ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৮, ২১:৩৩

প্রিন্ট

হাওর বাঁচাতে হলে নদী খনন জরুরি

হাওর বাঁচাতে হলে নদী খনন জরুরি
বিশেষ সাক্ষাৎকার

সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষকদের ‘আপনজন’ কাসমির রেজা। হাওরপাড়ের মানুষের যেকোন দুর্যোগে পাশে দাঁড়ান। হাওরের কৃষকদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় কাসমির হাওরবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, এমনটাই বলছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী কাসমির রেজা পেশায় একজন কলেজ শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজ জেলা সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের কৃষক ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন তিনি। ২০১০ সালে গড়ে তুলেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি কাসমির রেজা হাওর রক্ষা বাঁধের অনিয়মের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিগত বছর অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জের সবক'টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে গেলে হাওর রক্ষায় অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলেন। কথা বলেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। সমাজের বিত্তশালী ও কর্পোরেট গ্রুপের সহায়তায় হাওরাঞ্চলের হাজারো পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেন। দেন অন্যান্য সহায়তাও। কাসমির রেজা বুকে লালন করেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। তিনি 'এসো বঙ্গবন্ধুকে জানি' নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মকে। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগ এলামনাই এসোসিয়েশনেরও সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি বাংলাদেশ জার্নালের সাথে কথা হয় এই হাওর স্বজনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুস্তফা মনওয়ার সুজন

বাংলাদেশ জার্নাল: কেমন আছেন? কাসমির রেজা: ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?

বাংলাদেশ জার্নাল: ভাল আছি। আপনিতো সম্প্রতি আবারো হাওর ঘুরে এলেন। হাওর অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা কি? কাসমির রেজা: হাওরে ধান কাটা শেষ। এখন ধান গোলায় রাখা হচ্ছে। হাওর অঞ্চলের মানুষ দুই বছর পর তাদের বহুল কাংখিত সোনার ফসল ঘরে তুলতে পেরে খুবই আনন্দিত। নতুন ধানের গন্ধ এখন হাওরের বাতাসে। তবে ব্লাস্ট রুগে অনেক জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। শ্রমিক সংকট এবং বজ্রপাত আতংকে ধান কাটা কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে ও রাস্তা না থাকায় ধান পরিবহনে ভোগান্তি ছিল। রোদ না থাকায় শুকাতে না পারায় কিছু ধান নষ্ট হয়েছে। এসব সমস্যা সত্বেও হাওরবাসীর মুখে এখন হাসি।

বাংলাদেশ জার্নাল: গত বছর এই সময়ে হাওরের চিত্র কেমন ছিল? কাসমির রেজা: সে দৃশ্য মনে হলে এখনো গা শিউরে উঠে। কী দুঃসহ ছিল সেই দিনগুলো। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন হাওর ডুবার খবর পাচ্ছিলাম। হাওর জোরে ছিল মানুষের হাহাকার। কান্নার আওয়াজ। সুনামগঞ্জেত সবক'টি হাওরই তলিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে যে দু'য়েকটি হাওর টিকে ছিল সেগুলো বাঁচানোর জন্য হাওর তীরবর্তী গ্রামের মানুষরা দিনরাত হাওরে পরেছিলেন। আমরা ছুটছিলাম হাওর থেকে হাওরে। বাঁধের উপর রাত ও কাটিয়েছি। হাওরে ঝরের কবলে পড়েছি। কত ধরনের অভিজ্ঞতা!! হাওরে যেন এমন দুর্দিন আর না আসে।

বাংলাদেশ জার্নাল: এই যে ফসলহানী, এই দুর্যোগ হাওরবাসী মোকাবেলা করলেন কিভাবে? কাসমির রেজা: এজন্য আমি কৃতজ্ঞতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তিনি যেভাবে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তা নজিরহীন। অকালবন্যার পর থেকে ফসল উঠার আগ পর্যন্ত হাওরের তিন লক্ষ পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল ও নগদ ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়। তাঁর নির্দেশে এনজিও ঋণসহ সকল ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রয়েছে। খোলা বাজারে স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রি করা হয়। এরপর জমিতে ধান রোপণ করার সময় হাওরের ৬ লক্ষ পরিবারকে বিঘা প্রতি ৫ কেজি করে চাল, ৩০ কেজি করে সার ও নগদ এক হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। অতীতে কোন সরকার হাওরবাসীকে এত বিপুল পরিমান সহযোগিতা প্রদান করেনি। শুধু সরকার নয় বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবসায়ীক সংগঠন সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। আমরা আমাদের সংগঠনের উদ্যোগে হাজার হাজার পরিবারকে সহায়তা করেছি। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংঠন, স্কুল কলেজের ছাত্র/শিক্ষকরা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হাওরবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। হাওরের পাশে যেন দাঁড়িয়েছিল সারা বাংলাদেশ। কিন্তু হাওরবাসী এভাবে ত্রাণের উপর নির্ভর করে থাকতে চান না। তারা চান পরিত্রাণ।

বাংলাদেশ জার্নাল: কিন্তু পরিত্রাণ কিভাবে? এই যে প্রতি বছরই ফসল তোলার মৌসুমে হাওরবাসী একটা আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করেন। এ থেকে কি কোন মুক্তি নেই? কাসমির রেজা: দেখেন, এত উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এক সময় ছিলনা। বন্যা যে আসতনা তা কিন্তু নয়। বন্যা আসত সেই বন্যার পানি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে চলে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে পলি পড়ে নদীর তলদেশ উঁচু হল। নদীগুলো নাব্যতা হারাল। এখন সামান্য বন্যা হলেই সেই পানি আর নদী ধারণ করতে পারে না। পানি নদী ছাপিয়ে চলে যায় হাওরে। তাই নদীগুলো খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে না আনলে শুধু বাঁধ দিয়ে হাওরের ফসল রক্ষা করা দুরুহ হয়ে যাবে। হাওর বাঁচাতে হলে নদী খনন ককরতে হবে। শুধু নদী নয় হাওরেরও তলদেশ উঁচু হয়েছে। খাল বিলও ভরাট হয়ে গেছে। এসবও খনন করা দরকার। হাওর খনন করে পানির রিজার্ভার সৃষ্টি করতে হবে। প্রকৃতিও এখন আর আগের অবস্থায় নেই। জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে। আমরা নিজেরা নানা ভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছি। হাওরের পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। তাই হাওরের কান্না থামাতে হলে নদী,খাল, বিল, হাওর খনন করে প্রকৃতি ও পরিবেশকে আগের জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয় মানবসৃষ্ট কারণেও হাওরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বছর বছর হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের নামে যে কোটি কোটি টাকা আসে তা লোপাট হয়। সময়মত ও সঠিকভাবে বাঁধ নির্মান হয় না। এসবও বন্ধ করতে হবে।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হল হাওরবাসীকে শুধু ধানের উপর নির্ভরশীল থাকলে হবে না। মাছের উৎপাদনও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। হাওরে কৃষি নির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে হবে। টাংগুয়ার হাওরে একটি মৎস গবেষণা কেন্দ্র ও পোণা উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। প্রতিটি হাওরে মৎস অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার অধিকার দিতে হবে। ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: এ বছর বাঁধ নির্মাণে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তনের কারণে কি কোন লাভ হল? কাসমির রেজা: আমি মনে করি লাভ হয়েছে। কিছু সমস্যা থাকলেও, এবছর যেভাবে হাওরের বাঁধ নির্মাণ হয়েছে আর কোন বছর এত ভাল বাঁধ নির্মাণ হয়নি। আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই যে তারা এবছর হাওর রক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িতদের সবার দাবির প্রেক্ষিতে "কাবিটা নীতিমালা ২০১৭" নামে নতুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। নীতিমালায় বেশকিছু হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মানে বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হল ঠিকাদারি প্রথা বাদ দেওয়া। এবার সকল বাঁধ নির্মাণ হয়েছে পি আই সি'র ( প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির) মাধ্যমে। স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে এই কমিটি গঠন হয়। এতে নিজেদের ফসল সুরক্ষায় কৃষকরা আন্তরিকতার সাথে কাজ করেন। যদিও এই পদ্মতি বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা ছিল তারপরও এর সুফল আমরা পেয়েছি। আরেকটি পরিবর্তন হল আগে পিআইসিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ মনোনীত প্রতিনিধি থাকতেন। তারা বেশি প্রভাব বিস্তার করতেন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সংসদ সদস্যগণ পিআইসিতে কোন সদস্য মনোনীত করেন না। তবে কাগজপত্রে তারা মনোনয়ন না দিলেও কার্যত তাদের মনোনয়ন ছিল। এতে নীতিমালার বাস্তবায়ন জরুরী। আরও কিছু পরিবর্তন রয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: এবছর বাঁধ নির্মাণে কি কি ত্রুটি ছিল? কাসমির রেজা: প্রথমেই আমি যে ত্রুটির কথা বলব তা হল, সময়মত বাঁধ নির্মাণ করতে না পারা। নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সকল বাঁধের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অর্ধেক বাঁধের কাজও শেষ হয়নি।

বাংলাদেশ জার্নাল: এর কারণটি কি? কেন সময়মত বাঁধ নির্মাণ হল না? কাসমির রেজা: এ বছর দেরিতে হাওর থেকে পানি নেমেছে। জলাবদ্ধতা ছিল। তাই কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। এছাড়াও প্রকল্প প্রণয়ন, প্রাক্কলনে ও পি আই সি গঠনে দেরি হয়েছে। ৩১ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক্কলন করা, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পি আই সি গঠন করার কথা এবং ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু করার কথা। এর কিছুই সময়মত হয়নি।

বাংলাদেশ জার্নাল: তাহলে কি আমরা বলব এবছরও প্রশাসন তৎপর ছিলনা? কাসমির রেজা: না, প্রশাসন তৎপর ছিল না সেটা আমি বলব না। আমি দেখেছি, প্রশাসনের ছুটাছুটি। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসনের কথা আমি উল্লেখ করতেই চাই। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকসহ প্রত্যেক উপজেলার নির্বাহী অফিসারগণ রাতদিন পরিশ্রম করেছেন। তারা মাত্র দেড় থেকে দুই মাসে ১৪০০ কিলোমিটার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করেছেন। এটাও কম বড় কথা নয়। আমি মনে করি তাদের জনবল সংকটের কারণে তারা সময়মত কাজ শুরু করতে পারেননি। যে শাখা অফিসাররা প্রাক্কলন করবেন তাদের সংখ্যা অনেক কম ছিল। এতে প্রাক্কলন করতে দেরি হয়, এবং পুরো প্রক্রিয়াটা বিলম্বিত হয়। আরও শাখা অফিসার নিয়োগ না করলে আগামী বছরগুলোতেও কাজ শুরু করতে বিলম্ব হবে। তাই আমরা আরও শাখা অফিসার নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: আরেকটি অভিযোগের কথা আমরা শুনেছি। অনেক হাওরে প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি কতটুকু সত্য? কাসমির রেজা: এই অভিযোগটি সত্য। অনেক হাওরে প্রকল্প নেওয়া হয়নি আবার অনেক জায়গায় অপ্রয়োজনীয় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকটি হাওরকে প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য আমরা কর্মসূচি দিয়েছি। এলাকাবাসী দলে দলে এসব কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। অনেক জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প না থাকায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণের তহবিল থেকে কোনোভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। যা যথাযথ ছিল না। সব হাওর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের আওতাধীন নয়। তাই যেসব হাওরে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়নি সেসব হাওরকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় আনার জন্য আমরা দাবি জানাই। সরকারের পক্ষ থেকে হাওর রক্ষায় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে। মাননীয় পানি সম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, যত টাকা লাগে সরকার বরাদ্দ দিবে। শুধু সুনামগঞ্জেই এবার হাওররক্ষা বাঁধের জন্য ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এত বেশি বরাদ্দ অতীতে কখনো দেখা যায়নি। বরাদ্দের যেহেতু অপ্রতুলতা নেই সেহেতু কেন এসব হাওরে বাঁধ হবে না? আমি আশাকরি গতবছর যেসব হাওরে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়নি আগামী বছরগুলোতে ঐসব হাওরেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পে বাঁধ হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: এ তো গেল ফসলের কথা। ফসল ছাড়াও হাওরবাসীর নানা সমস্যা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত ব্যবস্থাসহ নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে আছেন হাওরবাসী। এসব ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য কি করা দরকার? কাসমির রেজা: আসলে এক কথায় এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা মনে করি হাওরবাসীর এসব সমস্যাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করার জন্য শুধু অধিদফতর নয় একটি পৃথক মন্ত্রণালয় দরকার। একি সাথে বর্তমান হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদফতর কে আরও সক্রিয় করতে হবে। ২০১২ সালে যে হাওর উন্নয়ন মহা পরিকল্পনা হয়েছে তার যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। বেকার তরুনদের চাকরী দিতে হহবে। সর্বোপরি হাওর বান্ধব আরো কিছু জনপ্রতিনিধি আমাদের দরকার। যারা হাওরবাসীর দাবি দাওয়া সব সময় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তুলে ধরবেন এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য চাপ প্রয়োগ করবেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: হাওর অঞ্চলেতো অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, আছেন। তারপরও দীর্ঘদিন থেকে এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন? কাসমির রেজা: হাওর অঞ্চলে অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদের জন্ম হয়েছে এটা সত্য। আমরা হাওরবাসী এজন্য গর্ব বোধ করি। কিন্তু এখনো হাওরবাসীর পাহাড়সম সমস্যা রয়েছে। এখন ঐসব রাজনীতিবিদদের দোষারোপ না করে আমাদেরকে হাওরবাসীর সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট ও আন্তরিক নেতৃত্ব খুঁজে বের করতে হবে। এদেরকে জনপ্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত করতে হবে। আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি হাওরবাসীর জীবনে পরিবর্তন আনতে হলে হাওর এলাকার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও আন্তরিক হতে হবে। তাদেরকে হাওরবাসীর দুঃখ কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আপনারা কি ভূমিকা রাখছেন? কাসমির রেজা: আমরা মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আমি, আমাদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পিযুষ পুরকায়স্থ টিটুসহ সংগঠনের সবাই হাওরবাসীর বিপদে যতটুকু সম্ভব পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। হাওরপাড়ে কৃষক সমাবেশ, হাওর সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে হাওরের মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরেছি। এসব বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। আমি নিজে বিভিন্ন টেলিভিশনে সরাসরি হাওরবাসীর সমস্যার কথা তুলে ধরছি। গত বছর বন্যায় সুনামগঞ্জের প্রায় শতভাগ বোরো ফসল তলিয়ে গেলে হাওর রক্ষায় অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলি। সমাজের বিত্তশালী ও কর্পোরেট গ্রুপের সহায়তায় হাওরাঞ্চলের প্রায় দশ হাজার পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দিয়েছি। দুই ঈদে প্রায় ২ হাজার শিশুকে নতুন জামা কাপড় দিয়েছি। শীতকালে হাওরের শীতার্থ মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ও বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প করেছি। এসব কার্যক্রমের কথা সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? কাসমির রেজা: হাওরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই। হাওরবাসীর অধিকার আদায় করতে হলে যুক্তি সহকারে সঠিক জায়গায় কথাগুলো উপস্থাপন করতে হবে। সরকারের নীতি নির্ধারকদের এ ব্যাপারে সম্মত করতে হবে। আর হাওরের মানুষকে তাদের অধিকার নিয়ে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি কিছু গবেষণার কাজও হাতে নিয়েছি। সফলতার সাথে সেই কাজগুলো করে যেতে চাই। এজন্য বেশ কিছু কর্ম পরিকল্পনা হাতে রয়েছে। এসবের বাস্তবায়ন করতে চাই।

বাংলাদেশ জার্নাল: একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাচ্ছি। সিলেটে আপনি 'এসো বঙ্গবন্ধুকে জানি' নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। বড় কয়েকটি অনুষ্ঠানও করেছেন। এই সংগঠন নিয়ে আপনার ভাবনা কি? কাসমির রেজা: জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন থেকে তরুণ প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে সেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। তাই তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মকে তুলে ধরার লক্ষ্যেই আমি আমার কিছু সতীর্থদের নিয়ে এই সংগঠনটি গড়ে তুলি। আমাদের প্রথম অনুষ্ঠানে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কথা বলেন তাঁরই সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন। একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ. আরাফাত। এই সংগঠনের আরেকটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। এসব অনুষ্ঠানে শতশত শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সিলেটের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা তন্ময় হয়ে শুনেছেন। আমরা বঙ্গবন্ধুর উপর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাও করেছি। আমরা ধীরেধীরে সংগঠনটির পরিসর আরও বড় করে এটিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিব। যাতে নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়।

বাংলাদেশ জার্নাল: হাওরবাসীর সুখে দুঃখে পাশে রয়েছেন। হাওরে ঘুরতে ঘুরতে আপনি হাওরবাসীর আপনজন হয়ে উঠছেন। তারাও আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। আপনাকে মূলধারার নেতৃত্বে দেখতে চান। এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কি? কাসমির রেজা: প্রায় প্রতিদিনই হাওর তীরবর্তী কোন না কোন গ্রাম থেকে ফোন আসছে। তারা তাদের সমস্যার কথা বলছেন। ভাললাগার কথা বলছেন। এ আমার পরম পাওয়া। আমি তো তাদের সাথেই আছি। হাওরবাসীর সুখ দুঃখে সবসময় পাশে থাকতে চাই। ভবিষ্যতে যদি আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ আসে তখন দেখা যাবে। হাওরবাসীর কল্যাণে আমি সব সুযোগকেই কাজে লাগাব।

বাংলাদেশ জার্নাল: ধন্যবাদ। কাসমির রেজা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত