ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৮, ১৭:৪৬

প্রিন্ট

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা কার হাতে?

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা কার হাতে?
সাধন সরকার

অনেক জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা-সমালোচনার পর ‘এনটিআরসিএ’ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) কর্তৃপক্ষ গত ১০ জুলাই নিবন্ধিত শিক্ষকদের (১ থেকে ১৩তম) ‘জাতীয় মেধাতালিকা’ প্রকাশ করেছে। এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের ফলে সারা দেশের প্রায় পাঁচ লাখের বেশি (স্কুল-কলেজ মিলিয়ে) নিবন্ধিত শিক্ষকদের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। এর আগে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের একেক সময়ের একেক সিদ্ধান্তে নানা সমালোচনাসহ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।

২০০৫ সালে এনটিআরসিএ গঠনের পর সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যোগ্য, উপযুক্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার কথা থাকলেও সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আদৌ পূরণ হয়েছে কি না সেটা এক বিরাট প্রশ্নের বিষয়! ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার ও টাকা-পয়সার লেনদেন খাটিয়ে বহু অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গেছেন! ২০১৫ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের হাতে গেলেও সমস্যার পাহাড় টপকে শিক্ষক নিয়োগে আলোর দিশা অধরাই থেকে গেছে। একদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শূন্য পদের চাহিদা কম আসা (এনটিআরসিএর গাফিলতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান শূন্য পদের চাহিদা দিতে চায় না, প্রতিষ্ঠানগুলো দিব্যি ম্যানেজিং কমিটির পরামর্শে খ-কালীন লোক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে!) অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে সমস্যার জটিলতা গভীর থেকে গভীরতর রূপ নিয়েছে।

সারা দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় হাজার হাজার শূন্যপদ থাকলেও কর্তৃপক্ষ থেকে গত প্রায় চার বছরে মাত্র ছয় হাজারের মতো শিক্ষক নিয়োগ (শুধু ২০১৬ সালে) দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদ শূন্য থাকার কারণে পাঠদানসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং পড়ছে। যথাসময়ে নিয়োগ না হওয়ায় লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী নিবন্ধিত শিক্ষকরা হতাশায় দিন পার করছেন। ১ থেকে ১২তম নিবন্ধিত শিক্ষকদের নিবন্ধন পরীক্ষা মোটামুটি একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হলেও ১৩তম নিবন্ধন থেকে নিবন্ধন পরীক্ষা সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে বিসিএসের আদলে (প্রিলি, লিখিত, ভাইভা) অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষামন্ত্রী ও এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ১৩তম নিবন্ধনধারীদের আলাদাভাবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ১৩তম নিবন্ধনধারীদের সঙ্গে এমন আচরণ (সরাসরি নিয়োগ না দেওয়া) কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রায় দু-তিন বছর ধরে চলা নিবন্ধিত শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে আর কোনো অজুহাত, খামখেয়ালি ও নাজেহালপূর্ণ সিদ্ধান্ত জাতি দেখতে চায় না। জাতীয় মেধাতালিকা প্রকাশের পরও লাখ লাখ নিবন্ধনধারীর কেউ-ই জানে না তাদের কবে, কোথায় ও কীভাবে নিয়োগ হবে। দ্রুত শূন্য পদের তালিকা প্রকাশ করে নিবন্ধনধারীদের মেধাক্রম অনুযায়ী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক। এতে নিবন্ধিত চাকরিপ্রত্যাশীদের হতাশা দূর হওয়ার পাশাপাশি বেকারত্ব ঘুচবে। এ ছাড়া সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠদানসহ সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমে গতি আসবে।

এনটিআরসিএর বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হতাশা সৃষ্টি ও সময়মতো শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের থেকে বাতিল করে আবার আগের মতো ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ কথা মোটামুটি সবাই জানে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব ও টাকা লেনদেনের কারণে অনেক অযোগ্য ও ন্যূনতম মেধাহীন লোকও নিয়োগ পেয়ে যায়। ঠিক একইভাবে যখন সরকার কলেজ জাতীয়করণ করতে যায়, তখন আবার অভিযোগ তোলা হয় যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের স্কুল-কলেজে দেওয়া হয়নি। তাই এনটিআরসিএর মাধ্যমে এখন থেকে যদি যোগ্য ও দক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের সময় যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকরাই এর আওতায় আসবে। এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি, এ কথা সত্য বটে। তবে এখনো সময় আছে জাতীয় মেধাতালিকা অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ দিয়ে ও সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করে আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ থেকে ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়া মানে আবার ক্ষমতার প্রভাব ও টাকা-পয়সার লেনদেনকে বৈধতা দেওয়া! ফলে আবার বেশি করে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হবে মেধাবী, সৎ ও যোগ্য নিবন্ধনকৃত শিক্ষকরাই।

শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে কোনো বাণিজ্য ও অসৎ কর্মকাণ্ড হলে তার খেসারত সারা জীবন পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়। তাই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের হাতে রেখে এখন জাতীয় মেধাতালিকা অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে আগামীতে প্রতি বছর দ্রুত সময়ের মধ্যে চাহিদামাফিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা করাই হবে সময়ের অন্যতম সেরা সমাধান।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট [email protected]

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত