ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫ অাপডেট : ২৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:২১

প্রিন্ট

গল্প-'সিয়াইনা' (দ্বিতীয় পর্ব)

গল্প-'সিয়াইনা' (দ্বিতীয় পর্ব)
সানজিদা সালাম আনিকা

সিয়াইনা খুবই অবাক হলো। এতো রাতে এই জঙ্গল বাড়িতে কে আসবে? দরজা খুলতে যাওয়ার সময় আবার ওই জায়গাটায় পা পড়লো। আর ওই গুপ্ত আয়নাটা আবার দেয়ালের পেছনে ঢেকে গেলো। সিয়াইনা ভালো করে ওই জায়গাটা চিনে রাখলো। তারপর দরজার কাছে গিয়ে ডোর ভিউয়ার দিয়ে বাইরে দেখলো। এতো রাতে এরকম জায়গায় না দেখে দরজা খোলা বিপদজনক হতে পারে। কিন্তু ওপাশে কাউকে দেখতে পেলোনা সিয়াইনা। কোনো ডাকাত টাকাত নাতো? লুকিয়ে নেই তো? সিয়াইনা আশেপাশে দেখার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো। দোতালায় যে ঘরটা দরজা সোজা ঠিক উপরে সেখানে গিয়ে আস্তে করে জানালা টা খুলে দেখলো।

নাহ, দরজার আশে পাশে কেউ নেই। যতদূর দেখা যায় কোথাও কেউ নেই। তাহলে কলিংবেল টা বাজালো কে? শহরের মধ্যে হলে ভাবা যেত যে কেউ হয়তো মজা করে কাজটা করেছে। কিন্তু এখানে তো বহুদূর পর্যন্ত কোনো মানুষের চিহ্নমাত্র নেই। সিয়াইনা ভেবেই নিলো যে কাজটা কোনো চোর-ডাকাতেরই হবে। ভাগ্যিস সে দরজা খোলেনি। এমনিতে এই বাড়ির নিরাপদত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। দরজা জানালা ভেঙে ঢোকা কারো পক্ষে সম্ভব না। তাও সিয়াইনা ওর চাকু, ক্লোরোফর্ম, সেফটি স্প্রে সব কাছে রেখে দিলো।

কোনোভাবেই আজ রাতে দরজা খোলা যাবে না। এর মধ্যে সেই আয়নাটার কথা প্রায় ভুলেই গেলো। আজ রাতটা খুব সতর্ক থাকতে হবে। ঘুমানো যাবেনা। গানটান শুনেও সময় কাটানো যাবে না। সিয়াইনা ওর নতুন উপন্যাস টা লেখার চেষ্টা করলো। কিন্তু কলিংবেল বাদে আর কিছুই মাথায় আসছেনা।

অগত্যা একটা বই নিয়ে পড়তে শুরু করল সে। আজ এই বইটার শেষ পর্যন্ত পড়েই উঠতে হবে। পড়তে পড়তে রাত প্রায় সাড়ে চারটার দিকে ও ঘুমিয়ে পড়লো। প্রায় সাথে সাথেই স্বপ্নে দেখলো ওই আয়নাটা। ওই আয়নাটার ভেতরে ও ঢুকে পড়েছে। ওইপাশে যেন আরেকটা দুনিয়া। আয়নার ওইপাশে ওই ঘরটাতেই সে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানেও এই আয়নাটাকে দেখা যাচ্ছে। আয়নায় নিজেকে রাজকীয় পোশাক পরা অবস্থায় দেখতে পেল সে। আগেকার যুগের রাজকন্যারা যেমন পরতো ঠিক তেমন। মাথায় একটা ছোটো তাজ। গায়ে অনেক মণিমুক্তার গহনা। ঘরটার বাইরে অনেক হইচই। সিয়াইনা বাইরে চলে গেলো। পুরো বাড়িটাতে গিজগিজ লোকজন। বের হতেই দুজন দাসী এসে ওর কাছে হুকুম চাইলো আর ওকে রাজকন্যা বলে সম্বোধন করলো। তারপরের ঘটনা অস্পষ্ট। কীসের মধ্যে কী হচ্ছে সিয়াইনা কিছুই ঠিকমত বুঝতে পারছেনা। একজন সুদর্শন যুবক এসে ওর হাত ধরে ওকে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে গেলো। তারপর ওরা নাচ আরম্ভ করলো। এখন পুরো হলঘরটা জুড়ে নাচের আসর। সবাই যার যার সঙ্গীর সাথে নাচ করছে। সবার পরনে রাজকীয় পোশাক।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো সিয়াইনার। সাথে সাথে উঠে বসে পড়লো। স্বপ্নটা ভেঙে গেলেও রেশ এখনো কাটেনি। সিয়াইনা ভালোভাবে মনে করার চেষ্টা করলো। কত সুন্দর ছিল স্বপ্নটা। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আযান কি হয়ে গেছে? অবশ্য এ বাড়িতে তো আযানের শব্দ আসেনা। বহুদূর পর্যন্ত কোনো জনবসতি নেই। কোনো মসজিদ নেই। কেউ থাকেই না, আযান দেবে কে?

সিয়াইনা ভাবলো, এ সবই তার অবচেতন মনের কল্পনা। কিন্তু তাও কী একটা ভেবে সাথে সাথে বিছানা উঠে পড়লো। তারপর হাত মুখ ধুয়ে ওই গুপ্ত আয়নার ঘরটাতে চলে গেলো। তারপর মেঝের ওই নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ালো। দেয়ালের নির্দিষ্ট অংশ খুলে গিয়ে গুপ্ত আয়নাটি বেরিয়ে এলো। ও আয়নার দিকে এগিয়ে গেলো। আয়নার ওপর হাত রাখতেই ও চমকে উঠলো। ওর আঙুলের একটু খানি যেন আয়নার মধ্যে ঢুকে গেছে। ওটুকু আর দেখা যাচ্ছে না। আর ওর আঙুল যেন আয়নাতে ঠেকেইনি। কোনো সীমারেখার অনুভূতি নেই। এইখানে যেন কিছুই নেই। তখনই ওর মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো,

'এথায় শুধু চোখের ধাঁধা, নেই যেতে কোনো বাধা।'

সিয়াইনার চোখগুলো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। ও আয়নার মধ্যে দিয়ে ঢুকে গেলো।

সিয়াইনা ওপাশে যেয়ে দেখলো একটি রাজকীয় খাট, ড্রেসিং টেবিল, আরো কত রাজকীয় জিনিস দিয়ে ঘরটা সাজানো। সব যেন একটু আগে দেখা স্বপ্নের মত। ড্রেসিং টেবিলের ওপর অনেক গহনা আর সাজগোজের জিনিস। তার সাথে ওই তাজটাও আছে যেটা ও স্বপ্নে নিজের মাথায় দেখেছিলো। সিয়াইনা ওটা তুলে নিজের মাথায় পরে নিলো তারপর দরজা খুলে বাইরে তাকালো। হলঘরটায় বেশি লোকজন নেই। কয়েকজন দাসী যাতায়াত করছে। সবই আলাদা। এ কোন দুনিয়া? সিয়াইনা দরজাটা বন্ধ করে দিলো ড্রেসিং টেবিলের ঠিক বিপরীত দিকেই ওই আয়নাটা যেটা দিয়ে ও এসেছে। হঠাৎ ওর মনে হলো কিছু মানুষ যেন এই ঘরের দিকেই আসছে। ও আর কিছু ভাবতে পারলো না। ওই গুপ্ত আয়নার মধ্যে দিয়ে ফিরে এসে ওই নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে আয়নাটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের ঘরে চলে আসলো। আর মনে মনে বলতে থাকলো যে এ সব স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই শেষ হয়ে যাবে। এগুলো সত্যি হতে পারেনা। কখনো না। এসব ভাবতে ভাবতে সিয়াইনা ওর মাথাটা চাপড়ে ধরলো আর তখনই বুঝতে পারলো ওর মাথায় কিছু একটা আছে। ওইটা হাতে নিয়ে চোখের সামনে আনতেই দেখলো সেই তাজ! ও অবাক হয়ে চেয়ে থাকলো...

(চলবে...)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত