ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:১৫

প্রিন্ট

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত

পরিকল্পনা ছিল হাওয়া ভবনের, পৃষ্ঠপোষক বিএনপি সরকার

পরিকল্পনা ছিল হাওয়া ভবনের, পৃষ্ঠপোষক বিএনপি সরকার
অনলাইন ডেস্ক

২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার যে ষড়যন্ত্র, তার মূল পরিকল্পনা হয়েছিল হাওয়া ভবনে। নৃশংস এই হামলায় পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকার। মামলার রায় ঘোষণার সময় পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেন ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন।

তিনি বলেন, রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে রাজনীতে বিরোধী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার প্রয়াস কেন, এটা কাম্য নয়। বুধবার দুপুরে গ্রেনেড হামলা মামলা রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক এ কথা সব বলেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতা নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কিন্ত এর পরও ষড়যন্ত্র থেমে না থেকে তা চলমান থাকে। তাৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলা ছিল বিরোধীদলকে নেতৃত্ব শূন্য করার অপচেষ্টা।

এই মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনা হয়েছিল হাওয়া ভবনে।

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন যে, পচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে যেভাবে নেতৃত্বশূণ্য করার চক্রান্ত হয়েছিল, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূণ্য করতে শেখ হাসিনাসহ দলের জেষ্ঠ্য নেতাদের হত্যার উদ্দেশে ২০০৪ সালের একুশ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। ওই হামলায় ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু ঝড়ে যায় ২৪ টি তাজা প্রাণ। আর হামলার পরিকল্পনা হয় হাওয়া ভবন থেকে।

বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মুফতি হান্নান, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মাওলানা তাজউদ্দিন মিলে হামলার ছক আঁকেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল জানান, রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন হাওয়া ভবন এক ও অভিন্ন লক্ষে একত্রিত হয়ে তারেকরহ এই কাজটা সংঘটিত করেছে।

হাওয়া ভবন সম্পর্কে আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়য়ে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘তারা এক ও অভিন্ন উদ্দেশে এই ষড়যন্ত্র করে আইনের আশ্রয়ে এই অপরাধীদের সোপর্দ না করে তারা এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কাজ করেছে।’

এরআগে বেলা ১২টার দিকে ওই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। এছাড়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরো ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এই রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর আগে সংঘটিত নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিচারিক আদালতে শেষ হলো।

২০০৪ সালের একুশে আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে দলীয় সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভী রহমান'সহ ২৪ জন, আহত হন বহু মানুষ।

এ ঘটনায় পরদিন রাজধানীর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। তদন্তের নামে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির জজ মিয়া নামে একজনকে আটক করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে গ্রেনেড হামলার স্বীকারোক্তি আদায় করার ঘটনা নাটকীয়তার জন্ম দেয়। গণমাধ্যমে জজ মিয়ার আসল পরিচয় বেরিয়ে এলে থমকে যায় এ মামলার তদন্ত।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবারো শুরু হয় এ মামলার তদন্ত। হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানকে গ্রেফতারের পর তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, ২০০৮ সালের ৯ জুন জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান সহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় সিআইডি। শুরু হয় বিচার।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালতের নির্দেশে আবারো অধিকতর তদন্ত হয় আলোচিত এ মামলার। মুফতি হান্নান আবারো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে হামলার নেপথ্যে বিএনপি নেতা পলাতক তারেক রহমানের নাম উঠে আসে। তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক, বাবরসহ আরো ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২০১২ সালের ১৮ই মার্চ শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় বিচারকাজ।

বিচার চলাকালে মামলার অন্যতম আসামি মুফতি হান্নানসহ তিনজনের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হলে বিচার থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়। ৪৯ আসামির মধ্যে বাবরসহ ২৩ জন আসামি কারাগারে আছেন, ১৮ জন পলাতক এবং ৮ জন আছেন জামিনে। আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে ২২৫ জন ও আসামিপক্ষে ১২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এতে সময় লাগে ১১৯ কার্যদিবস।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত