলবে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সৌভাগ্য।

বর্তমানে একাধারে কয়েকটি বিসিএস-এর কার্যক্রম চলছে। ৩৭ তম বিসিএস এর মৌখিক পরীক্ষা ও ৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন। ঘোষণা অনুযায়ী ৩৭ তম বিসিএস এর মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২৯ নভেম্বর আর ৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হবে ২৯ ডিসেম্বর।

৩৭তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারা এখন দিন গুণছেন মৌখিক পরীক্ষায় হাজির হওয়ার। অনেক কষ্টে তো প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষা পার হয়েছে। এই শেষ ধাপটা এবারে সাফল্যের সাথে উতরে যেতে পারলেই সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সুযোগ। মৌখিক পরীক্ষার সময়টা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেই আপনি পৌঁছে যাবেন আপনার কাঙ্খিত লক্ষ্যে। তাই মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতিটা ভালোমতো হওয়া দরকার। এই লেখাতে মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই আলোচনা করা হলো।

মৌখিক পরীক্ষার পোশাক:

পরীক্ষার দিন পরীক্ষা শুরুর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে ভাইভা বোর্ডে উপস্থিত হতে হবে। পোশাক হতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, শালীন ও মার্জিত। ছেলেদেরকে অবশ্যই ফুলহাতা শার্ট পরে ভাইভা বোর্ডে যাওয়া উচিত। শার্টের রঙ সাদা না হলেও যতটা সম্ভব হালকা রঙের হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেইসাথে প্যান্টের রঙ হওয়া প্রয়োজন কালো বা কালোর কাছাকাছি। পায়ে কালো রঙের ফরমাল শু থাকলে ভালো হয়। মেয়েদেরও পরিপাটি পোশাক পড়া উচিত। শাড়ি অথবা ভদ্রোচিত সালোয়ার কামিজ পড়ে উপস্থিত হবেন ভাইভা বোর্ডে। কড়া মেকআপ করে ভাইভা বোর্ডে উপস্থিত না হওয়াই ভালো। আর ছেলে-মেয়ে সবার ক্ষেত্রেই পারফিউম ব্যবহার করলে হালকা পারফিউম ব্যবহার করা উচিত।

নিজেকে উপস্থাপন করবেন যেভাবে:

ভাইভার সময় আপনাকে সতেজ এবং সবল থাকতে হবে। আপনার মধ্যে যেন কোনো রকম ক্লান্তির ছাপ না দেখা যায়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢোকার সময়ই সম্ভাষণ করুন। প্রবেশের পর অনুমতি না নিয়েই বসে পড়বেন না। ভাইভা বোর্ডে ঢোকার পর সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করুন। নিজেকে বেশি স্মার্ট প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। তবে তাই বলে বোকার মতো আচরণও করবেন না।

যেসব বিষয়ে জানতে হবে:

মৌখিক পরীক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সিলেবাস নেই। তাই এ পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ নেই। দেশে ও দেশের বাইরের খোঁজখবর কতটুকু রাখেন বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো, আপনার উপস্থিত জ্ঞান কেমন এ পরীক্ষায় মূলত এ বিষয়গুলোই যাচাই করা হয়। যে পদের জন্য আবেদন করেছেন, সে পদ সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন হতে পারে। অনার্সে যে বিষয় পড়েছেন, সে বিষয়েও প্রশ্ন হতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। দখলে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক বিষয়ও। নিজ জেলার আয়তন, জনসংখ্যা, শিক্ষার হার, কীসের জন্য বিখ্যাত, বিখ্যাত ব্যক্তি ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা রাখতে হবে। মৌখিক পরীক্ষার জন্য যথাসম্ভব মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

পছন্দক্রম অনুযায়ী প্রশ্ন:

মৌখিক পরীক্ষায় আপনাকে নানা বিষয় থেকে প্রশ্ন করা হলেও যে ক্যাডারগুলো আপনার পছন্দক্রমের শুরুর দিকে রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। যেমন, আপনার পছন্দক্রমের শুরুতে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার থাকলে প্রশাসন ক্যাডারের স্তরবিন্যাস, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্মক্ষমতা প্রভৃতি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। তেমনি প্রথম পছন্দের পরের কয়েকটি ক্যাডার সম্পর্কেও একই ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার পছন্দের ক্যাডারগুলো সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা ও জ্ঞান আপনাকে এগিয়ে দেবে ভাইভা বোর্ডে।

ভাইভার জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নিন:

যারা ইতোমধ্যেই প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় জন্য ভালো প্রস্তুতি নিয়েছেন, ভাইভার প্রস্তুতি তাদের জন্য অনেকটাই সহজ। এ দুটি পরীক্ষার প্রস্তুতি মৌখিক পরীক্ষায় বেশ কাজে লাগে। অনেকেই আবার মনে করতে পারে, ওই দুই পরীক্ষায় ভালো প্রস্তুতি থাকলেই যথেষ্ট। তবে সেই ধারণাটি ভুল। প্রিলিমিনারি আর লিখিত পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি আপনার মৌখিক পরীক্ষার জন্য সহায়ক বটে, তবে সবটা নয়। আগের পড়া বিষয়গুলো ঝালিয়ে নেয়াটাও হতে পারে প্রস্তুতির একটি অংশ। এর বাইরেও প্রতিদিন দুই-তিনটি পত্রিকা পড়লে বেশ কাজে লাগবে। সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করা হয়ে থাকে মৌখিক পরীক্ষায়। প্রতিদিনের পত্রিকা ঠিকমতো পড়া থাকলে এসব প্রশ্নের উত্তর সহজে দেয়া যায়। তাই পরীক্ষার দিনের পত্রিকাও যাওয়ার পথে পড়ে নিন। দৈনিক পত্রিকা পড়ার সময় দেশের খবরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদগুলোতেও যত্ন করে চোখ বুলান। সেই সাথে খেলার খবরও দেখবেন। আর সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত সব ধরনের ঘটনাই প্রশ্নকর্তার মনে উঁকি দিতে পারে। কাজেই আলোচিত ঘটনাগুলোর সাথে পরিচিত থাকুন।

প্রশ্নের উত্তর দেবেন যেভাবে:

মৌখিক পরীক্ষায় সব প্রশ্নই যে আপনার জানা থাকবে, তা কিন্তু নয়। উত্তর জানা না থাকলে বানিয়ে বা আন্দাজে না বলে সরাসরি বলতে হবে উত্তরটি জানা নেই। বানিয়ে বা আন্দাজে বলে ভুল করার চাইতে 'জানা নেই' বলা অনেক ভালো। এতে আপনার ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে না। কোনো ব্যাপারে মতামত জানতে চাওয়া হলে পক্ষপাতিত্ব না করে দুটি দিকই তুলে ধরা উচিত। সেই সঙ্গে খেয়াল রাখবেন, আপনার মতামত যেন যৌক্তিক হয়। ভাইভা বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে কখনোই তর্কে জড়িয়ে পড়বেন না। কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলে তা জানানোর আগে বিনয়ের সঙ্গে 'মাফ করবেন' বা 'কিছু মনে করবেন না' বলে নিন। স্বাভাবিক স্বরে উত্তর দিন। আবেগতাড়িত হয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে না। খেয়াল রাখতে হবে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি, ধর্ম বা রাষ্ট্র সম্পর্কে যাতে কোনো অবমাননাকর বা অপ্রীতিকর কথা বেরিয়ে না যায়।

উত্তরের ভাষা:

অনেকেই মনে করেন, ইংরেজিতে প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা অনেক বেশি স্মার্টনেসের পরিচায়ক। কিন্তু কথাটি সর্বাংশে সঠিক নয়। প্রশ্নকর্তা বাংলাতে প্রশ্ন করলে বাংলায় উত্তর দেয়াটাই বাঞ্ছনীয়। আর ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে ইংরেজিতে উত্তর দিন। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নকর্তারা প্রার্থীর ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা জেনে নেয়ার জন্য ইংরেজিতে প্রশ্ন করেন বা ইংরেজিতে নিজের বা কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলেন। ইংরেজিতে নিজের দক্ষতা জাহির করতে হলে এসব সময়ে সঠিকভাবে প্রশ্নগুলোর উত্তর করুন বা কথা বলুন।

অপ্রাসঙ্গিকতা পরিহার করুন:

মৌখিক পরীক্ষায় আপনাকে যা জিজ্ঞাসা করা হয়, সেটাই বলুন। অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলাপ করবেন না। ভাইভা বোর্ডে যে বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে, শুধু সে বিষয়েই উত্তর দিতে হবে। আর হাসিমুখে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। তবে অকারণেও হাসা যাবে না। ভাইভা বোর্ডে যখন যে ব্যক্তি আপনাকে প্রশ্ন করবেন, তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিতে হবে। সব প্রশ্নের উত্তর বিনীতভাবে দিতে হবে। কখনোই নিজের যোগ্যতা বা অন্য কোনো বিষয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। কথা বলার সময় হাত-পা নাড়াবেন না। চৌকসভাব দেখাতে গিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে উত্তর দেবেন না। আঞ্চলিক টান পরিহার করে শুদ্ধ উচ্চারণে উত্তর দিতে চেষ্টা করুন। আরও একটি বিষয়, মৌখিক পরীক্ষায় কখনো কখনো এলোপাতাড়ি প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন ছুড়ে প্রার্থীকে বিচলিত করার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় সাক্ষাত্কার গ্রহীতারা নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করে বিব্রত করার চেষ্টা করে থাকেন। জরুরি এবং বিশেষ মুহূর্তে নিজেকে সামাল দেয়ার ক্ষমতা কতটুকু আছে, তা দেখার জন্য এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে কী করে নিজের টেম্পারমেন্ট ধরে রাখতে হবে, সেদিকে আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।

মৌখিক পরীক্ষার সময়সীমা:

মৌখিক পরীক্ষায় আপনাকে দুই মিনিট থেকে শুরু করে ২০ মিনিটও রাখা হতে পারে। এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। বেশি সময় ধরে প্রশ্নকর্তারা প্রশ্ন করলে ঘাবড়াবেন না; বরং এতে ধরে নিতে হবে, তারা আপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং চাকরির জন্য যোগ্য মনে করেই যাচাই করছেন। তবে এমনও দেখা গেছে, ২০ মিনিট রাখার পরও অনেকের চাকরি হয়নি, আবার দুই-তিন মিনিট বোর্ডে থেকেও চাকরি হয়ে গেছে। (সংগ্রহ)

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম (৩৪তম বিসিএস, প্রশাসন)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত