ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ অাপডেট : ২৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ২২:৩১

প্রিন্ট

বহুগামী ঘোড়া : রুদ্রাক্ষ রায়হান

বহুগামী ঘোড়া : রুদ্রাক্ষ রায়হান
রুদ্রাক্ষ রায়হান

ক্লাউন

সার্কাসে যে মানুষটি খেলা দেখাত

তার ইচ্ছামৃত্যুর দিনে আমার জন্ম হয়েছে

মা বলেছেন, বড় হয়ে আমি ক্লাউন হবো

পত্রিকার থানা প্রতিনিধি সেই খবর কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়েছে

সেই থেকে আজ অবধি বিষণ্ণতার দিন।

রাস্তায় নামলেই আমরা মানি না চিৎকারে মূখর হয়ে উঠি

এই জনপদে মেনে নেওয়া পাপ

তাই আমরা সকাল দুপুর মিছিল নামাই খুব

আমাদের ইশকুলে রেডিমেড দেশপ্রেম বিক্রি হয়!

আমরা রাষ্ট্র কে গালি দেই!

আর ধর্ষিতা মেয়েটি কেও!

শুধু ধর্ষক আর নেতাদের ভয় পাই

তাদের সামনে গেলে বলি আস্লামু আলাইকুম,

কেমন আছেন? বাড়ির সবাই ভালো তো?

আমার জন্মের দিনে সার্কাসে খেলা দেখানো মানুষটি মারা গিয়েছিল

মা বলেছেন, তিনি-ই আমার প্রকৃত বাবা!

আমি তাই অনেক বড় ক্লাউন হবো।

তোমার বাড়ি

স্বর্গের যে বাড়িটায় তুমি থাকতে,

আমি প্রতিদিন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই!

এখনো ব্যালকনিতে অনেকেই রোজ আসে,

কিন্তু অপ্সরাদের কেউ আমায় চেনে না।

এক যে মনপুরা দ্বীপ; আমি তার ঘাস সবুজ মাঠের বুকে হাটি

তুমি নেই, তবু তোমার মুখের ছায়া হেসে ওঠে।

আর আমি জল ছুঁয়ে কিছুই হয়নি ভাব ধরি।

আমি ছাড়া কে আছে বলো এমন উত্তাল সমুদ্র দেবে?

এমন ঢেউ, মুগ্ধ সাঁতার কই পাবে তুমি?

মনে মনে!

শুধু নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ ছাড়া সম্পদ কিছুই নেই!

তাতেই যদি সুখী হতে চাও তবে ফের দেখায় স্বপ্ন নিয়ে এসো

বিবর্ণ স্বপ্নেরা রঙিন হলে বেঁচে থাকা সহজ হয়ে যায়।

হোয়াইট বোর্ড

আমরা সূর্য ভেবে এক অস্থায়ী মশালের পিছে ছুটছি;

আমাদের পেছন পেছন ছুটে আসছে তুমুল আঁধার!

আমরা দিকভ্রান্ত মানুষেরা সূর্যকে হত্যা করার পর মশালের পূজা করি;

অথচ শপথ করেছিলাম, আমরা অবিনশ্বর কোন কিছু চাইবো।

বিব্রত বাতাসের তোড়ে উড়ে গেছে সমস্ত সম্ভ্রম

কথা ছিলো সকাল এলেই কাপড় তুলে নেব

কিন্তু আমাদের পৃথিবী সকাল চিনতে ভুলে গিয়েছিলো তাই

আমরা এখন রাত্রির পূজা করি।

আমরা ভেবেছিলাম পথগুলো ঠিক হয়ে যাবে!

কেউ একজন শিখিয়ে দেবে মসৃণ হাঁটাচলা

কেউ একজন এখনো আসেনি

আমাদের চারপাশে কাঁটা দিয়ে বেড়া দেওয়া আছে।

এখন গারদ সময় যাক!

স্থায়ী ইমপ্রিজনমেন্টই এখন একমাত্র নিয়তি!

এখন আমরা রুটির সাথে হেমলকের সালাদ ঘষে খাই;

অবিরাম ঘৃণা বুকে মৃত্যুও সরে গেছে দূরে।

গেরস্তের সংসার

গেরস্তে উঠানে থাকে কইতরের খোঁপ! হাঁস মুরগীর খাঁচা আর লাউ কুমড়ার মাঁচা

দুধেল গরু থাকে গোয়ালে, ছাগলের পাল থাকে দড়ি দিয়ে বাঁধা! গেরস্তের বউয়ের ভরা বুক, চাঁন্দের মতো মুখ সাদা

গেরস্তের মাঠে থাকে ধান, বউ ভাত আর পান নিয়ে মাঠে যায়!

গেরস্তের মনে বড় সুখ, গেরস্ত ভাত খাওয়ার শেষে পান খায়

গেরস্ত কারিগর বিড়িতে টান দেয়।

গেরস্তের বাচ্চারা ইশকুলে যায়, পড়া পড়ে রাতে। গেরস্তের পিঠে বুকে তেল ঘষে বউ নিজ হাতে।

শেষ রাতে বউ ডাকে বুকে!

গেরস্ত পিঠে চুমু খায়, ঠোঁটে চুমু খায়!

বউ পাখি কাতরায় সুখে,

ফিসফাস সুরে কথা কয়।

গেরস্ত সাঁতরায়!

দাঁড় বায় নোনা নোনা জলে!

কল কল ছল ছল

গেরস্তের নৌকা টা চলে।

আর ফজরের কালে

হিজলের ডালে রেখে কাপড়ের স্তুপ

বউ দেয় ঝুপঝুপ ডুব।

চুলায় ভাত সিদ্ধ দেয়

খাওয়া হলে গেরস্ত মাঠে চলে যায়।

মাতার কিরা

গুটগুইট্টা রাইতের আন্দারে,

দোগরের মইদ্দে দিয়া যাও

তোমার গোন্দ আমার নাহে লাগে

তুমি বন্দু আকিজ বিড়ি খাও।

হেশুম আমার পাশে পোলার বাপে

বেউশ অইয়া খত খত নাক ডাহে

তুমি নাগর শিস্ বাজাইয়া আডো

তোমার লইগ্গা পরান পোরতে থাহে।

তুমি মোরে মাইরা হালাও নাগর

নাইলে লইয়া উজান দ্যাশে যাও

ক্যামনে আছি আল্লা মাবুদ জানে

সোনার শরীল পোড়তে আছে ফাও।

না গ্যালে মুই গলায় দিমু রশি

শইল্লে যদি শান্তিই না পাই

তাইলে নাগর বিয়া কেনে দিলো

মেবাই মোরে দনি জামাই চাই?

লাজ শরমের গুষ্টি কিলাই আমি

কালা নাগর ভালা কইরা কও

যাইবা কি না দূরের দ্যাশে নিয়া

না গেলে তুই আমার মাতা খাও।

এই শহরে মানুষ নেই

এই যে কালো পিচের রাস্তা!

এইখানে ধূলো ওড়া পথ ছিল

মেঠো পথে গাঁয়ের বধূ পায়ের চিহ্ন একে যেত

কোমরের বিছা নেড়ে হেঁটে যেত বেদেনীর দল

উড়ে যেত পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁক

এইখানে খরস্রোতা থেমে গিয়ে নিয়েছিল বাঁক।

এই যে মস্ত ইটের শহর!

এইখানে ছিল না অযথা কোলাহল

হলাহল ছিল না কখনো

রুপকথা ঠাকুমার ঝুলি,

গল্পেরা থাকত সাজানো।

এইখানে এক গ্রাম ছিল

সাদেকপুর এর নাম ছিল,

ভাটিয়ালির গান ছিল

খর¯্রােতার প্রাণ ছিল।

নদীতে গাঙ-চিল ছিল

নদীর তীরেই বিল ছিল,

কাঁদামাটির চর ছিল

ঠুনকো মাচাঙ ঘর ছিল।

তাল পুকুরের পাড় ছিল

বরাক বাঁশের ঝাঁড় ছিল,

কূহু-কেকা তান ছিল

মিষ্টি পাখির গান ছিল।

সহজ যত লোক ছিল হরেক রকম ঝোঁক ছিল।

এখন নেই, নেই কিছু নেই!

সভ্যতা কেড়ে নিয়ে গেল।

এখন!

জোৎস্নাস্নাত রাত্রি নেই

উদাস পথের যাত্রী নেই।

হাসি কিংবা কাঁদন নেই মায়ার নিগূঢ় বাঁধন নেই।

ইচ্ছে রঙয়ের ফানুস নেই এই শহরে মানুষ নেই।

এই শহরে মানুষ নেই এই শহরে মানুষ নেই।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত