ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫ অাপডেট : ৩৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ১৫:২৩

প্রিন্ট

শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ প্রয়োজন কেন?

শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ প্রয়োজন কেন?
মো. সাইদুল হাসান সেলিম

দেশের সরকারি হিসেবে ভর্তিকৃত (প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা) স্তরের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ৬৩% ঝরে পড়ে। বিষয়টি হাস্যকর বা মামুলি ব্যাপার না বরং সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে ভাবনার বিষয়। এই ঝরে পড়া বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীরা কোথায় অবস্থান করছে, নিশ্চয়ই আমার আপনার পরিবারে তথা সমাজে? অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা, এরাই সমাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং করবে। এদের পুনরায় মূল শিক্ষাধারায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি বিচ্যুতি চিহ্নিত করে, সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি বেসরকারি শিক্ষা ব‍্যয় আকাশ পাতাল ফারাক। যেখানে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন ৭ টাকা মাত্র, সেখানে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই শ্রেণির শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন ১৫০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা। অথচ শহরকেন্দ্রিক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে সরকারি কর্মকর্তা ও সমাজের ধনিক ও সম্পদশালী শ্রেণির মানুষের সন্তানরা। যেখানে সম্পদশালী শিক্ষার্থীদের নাম মাত্র খরচে সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এতে দেশের অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাধ‍্য হয়েই তারা অধিক খরচে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়া করতে বাধ্য হয় এবং অর্থাভাবে ঝরে পড়ছে।

অপরদিকে আমাদের সামাজিক জীবনব‍্যবস্থায় যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ফলে একক পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকে সাধারণত একজনই, তারা এই দুর্মূল্যের বাজারে পরিবারের ভরণপোষণের পর দুটি বা তিনটি সন্তানের শিক্ষা ব‍্যয় নির্বাহ করতে পারছে না। বেসরকারি শিক্ষার ব‍্যয় সাধারণ মানুষের সীমা অতিক্রম করেছে। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরা অধিক হারে শিক্ষা বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের বিশাল অঙ্কের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা বঞ্চিত রেখে জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব। আমাদের দেশে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মাধ্যমে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের স্বল্প খরচে শিক্ষা লাভের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

৫ লক্ষ শিক্ষক পরিবার, সাথে ২ কোটি শিক্ষার্থীর সঙ্গে ২ কোটি অভিভাবক, জাতীয়করণের দাবি গণদাবীতে পরিণত করতে আমাদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এটা শুধু শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির কোন আন্দোলন নয়, এই আন্দোলন মানসম্মত শিক্ষা ও ঝরে পড়া শিক্ষা বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন। আমি এই ন‍্যয় ও যৌক্তিক আন্দোলনে আমৃত্যু কাজ করে যাব, কারণ আমার উচ্চ শিক্ষা অর্জনে ঐ অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের অনুদান রয়েছে। তাই ঐ সাধারণ মানুষের সন্তানদেরও স্বল্প খরচে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে, এটা আমার ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার।

১৩/০৮/২০১৮ দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা (দ্বাদশ শ্রেণি) পর্যন্ত শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্ব ব্যাংক ৫২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে যেখানে বিশ্ব ব্যাংক কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেখানে আমাদের দেশের এক শ্রেণীর কুটিল বুদ্ধি বিক্রেতারা বলছেন শিক্ষা মানোন্নয়নের পরিমাপের একক কী? তাদের উদ্দেশ্য আমার প্রশ্ন, বুদ্ধি পরিমাপের একক কী?

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে রেখে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। দেশের সীমিত অর্থনীতির কথা বলে বলে শিক্ষাকে অবহেলিত করে রাখা হয়েছে যুগের পর যুগ। দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে অর্থনৈতিক অভাব নয়, সরকারি নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার অভাব। শুধুমাত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম ও অপচয় রোধ করা সম্ভব হলেই একযোগে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা স্তরকে জাতীয়করণ করা এখনই সম্ভব। বেসরকারি শিক্ষকদের পৌনে দুই'শ বছরের পুরাতন অনুদান প্রথার বিলুপ্তি ঘটাতে হবে। শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। মানসম্মত শিক্ষায় চাই দক্ষ ও গুনগত মানের শিক্ষক। শিক্ষাই জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি। চাই মানোন্নত শিক্ষা, চাই শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ। এই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ আন্দোলনে অগ্রণী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে শিক্ষকদেরই। দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষদের ও শিক্ষক কর্মচারীদের, বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের ন‍্যয়সংগত যৌক্তিক দাবির সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিনীত আহ্বান জানাই।

বাংলাদেশ ব‍্যাংকের গভর্নরের বাজার থেকে তোলা, একশত পঞ্চাশটি টাকার ঋণ পরিশোধ করতে না পারার আক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিয়ে আসুন, জাতীয়করণ আন্দোলনে অংশ নিয়ে আমাদের দায় বা ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত