ঢাকা, শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮, ৯ আষাঢ় ১৪২৫ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ২২:৪৩

প্রিন্ট

বিচারপতি সায়েমের বই পর্যালোচনা

জিয়ার ক্ষমতা দখল : নির্বাসনে গণতন্ত্র

জিয়ার ক্ষমতা দখল : নির্বাসনে গণতন্ত্র
মুস্তফা মনওয়ার সুজন

বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এক সময় দেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ষড়যন্ত্র, হত্যা, ক্যু’র সাক্ষী। তাঁর চোখের সামনে ঘটেছে ইতিহাসের জঘন্যতম বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড। এরমধ্যে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান, জিয়াউর রহমানের ‘নির্লজ্জ’ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শত শত লাশের ওপর দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল। আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। ১৯৭৫ এর ৬ নভেম্বর থেকে ৭৭ এর ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ’ নামক গ্রন্থে বড় বড় কয়েকটি ঘটনার খুবই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেছেন। বইটি পরে ‘বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি’ নামে অনুবাদ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হলেও এ নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। এড়িয়ে গেছেন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ডের মতো অনেক ঘটনা। এর কারণ অসহায়ত্ব কী-না তা ভিন্ন আলোচনা। তবে তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন জিয়াউর রহমানের নৈতিক দীনতা, অবৈধ ক্ষমতা দখল এবং জিজ্ঞাংসা; বিচারপতি আবদুস সাত্তারের বিশ্বাসঘাতকতা ও মীর জাফর-খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সাদৃশ্য এবং তৎকালীন রাজনীতিবিদদের মেরুদণ্ডহীনতা। চতুর্থ সংশোধনী ও বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসন কায়েমেরও সমালোচনা করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম তাঁর গ্রন্থে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ‘সবচেয়ে’ রহস্যময় চরিত্র জিয়াউর রহমানের অন্তরালের কিছু বিষয় উন্মোচন করেছেন। লেখক এই গ্রন্থে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা দখলের বর্ণনা দিয়েছেন। শুধু কমনওয়েলথ সম্মেলনে করমর্দনের সুযোগের লোভে সিটিং রাষ্ট্রপতিকে বাড়তি একদণ্ড সময় না দিয়ে ক্ষমতা কেড়ে নেন জিয়া। ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ’ গ্রন্থে লেখক বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার আগমুহূর্তে আমি জিয়াকে বলি, আমি যেহেতু নির্বাচন করে যেতে পারলাম না। আমি তাকে অনুরোধ করবো যেনো তিনি নির্বাচন দেন। তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন যে, তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন। শুনে আমি খুশি হই। কিন্তু আমি তখন ভাবতে পারিনি যে, নির্বাচনে তিনি নিজেই অংশ নেবেন। সেরকম ক্ষেত্রে সেনা প্রধান থাকা অবস্থাতেই এবং সামরিক আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হয়েই তিনি নির্বাচন করবেন এবং সেই নির্বাচনে নিজে অংশগ্রহণ করবেন এমন চিন্তা তখন আমার মাথায় আসেনি।

নিজরে অবস্থান পাকাপোক্ত করতে গিয়ে জিয়া নির্বাচন অনুষ্ঠানে জন্ম দিয়েছিলেন অনেক উদ্ভট, হাস্যকর ও অবিশ্বাস্য ঘটনা। এ ব্যাপারে আলোচ্য বইতে আছে, ‘বস্তুত জিয়া তার অবস্থান সংহত করার উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে একটা গণভোট করে ফেলেন। তার প্রতি এবং তার ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি ভোটারদের আস্থা আছে কিনা এই ছিল গণভোটের বিষয়। কিন্তু সেই গণভোটে হ্যাঁ বাক্সে এতো বেশি ভোট পড়ে যে, জনগণ সেই ফলকে হাস্যকর ও অবিশ্বাস্য মনে করে।’

রাষ্ট্রপতি সায়েম তাঁর বইতে বিচারপতি আবদুস সাত্তারের হীনমন্যতা ও লোভ-লালসার কথা ধাপে ধাপে তুলে ধরেছেন। আলোচ্য গ্রন্থ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সায়েমের বিশেষ সহকারী বিচারপতি সাত্তারকে পলাশীর মীরজাফর এবং ১৯৭৫ সালের খন্দকার মোশতাক ধারা মানুষই মনে হয়েছে। জনাব সাত্তার তার পুরো সময়টা রাষ্ট্রপতির আশপাশে থেকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রেই লিপ্ত ছিলেন; যুক্ত ছিলেন জিয়াউর রহমানের যাবতীয় চক্রান্তের সঙ্গে।

লেখক বইয়ের শুরুতেই বলেছেন, ‘বঙ্গভবনে আমার দিনগুলোর শেষ দিকে মনে হতে থাকে, আমি ক্রমশ অক্ষম হয়ে পড়ছি। সেটা রাজনীতিক, স্থায়ী সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং অধিকাংশ উপদেষ্টার (বিশেষ সহযোগী বিচারপতি আবদুস সাত্তারসহ, যাকে আমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতাম) আচার ব্যবহারের জন্য। বিচারপতি সাত্তারের সেনানিবাস কানেকশন প্রসঙ্গে লেখক বলেন, ‘যখন আমি বঙ্গভবন থেকে চলে আসি, তখন জানতে পারি যে সহযোগীও সেনানিবাসে যেতেন।’ মেজর জেনারেল জিয়া দেশের রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতা গ্রহণের পর সাত্তার সাহেবকে পুরস্কৃতও করেছেন। লেখক বলেন, আমি বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহযোগীর (আবদুস সাত্তার) একটা পদোন্নতি ঘটে। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োজিত হন। প্রতিশ্রুত নির্বাচনের আগেই প্রেসিডেন্ট পদ থকে আমার ইস্তফা এমনিতেই বিভ্রান্তির কারণ হয়েছিল। বিশেষ সহযোগীর পদোন্নতি সেই বিভ্রান্তি আরো ঘোলাটে করে তোলে। জল্পনা কল্পনা হয়েছিল যে সেই পদোন্নতি অবশ্যই একটা কোনো কৃতকর্মের পুরস্কার ছিলো।’

বিচারপতি মোহাম্মদ সায়েম আলোচ্য গ্রন্থজুড়ে এদেশের তৎকালীন রাজনীতিকদের চরিত্রের দুর্বলতা তুলে ধরেছেন। তাদের অনেককে সাহসী, দৃঢ়, স্বাধীনচেতা বা আত্মনির্ভরশীল মনে হয়নি লেখকের কাছে। লেখকের মতে, বছরের পর বছর পরাধীন, শোষণ, পদলেহনের কারণে তাদের রাজনৈতিক স্বীয় সত্ত্বাটাই মরে গেছে। নষ্ট হেয় গেছে সাংগঠনিক সক্ষমতা। তাদের সেনানিবাস মুখীতা প্রকট। ভোটে জয়ী হওয়ার আত্মবিশ্বাস কারোই নেই। নির্মাণ বা বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখাতো দূরের কথা। অন্যদল বা ব্যক্তি ক্ষমতায় চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তাদের সেনা নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকে। নিজে ক্ষমতায় যেতে না পারলে সেনাবাহিনীকে দেয়াই শ্রেয় বলে মনে করেন রাজনীতিকরা। আর সামরিক সরকার থেকে পাওয়া নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা পেলেই তারা খুশি। এ কারণে অনেক রাজনীতিক মিলিটারি কানেকশান সবসময়ই চাঙ্গা রাখেন। লেখক রাজনীতিবিদদের প্রতি চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো দেশ শাসন করার যোগ্য কিনা এ ব্যাপারে ব্যাপক সংশয় ছিলো। দু:খের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এই সংশয় এখনও রয়ে গেছে। রাজনীতিকরা আলাপ পরামর্শের জন্য সেনানিবাসের যেতেন। বঙ্গভবনে থাকতেই আমি তা দেখেছি। অবশ্য আওয়ামী লীগ সেখানে যেত না।’ ‘... এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, রাজনৈতিকগণ যেন অভ্যাস বশত একটা তৈরি সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান এবং যে ব্যক্তি সেই সরকার গঠন করেন তার সেবা করতে চান।’

লেখক সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসন কায়েমের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে একটি অনুবিধি সংযুক্তির ঘোর বিরোধীতা করেন। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথাযথ সম্মান, আস্থা ও বিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করেছেন। লিখেছেন, ‘এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ বা মার্চের শুরুতে শেখ মুজিব আমাকে বলেন যে, চতুর্থ সংশোধনী একটি সাময়িক পদক্ষেপ। তিনি সংবিধানকে সংশোধনীর পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন। আমার এরকম ভাবার কোন কারণ ছিলো না যে, তিনি তখন যা বলেছিলেন তা তাঁর মনের কথা ছিলো না। সংসদ ছিল তাঁরই অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছিলেন তাঁর দলের।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়া অবৈধভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে। নির্বাসিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বছরের পর বছর লাড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। অপেক্ষা করতে হয়েছে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন পর্যন্ত।

পর্যালোচক: সাংবাদিক

জেডএইচ/

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত