ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০১৮, ১৬:৫৬

প্রিন্ট

গল্প- 'সিয়াইনা' (প্রথম পর্ব)

গল্প- 'সিয়াইনা' (প্রথম পর্ব)
প্রতীকী ছবি
সানজিদা সালাম আনিকা

ঝুম বৃষ্টি। সিয়াইনা বর্ষণ দেখছে। প্রাসাদের মতো একটি পরিত্যাক্ত বাড়ির পেছনের ঘরে বসে আছে ও। ওর এই বাড়িতে আসা এক সপ্তাহও হয়নি। নতুন বাড়িতে মন টিকে না ওর। কেমন যেন বিষণ্ণতা হয়। তাই এই কয়দিন বেশীর ভাগ সময় বাইরে বাইরে ঘুরেই কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ দুপুর থেকে ঝড় উঠেছে। তারপর শুরু হল বৃষ্টি।

যদিও ঝড়ে গরীব মানুষদের ঘর ভেঙে যাওয়াটা সিয়াইনাকে অনেক দুঃখ দেয় তবুও ঝড়-বৃষ্টি অনেক পছন্দ ওর। আর এরকম আবহাওয়ায় বাড়িটির প্রতি মুগ্ধতা আরো বেড়ে গেছে ওর। জানালার ধারে বসে বসে ভাবছে যে এই বাড়ির প্রাক্তন মালিক হয়তো খুব বোকা নইলে একটু বেশিই চালাক। নইলে কি এই প্রাসাদের মত বাড়িটি কেউ এতো কম মূল্যে বেচে? যদিওবা এই বাড়িটি একদম জঙ্গলের মধ্যে।

প্রাইভেট গাড়ি না থাকলে এখানে থাকা অসম্ভব। কারণ এদিক থেকে কোনো যানবাহনই চলে না। এই জঙ্গলের বাইরে থেকে বোঝার উপাই নেই যে এর মধ্যে ওতো সুন্দর একটা ছবির মত বাড়ি আছে। তাছাড়াও এইদিকে কেউ আসার চিন্তাও করে না। সবার মুখে শোনা যায় এখানে নাকি ডাকাত আর খারাপ আত্মাদের আস্তানা। একে তো জনবসতি থেকে এতো দূরে বাড়িটি। তারপর আবার এসব আজগুবি কথা।

এসব কারণেই বাড়িটা বিক্রি হচ্ছিল না। আর এই বাড়ির মালিক স্বপরিবারে বিদেশ চলে যাচ্ছিল। এই দেশে আর ফিরবে না কখনো। তাই এতো কম মূল্যেই এই প্রাসাদসম বাড়িটি বিক্রি করে দিলো। সিয়াইনা এতোটুকুই জানে। কিন্তু এই জায়াগায় বাড়ি বানানোর কারণ এখনো জানে না সিয়াইনা। সবাইতো ওর মত অদ্ভুত না। তাহলে কেনো এমন একটা জায়গায় এই প্রাসাদ বাড়িটি বানিয়েছিল এর প্রাক্তন মালিক? বা এটাও হতে পারে বাড়িটি অনেক পুরাতন। উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়িটি পেয়েছিল এর প্রাক্তন মালিক। তার পূর্ব পুরুষেরা যখন এটি বানায় তখন এই এলাকা হয়তো জনবসতি পূর্ণ ছিল। এসব ভাবতে থাকে সিয়াইনা। এর প্রাক্তন মালিক বেচারি এটি বিক্রির জন্য কত চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রাসাদের মত আলিসান হলে কি হবে? এর অবস্থান দেখে কে কিনবে এটা। তারপর আবার এতো আজগুবি কথা আছে এ নিয়ে।কিন্তু সিয়াইনা আর সবার থেকে আলাদা। মানুষ হলেও কাজ কারবার খুবই অদ্ভুত। জনবসতি থেকে দূরে থাকতেই ওর বেশী ভালো লাগে। ভ্যাম্পাইয়ারের মত সারা রাত এখানে ওখানে ঘুরে বেরাই। সূর্যের আলো একদম সহ্য হয়না সিয়াইনার। তাই দিনে খুব কম বের হয়। সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়।

এখন ও জানালার ধার ঘেঁষে বসে বৃষ্টি দেখছে। এই ঘরটির পেছনে একটি সুইমিংপুল আছে। পুলের পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা পরছে। সিয়াইনা অনেকক্ষণ ভিজেছে বৃষ্টিতে। ঘন্টাখানেক তো হবেই। এখন বাইরে অনেক ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তাই ভেতরে বসে বসে কফি খাচ্ছে সে।

পানিতে সাতার কাটতে সিয়াইনার অনেক ভালোলাগে। কিন্তু পুকুর, নদী এসব পানিতে নামলে ভয় লাগে। তাই সুইমিংপুল টা থেকে অনেক ভালো হয়েছে ওর। সিয়াইনা যদিও আধুনিক মানসিকতার। তবুও পুরনো বাড়িগুলো ওর অনেক পছন্দ। সুইমিংপুলটাও আগেকার যুগের প্রাসাদের সুইমিংপুলের মতো করে সাজিয়েছে। অনেক ধরনের ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুলের পানিতে। তাছাড়া শীতের সময় আসলে মাঝে মাঝে কিছু প্রদীপও জ্বালিয়ে ভাসিয়ে দিবে ও এই পানিতে। বাড়িটা অনেক উঁচু। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় একটা বিরাট বড় হলঘর। হলঘরের পাশে রান্না ঘর। তার পাশে আবার কিছু ছোটো ছোটো ঘর। সম্ভবত কাজের লোকদের জন্য। হলঘরের মাঝদিয়ে উঠে গেছে একটি আঁকাবাঁকা সিরি। সেই সিরি দিয়ে উপরে উঠে গেলে দেখা যাবে বড় বড় দশটি কক্ষ। বাড়িতে তেমন আসবাবপত্র নেই। শুধু দুটি খাট, একটি ড্রেসিং টেবিল, একটি পড়ার টেবিল, মেহমান দের জন্য একটি সোফা সেট, সোফার সামনে রাখার জন্য একটি ছোটো টেবিল আর কিছু রান্নার সামগ্রী মাত্র। বাড়ির মালিক এগুলো কিচ্ছু নেয়নি। আর এইগুলোই যথেষ্ট সিয়াইনার জন্য। বরং আরো বেশী হয়ে যায়। আজ তাকে নিজেই রান্না করে খেতে হবে। এই এলাকায় দিনের বেলায়ও কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে কোনো ডেলিভারি বয় আসবেনা। আর আজ সিয়াইনার বাইরে যেতে একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না। তাছাড়াও আজ আর বাইরের খাবার খেতে ইচ্ছা করছেনা ওর। তাই নিজেই রান্না করবে ভেবেছে। ইন্টারনেট কানেকশন টা অন করলো সিয়াইনা। বাসাই তার মায়ের রান্না ঘরে সবার ঢোকা নিষেধ ছিল। তাই রান্না শেখা হয়নি কখনো। এখন ইন্টারনেট থেকে রেসিপি বের করে রান্না করতে হবে। কোনোরকম কয়েকটা স্যান্ডুইচ বানাতে পারলো সিয়াইনা। একটা হাতে নিয়ে বাকিগুলো ফ্রিজে ভোরে রাখলো ও। তারপর হাতের স্যান্ডুইচ টা খেতে খেতে পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো সিয়াইনা। কেনার পরেও একবার পুরো বাড়ি ঘুরে দেখেছিল আজ আবার ভালোভাবে দেখবে। ও যেই কক্ষে থাকে তার আশে পাশের রাজকীয় কক্ষগুলো খুলে দেখা শুরু করলো ও। ওর ঘর থেকে তিন ঘর পরে যেই কক্ষটা ওটাতে পায়চারি করার সময় হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটে গেলো। ওর আর ওর পাশের কক্ষ বাদে অন্য কোনো কক্ষে কোনো আসবাবপত্র নেই। এই কক্ষেও নেই। হাটতে হাটতে হঠাৎ একটা শব্দ শুনে থেমে গেলো সিয়াইনা। দেখলো, এই ঘরের পেছনের দেয়াল থেকে একটি দরজার মত অংশ সরে গেলো। ওইপাশে এই কক্ষেরই প্রতিচ্ছবি দেখে সিয়াইনা ভাবলো যে ওটি একটি আয়না। কিন্তু কেউ কেনো একটি আয়না এমন গুপ্ত করে রাখবে কেনো?

খুব অবাক হলো সিয়াইনা। ও আয়নাটার দিকে এগিয়ে গেলো। এই আয়নায় যেন ওকে আরো সুন্দরী দেখাচ্ছে। ও আয়নাটার একটু কাছে এগোতেই কলিংবেলটা হঠাৎ বেজে উঠলো....

(চলবে...)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত