ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ অাপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:৫৪

প্রিন্ট

‘এরশাদের প্রয়োজন নেই’ তাই মোজাম্মেলকে অব্যাহতি

‘এরশাদের প্রয়োজন নেই’ তাই মোজাম্মেলকে অব্যাহতি
নিজস্ব প্রতিবেদক

মাত্র পাঁচদিন আগে পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছিলেন টাঙ্গাইল জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী মো. মোজাম্মেল হক। কিন্তু হঠাৎই খবর বের হলো, দলটিতে তার আর কোন পদ-পদবি নেই। জাতীয় পার্টি থেকে বলা হয়, ‘এরশাদের প্রয়োজন নেই’ তাই মোজাম্মেলকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, জাতীয় পার্টিতে তার মত নেতার প্রয়োজন নেই তাই দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাকে দলের সব পদ পদবি বুধবার অব্যাহতি দিয়েছেন।

বুধবার জাতীয় পার্টির দপ্তর জানায়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সাংগঠনিক নির্দেশ অমান্য করায়, মো. মোজাম্মেল হককে জাতীয় পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পদ ও পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান দলের গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

খবর নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইল ৫ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী সদ্য জাতীয় পার্টিতে যোগদানকারি শফিউল্লাহ মুনিরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় পথের কাঁটা সরাতে টাঙ্গাইল জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হককে পদ-পদবি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মনোনয়নের প্রতিযোগীতা থেকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, কোন কারণ ছাড়াই আমাকে দলের সব পদ পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সদ্য জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়া শফিউল্লাহ মুনিরের কথায় পার্টির চেয়ারম্যান আমাকে অব্যাহতি দিয়েছেন। কারণ আমি যে আসন থেকে নির্বাচন করতে চাই, সে আসনে তিনিও নির্বাচন করতে চান। তাই দলের পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দিয়ে আমাকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অব্যাহতির খবরে ক্ষুব্ধ মোজাম্মেল জানান, আমাকে যে পত্র দেওয়া হয়েছে সেখানে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ২৮ বছর ধরে আমি টাঙ্গাইলে জাতীয় পার্টি আগলে রেখেছি, এখন বলা হচ্ছে জাতীয় পার্টিতে আমার কোন প্রয়োজন নেই। এটা বলে কাউকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া নজিরবিহীন।

জানা গেছে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মোজাম্মেলকে বহিস্কার করার কথা বলা হলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্বাক্ষরিত তার অব্যহতিপত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোন কারণ উল্লেখ করা হয়নি। জাতীয় পার্টির প্যাডে পাঠানো চিঠিতে কোনো দিন তারিখও লেখা হয়নি।

‘সাংগঠনিক নির্দেশ’ শিরোনামে তাতে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় পার্টিতে আর কোনো প্রয়োজন নাই বিধায় মো. মোজাম্মেল হককে পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারা মোতাবেক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। এতে স্বাক্ষর করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

বহিস্কারের খবরে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, টাঙ্গাইল শহরে জাপার হয়ে বাতি জ্বালানোর লোক ছিলো না, সেখানে আমি খেয়ে না খেয়ে দলের হাল ধরেছি। ২৮ বছর ধরে অলিগলি ঘুরে দলকে শক্তিশালী করেছি। পার্টির চেয়ারম্যন দুই বছর আগে ডেকে নিয়ে বললেন, তুমি নির্বাচন করবে টাঙ্গাইল ৫ এ। তারপর থেকে রাত দিন কাজ করে দলকে শক্তিশালী করেছি। গত চারবছর টানা টাঙ্গাইল জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি ছিলাম। কিছুদিন আগে আমাকে দলের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদকও করা হয়। কিন্তু পাঁচদিন পর আমার কোন পদ নেই। এই হচ্ছে আমার ২৮ বছরের ত্যাগের প্রতিদান।

তিনি আরো বলেন, আমার কোন অভিযোগ নেই। চিন্তা করছি আর রাজনীতিই করব না। আমার উপর যে অবিচার করা হয়েছে তার বিচার আল্লাহর কাছে দিলাম।

জানা গেছে, ব্যবসায়ী শফিউল্লাহ আল মুনির কিছুদিন আগে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েই পার্টির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পদপদবি ছাড়াই একলাফে পেয়ে যান এরশাদের তথ্য প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক উপদেষ্টার পদ। শুধু তাই নয়, তার জন্য টাঙ্গাইলের কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া হয়। আবুল কাসেম ও মোজাম্মেল হকের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে আহ্বায়ক করা হয় মুনিরকে। এতে টাঙ্গাইল জেলা জাপার নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হন, কিন্তু কিছুই করার নেই। পার্টির চেয়ারম্যান যা চাইবেন তাই হয় জাতীয় পার্টিতে। তৃণমূল মতামত উপেক্ষা করেই এরশাদ তাকে টাঙ্গাইল ৫ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ঘোষণা করেন।

জানা গেছে, বিরোধীনেতা রওশন এরশাদের ঘনিষ্ট, ব্যবসায়ী আবুল কাসেমও এই আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী। একইসঙ্গে মোজাম্মেল হকও মনোনয়নপ্রত্যাশী দীর্ঘদিন ধরে। এরমধ্যে শফিউল্লাহ মুনির দলে যোগ দিলে প্রতিদ্বন্দ্বী নেতার সংখ্যা বেড়ে যায়। শুরু হয় নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও গ্রুপিং। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশেও মুনির ও মোজাম্মেলের অনুসারি নেতাকর্মীরা মারামারিতে লিপ্ত হয়।

অভিযোগ আছে, টাঙ্গাইলের ৫ আসনের মনোনয়ন নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপরতা শুরু করেন মুনির। এরশাদকে ম্যানেজ করে প্রথমে উপদেষ্টার পদ বাগিয়ে নেন। তারপর টাঙ্গাইলের কমিটি ভেঙ্গে নিয়ন্ত্রণে নেন, এরপর এরশাদকে দিয়েই এমপি প্রার্থী ঘোষণা করান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা অভিযোগ করেন, পথের কাঁটা সরাতেই মুনির এরশাদকে দিয়ে মোজাম্মেলকে বহিস্কার করিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যে আবুল কাসেমকেও পার্টি থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সেই চেষ্টা চলছে। টাঙ্গাইলের এই আসনে মুনিরই হবে একক প্রার্থী। তিনি ছাড়া আর কেউ যাতে প্রার্থী হতে না পারেন সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন মুনির।

তিনি বলেন, এখন মুনির যা বলেন পার্টির চেয়ারম্যান তাই করেন। এই মুনিরের কারণে টাঙ্গাইল জাতীয় পার্টির ধ্বস নেমেছে। তার কারণে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জাপা সংগঠক মোজাম্মেলকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দলের দুঃসময়ে তিনি হাল ধরেছেন। সুসময়ে এসে মুনির হর্তাকর্তা সেজে গেছেন। আবার দুসময় শুরু হলে মুনিরকে হারিকেন দিয়েও পাওয়া যাবে না।

ডিপি/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত