ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১ পৌষ ১৪২৪ অাপডেট : ৬ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:১১

প্রিন্ট

খালেদার মামলায় আটকে আছে বিএনপির রাজনীতি

ফাইল ছবি
কামরুল হাসান

বিএনপি চেয়ারপারসর বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। আর এ কারণে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝেও বিরাজ করছে মামলার রায়ের আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। থমকে রয়েছে সকল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। যেন মামলাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দলটির সকল কর্মসূচি। এমনকি আগামী জাতীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ও কৌশল নির্ধারনের বিষয়টিও আটকে আছে এই মামলাকে কেন্দ্র করে। আবার মামলার দিকে সকল নেতাকর্মীদের দৃষ্টি থাকায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের মত পার্থক্যও লক্ষ্য করা গেছে। সমন্বয় গড়ে ওঠেনি নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও। এসব কারণে তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ছে হতাশা। দলটির নেতাকর্মীরা এমনটাই জানিয়েছেন।

তারা জানান, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে। এই মামলায় তাকে সাজা দেয়া হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে দলের অবস্থান কি হবে, দলের নেতৃত্ব কে দিবেন নিয়েও রয়েছে জটিলতা। তবে এ সকল জটিলতার বিষয়ে আগাম কোন ইঙ্গিত নেই বিএনপির নীতিনির্ধারনী মহলের। এর বাইরে জাতীয় নির্বাচনের আগে বেগম জিয়ার মামলার রায় ও নির্বাচনে দলটির কৌশল কি তা কেউ জানেন না। দলীয় ফোরামে এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছে বলেও কেউ জানেন না। 

বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, সম্প্রতি দলের চেয়ারপারসন চিকিৎসা শেষে লন্ডন থেকে দেশে আসার পর অনেকেই সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক গতিশীলতার বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের সময়ে সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন সহ নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ, সাংগঠনিক অবস্থানকে শক্তিসালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু অদতে তার কিছুই হয়নি। এর প্রেক্ষিতে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে দলের মধ্যেই বাড়ছে বিভ্রান্তি। যার কারণে কোনো নেতা জানান, যে কোন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আবার কেউ বলছেন-নিরপেক্ষ সরকার ব্যাতিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। অনেকে বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার বিষয়ে কেউ দাবি করছেন- সহায়ক সরকার, কেউ করছেন নিরপেক্ষ সরকার, কেউ তত্বাবধায়ক সরকার। এমনকি বিএনপির সর্বশেষ জনসভার বক্তৃতায়ও খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার ব্যবস্থা থেকে সরে গিয়ে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি সভায় দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, সরকার নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু যতই ষড়যন্ত্র করুক-বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে তিনি জানান। মূলত বিএনপি কোনো ফর্মূলায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইছেন তা নিজেরাও নির্ধারণ করতে পারে নাই বলে এই জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

এ বিষয়ে তারা জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি তুলে ধরছেন। এই দাবির প্রেক্ষিতে তিনি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে এ সরকার ব্যবস্থার রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরবেন বলেও ঘোষণা দেন। কিন্তু সেই রূপরেখা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

এসব বিষয়ে বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবি ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী বলেন, এটা স্পষ্ট যে- বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। আমি মনে করি, তারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে তারা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দিহান। তারা চায়, নির্বাচন সঠিক এবং নিরপেক্ষ হোক। কার অধীনে বা কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে এটা আর তাদের কাছে বড় ইস্যু নয়।

এদিকে খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে আসার পর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য কক্সবাোর যান, ৭ নভেম্বর উপলক্ষে রাজধানীতে একটি সফল জনসভা করেন। এর বাইরে নিজের মামলায় হাজিরা দিতে বেশ কয়েকবার আদালতে গেছেন। এছাড়া তিনি আর কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেননি। সাংগঠনিক বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেননি বলে নেতাকর্মীরা জানান। দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, রংপুরসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগের জন্য সফরের পরিকল্পনা থাকলেও তার কোনোটাই হয়নি।

এসব বিষয়ে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান জানান, দলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সকল সিদ্ধান্ত আর পরিকল্পনাতো অবশ্যই থাকবে। তবে যেহেতু এই মুহূর্তে বেগম জিয়ার মামলার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা ওই দিকে নজর বেশি দিচ্ছি। তিনি জানান, সহায়ক সরকার ব্যবস্থা আর নিরপেক্ষ সরকার একই। আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছি। তা যে নাম দিয়েই করা হোক না কেন। এরপরও সময়মতো সহায়ক সরকার ব্যবস্থার রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির মধ্যে কোন স্থবিরতা নেই। আমাদের দাবি একটাই। যে নামেই হোক- নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামীকাল নির্বাচন দিলেও আমরা সেই নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য প্রস্তত রয়েছি। তবে বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের গণতন্ত্রের প্রতীক। তাকে ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। আর বিএনপির তো অংশগ্রহণের প্রশ্নই আসে না।

এদিকে খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার পরবর্তী তারিখ ১৯ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসনকে আত্মপক্ষ সমর্থনে লিখিত বক্তব্য জমা দিতে বলেছে আদালত। এদিনও খালেদা জিয়ার পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌখিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চাইবেন তার আইনজীবীরা। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা থেকে জানা গেছে, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি। জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে মামলার বিবরণীতে।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত