ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ অাপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:৩২

প্রিন্ট

জীবনের চেয়ে যখন মৃত্যুর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়

জীবনের চেয়ে যখন মৃত্যুর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়
নিজস্ব প্রতিবেদক

আবুল হাসেম এক প্রবীণ নিবাসের অধিবাসীর নাম। তার বয়স মাত্র ৫০। প্রবীণ নিবাসের একজন সেবক জানান, নিবাসের যে কক্ষটিতে আবুল হাসেম থাকতেন সেই কক্ষে আরও তিন বৃদ্ধ থাকেন। তাদের মধ্যে একজন পক্ষাঘাত ও বাকপ্রতিবন্ধী রোগী। এক রাত আটটার দিকে পক্ষাঘাত বৃদ্ধ বিছানায় থাকলেও অপর দুজনের মধ্যে একজন ইবাদতখানায় নামাজে আরেকজন রাতের খাবার খেতে ওই সময় ডাইনিং কক্ষে ছিলেন। এই সময় শোয়ার খাটের পাশে থাকা জানালার রডের সঙ্গে পায়ের ব্যান্ডেজের কাপড় খুলে গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন বৃদ্ধ আবুল হাসেম।

রুমে থাকা দুজনের জন্য খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে দেখি জানালার সঙ্গে ফাস লাগানো অবস্থায় বৃদ্ধ আবুল হাসেমের দেহ খাটের উপর কাত হয়ে আছে। তিনি শেষ দিকে বারবার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু তার শেষ চাওয়াটা পূর্ণ হয়নি। এ ছাড়া পায়ের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলেন না হতভাগা হাসেম।

প্রবীণ নিবাসের কর্মকর্তারা জানান, ক'মাস ধরে পায়ের সমস্যায় ভুগছিলেন নোয়াপাড়া আমেনা-বশর বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা আবুল হাসেম। যা মাস খানেক আগে চরম পর্যায়ে পৌছায়। পরে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার পায়ের অবস্থা খারাপ দেখে বাম পাটি কেটে ফেলেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন এক বোনও। গত প্রায় দু'সপ্তাহ আগে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হাসেম আবার বৃদ্ধাশ্রমে ফিরলেও তাকে একটিবারের জন্যও কেউ বাড়ি নিতে আসেনি। যদিও উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের ফকিরটিলা গ্রামে নিজের স্ত্রী-সন্তান রয়েছেন। তার দুই ছেলে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী। অপর এক ছেলে স্থানীয় মাদরাসায় পড়ে।

নিবাসের কর্মকর্তারা আরও জানান, হাসপাতাল থেকে ফিরে বেশ কয়েকবার বাড়িতে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন আবুল হাসেম। পরে চিকিৎসাকালীন সময় পাশে থাকা বোনকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু পরে এসে নিয়ে যাওয়ার আশা দিয়ে তার সেই বোনও আর ফিরে আসেননি। এদিকে তার পায়ের ব্যথাও দিনদিন বেড়ে যাচ্ছিল। প্রায় সময় আবুল হাসেম ব্যথা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে কান্নাকাটি করতেন।

স্থানীয় ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য জানান, গত কয়েক বছর আগে আবুল হাসেমের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক বিষয়ে ঝামেলা হয়। সে সময় আবুল হাসেম নিজের বাড়ি ভিটা স্থানীয় একজনের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন। পরে নিজেই গিয়ে প্রবীণ নিবাসে আশ্রয় নেন। পরিবারের কেউ খবর না নিলেও মাঝে মধ্যে তার এক বোন প্রবীণ নিবাসে আবুল হাসেমকে দেখতে যেতেন। তার বাম পা কেটে ফেলার পর থেকে ডান পা-ও ধীরে ধীরে অচল হয়ে পরে। রাত-দিন পায়ের যন্ত্রণায় চিৎকার ও কান্নাকাটি করতেন তিনি। গত ক'দিন আগে তার বোন দেখতে এলে তিনি তাদের সঙ্গে বাড়ি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা কিছুদিন পর এসে তাকে নিয়ে যাবে বলে জানিয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ চার বছর ধরে প্রবীণ নিবাসে অবস্থান করলেও তার বোন ছাড়া স্ত্রী-পুত্র কেউ তাকে দেখতে আসেনি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রবীণ নিবাসের সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসেমের মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির স্বজনরা মরদেহ নিতে আসছেন বলে জানা গেছে। পরিবার যদি মরদেহ গ্রহণ না করেন সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা সম্পন্ন করে প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থায় মরদেহ দাফন করা হবে।

কখন মানুষের বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়ে এই প্রশ্নটা সবার হলেও উত্তরটা সবার জানা নেই। কোন মানুষ যখন তার মৌলিক চাহিদাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পরিচয়টা নিয়ে বেচে থাকতে চায়, পরিবারের মাঝে বাচতে চায়। সেই পরিচয়টাই যখন কেউ হারিয়ে বসে তখন তার কাছে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য নিঃশেষ হয়ে যায়। মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি, মানবতার প্রতি এবং নিজের সত্বার প্রতি আমাদের অবহেলাই সেই ব্যবধান দূর করে দেয়। যা ঘটেছে বয়োজ্যেষ্ঠ আবুল হাসেমের ক্ষেত্রে। যখন মরদেহের স্বীকৃতিটিও পরিবার থেকে পাওয়া যাবে কিনা সে সঙ্কা থাকে, মানবতা ও জীবনের জন্য এর চেয়ে করুণ পরিণতি আর কি হতে পারে?

মতামত গ্রহণ: মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার/ শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

সংগ্রহে: নৌশিন আহম্মেদ মনিরা

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত