ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১ পৌষ ১৪২৪ অাপডেট : ৩৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ০২:১০

প্রিন্ট

বাংলার রসগোল্লার অকথিত ‘নারী বিপ্লবী’

জার্নাল ডেস্ক

বলা হয়ে থাকে, সব সফল পুরুষের সাফল্যের পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো নারীর অবদান৷ রসগোল্লার আবিষ্কর্তা হিসেবে পুরো বিশ্ব যাকে চেনে সেই নবীন চন্দ্র দাসের সাফল্যের পেছনেও রয়েছেন এক নারী৷ তিনি নবীনচন্দ্র দাসের স্ত্রী ক্ষীরোদমণি দেবী৷ জানা যায়, নবীন চন্দ্র দাসের পুরো ব্যবসার চাবিকাঠি ছিল তাঁর হাতেই৷

কিন্তু খ্যাতির আড়ালে থেকে গিয়েছেন ক্ষীরোদমণি দেবী৷ প্রখ্যাত মিষ্টান্ন কারিগর ভোলা ময়রার মেয়ে ক্ষীরোদমনি৷ চৌদ্দ বছর বয়সে নবীন ময়রার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়৷ স্বভাবে তিনি ছিলেন রাশভারী৷ স্বামীর উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকলেও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশে তিনি ছিলেন অপটু। তাই ক্ষীরোদমণি দেবীই ব্যবসার ভার নিজের হাতে তুলে নেন৷ এমনকি ছেলে কে.সি দাস আলাদা দোকান করলেও আমৃত্যু নবীন চন্দ্র দাসের দোকান একাই চালিয়েছেন তিনি৷

নবীনচন্দ্র দাসের বাড়ি৷ ছবি: শশী ঘোষ (কলকাতাটোয়েন্টিফোরসেভেন)

উনিশ শতকের অবিভক্ত ভারতে এও এক নারী বিপ্লব৷ গৃহলক্ষ্মীর হাতে ব্যবসায়ী নারীর লক্ষ্মীলাভ৷ কেমন ছিল সেই সময়টা? নবীনচন্দ্রের পরিবার সূত্রে জানা যায়, সেই উত্থানের পথ ছিল কতটা অমসৃণ, অনুর্বর৷

সদ্য আন্তজার্তিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলার রসগোল্লা। রসগোল্লার জি আই রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরই বাঙালির মুখে ঘুরে ফিরেই নবীন চন্দ্র দাসের নাম৷ রসগোল্লার কারণে গোটা বিশ্ব এখন যাকে এক নামে চেনে৷ তাঁর পঞ্চম প্রজন্ম ধীমান দাস জানিয়েছেন পূর্বপুরুষদের কথা৷

প্রথমদিকে নবীন চন্দ্রের পরিবারের ক্রিস্টাল সুগার রিফাইনের ব্যবসা ছিল৷ তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁকে পারিবারিক ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়৷ জমানো টাকা দিয়ে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেন তিনি৷ তাই বেশি দূর এগোতে পারেননি৷  মা-ছেলে দুজনের সংসার সামলাতে ১৬-১৭ বছর বয়সে কালীদাস ইন্দ্র নামে এক মিষ্টি বিক্রেতার কাছে কারিগরের কাজ নেন৷ কিন্তু সেখান থেকেও বিতাড়িত হতে হয় তাঁকে।

ধীমান দাস৷ নবীনচন্দ্র দাসের পঞ্চম পুরুষ৷ ছবি: শশী ঘোষ (কলকাতাটোয়েন্টিফোরসেভেন)

এরপর মায়ের জমানো টাকায় ১৮৬৪ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে একটি দোকান করেছিলেন নবীন৷ কিন্তু সেই ব্যবসায়ও লোকসান গুনতে হয়। তারপর ফের মায়ের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ওই কালীদাস ইন্দ্রের দোকানের উল্টোদিকে আবারও একটি মিষ্টির দোকান করেছিলেন তিনি৷ কিন্তু সেই ব্যবসাও ভালমতো চলত না৷ সেইসময় কিছু লোকজন তাঁকে বলতেন এমন মিষ্টি তৈরি করতে যাতে খিদের সঙ্গে তৃষ্ণাও মেটে৷

এরপরই তিনি ছানার বল করে রসে দিলেন৷ কিন্তু প্রথম প্রথম তা ছেড়ে যেত৷ তারপর বেশ কিছুদিন এরকম হওয়ার পর শেষপর্যন্ত ঠিক হয়৷ সেই খুশিতে এবং নিজের মিষ্টির প্রচারের জন্য তিনি প্রায় সকলকে বিনা পয়সায় মিষ্টি বিলাতে শুরু করেন৷ তখন তাঁর বয়স ২৩ বছর৷

একদিন তাঁদের বাগবাজারের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় একটি ঘোড়া টানা গাড়ি। গাড়িতে ছিল কলকাতার ধণাঢ্য ভগবান দাস বাগলার পরিবার। ভগবান দাসের এক ছেলের পিপাসা পেলে সে গাড়ি থেকে নেমে ওই মিষ্টির দোকানের সামনে আসে। ভগবান দাস তাকে এক গ্লাস জল ও একটি রসগোল্লা দেন। রসগোল্লা খেয়ে ছেলে ভীষণ খুশি হয়ে বাবাকেও সেই মিষ্টি খাওয়ান। ভগবান দাস এরপর এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতার ছড়িয়ে পড়ে রসগোল্লার সুখ্যাতি।

সুখ্যাতি তো ছড়াল৷ কিন্তু ব্যবসার হাল ধরবে কে? রসগোল্লার কারিগর তখন মিষ্টি শুভেচ্ছায় মোহিত৷ তাতেই লাটে উঠতে পারে ব্যবসা৷ অগত্যা হাল ধরলেন স্ত্রী ক্ষীরোদমণি৷ বাংলার মিষ্টান্ন শিল্পে জড়িয়ে গেল এই গৃহবধূর নাম৷ তিনি না থাকলে হয়তো রসগোল্লা হারিয়েই যেত৷

কলকাতার ভিড়ে জমে আছে সেই কথা৷ এক আটপৌরে গৃহবধূর ব্যবসায়িক সফল হওয়ার কাহিনী৷ বিপ্লব কি নিঃশব্দে হয় ?

সূত্র: কলকাতাটোয়েন্টিফোরসেভেন

/এসএস/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত