ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫ অাপডেট : ১৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ২০:৫৪

প্রিন্ট

রুপালি গিটার বাজে শোকে

রুপালি গিটার বাজে শোকে
ফাইল ছবি
অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন

আইয়ুব বাচ্চু। গিটারে গানে গানে বাংলার সঙ্গীতের বরপুত্র। বিদায় নিলেন রাজকীয় বিদায়। কোটি ভক্তের বেদনার এপিটাফে বিদায়। যান্ত্রিক মানুষের ভিতরে জমাট কষ্টের ভিড়ে বুনেছেন মানুষের গান। জীবনের গান। ভোগ করেছেন গানের জীবন। হাসিয়েছেন। বিদায়ে কাঁদিয়েছেন। মানুষের অন্তরের কথা ধারণ করার বিরল প্রতিভা ছিল তাঁর।

গানে গানে শুনিয়েছেন স্বরচিত সংবিধান। চিন্ময় সত্তায় ভাবনার ফুলকে ফলের স্বাদ দিয়েছেন কণ্ঠে। যন্ত্রে, সুরে। সপ্রাণে বলেছেন সেলাই ছাড়া শাদা কাপড়ের জীবনের অআগের পরের সব কথা।

বলেছেন অভিমানে চলে যাবেন আকাশে। শ্রোতারা দাঁড়িয়ে শুনেছেন এ যেন কলিজায় লুকিয়ে থাকা জীবনের অব্যক্ত কথার সোচ্চার মিছিল। কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি? কীভাবে বদলে গেছি এই আমি? ও বুকের সব কষ্ট দু’হাতে সরিয়ে চলো বদলে যাই’।

কিংবা গভীর কামনায়,‘বুকের গভীরে কষ্ট নিয়ে শূন্যতায় ডুবে গেছি আমি। আমাকে তুমি ফিরিয়ে নাও। তুমি কেন বোঝো না? তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়’। তাঁর গানের ভঙ্গিমায় যুবক-যুবতীর নীরব আর্তনাদ মাঝ রাতে ফেরারী হয়। গানের প্রতিটি শব্দে তিনি প্রাণ নির্মাণ করেছেন নিজের মতো করে। অার সেই প্রাণ শ্রোতার প্রাণ কে করেছে প্রাণবন্ত।

শ্রোতার সেই প্রাণ টিকিয়ে রাখতে কালো, হলুদের গিটারে তিনি যুদ্ধ করেছেন যুগের পর যুগ। নিজের ও শ্রোতার জীবনের তিক্ততা, বেদনা, বিষাদ তাঁকে গান লিখতে অনুপ্রাণিত করে।

তিনি গান গেয়ে শুনান পাহাড়ের উপর নির্জন বাড়ির বাসিন্দা হয়ে। পাহাড়ের নিচের বাসিন্দা স্তব্ধ হয়ে শুনেন। তাঁর সুরের উল্লাসে করেন উল্লাস।

কষ্টের কাছে বারবার ছুটে গেছেন। কষ্ট কে ভালবেসে। কষ্টকে ব্যবহার করে লিখেছেন, গেয়েছেন গান। বাজিয়েছেন জীবনের রঙে। তাঁর এই চেষ্টা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত। অআমাদের কাছে সমষ্টিগত স্মৃতি, ইতিহাস। চট্টগ্রামে জন্মে গানে গানে শাসন করেছেন বাংলাদেশকে। কখনো এশিয়া মহাদেশকে। তিনি যা হতে চান চেষ্টা করেছেন। লোকে তাঁকে বানিয়েছেন চেতনার, স্মৃতির বৃক্ষ।

একজন লোকের বিদায়ে নীরবে, সরবে কাঁদে কোটি হৃদয়। দরজা বন্ধ করে। শোকের শ্লোগানে। কখনো কখনো তাঁর ফেরারী মনের বারবার ফিরে অাসার অাকুতি অন্য দ্যোতনা তৈরি করে। মৃত্যু কেবল অদৃশ্য হওয়া। কান পাতলে গিটারের আওয়াজে অাইয়ুব বাচ্চুর অাওয়াজ পাওয়া যায়। যেমন তিনি অাকাশে উড়াল দিতে চেয়েছিলেন এর মতো। অামরা যেন কেউ কাউকে হারায়নি। তাঁর মতো বললে, ‘কখনো ভাবিনি আমি।ব্যথা দিয়ে তুমি চলে যাবে। কী জানি কী ভুল ছিল আমার! আমাকে কেন গেলে কাঁদিয়ে’?

তাঁর প্রিয় কবিতার ছোট্ট উপমা, ছন্দের অন্ত্যমিলের এই বাংলাদেশে তিনি অাসবেন বর্ষার প্রথম বৃষ্টি হয়ে। প্রিয়তমার স্নিগ্ধ হাতে বন্ধনের রাখী হয়ে। স্পর্শে প্রিয়ার চাহনি, গুমরে থাকা ক্রোধে। ঘুম ভাঙা শহরে মায়াবী সন্ধ্যায় চাঁদ জাগা রাতে। যখনই অাসো তুমি। শুনতে পাবে রুপালি গিটার বাজে। শোকে। অন্তরে। বিদায়ের চুমোর ঘ্রাণ ফসলের মাঠে। জড়ো করা ফুলের পাঁপড়িতে। তারুণ্যের উল্লাসের শেষ অায়োজন রংপুরে। রাজধানীতে। এই বাংলায়। তুমি ঘুমাও। মায়ের পাশে। শান্তিতে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শাহজালাল মহাবিদ্যালয়, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত