ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১ পৌষ ১৪২৪ অাপডেট : ৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৭, ১৩:৩৫

প্রিন্ট

মেয়েরা বেকার হয় না

মাসুদা ভাট্টি

বিদ্যুৎ আকাশেই চমকায়, মাটিতে নয়- হঠাৎ কথাটা মনে পড়ল রওশন জাহানের। তখনও পত্রিকার পাতাটি সামনে খোলা তার। সেখানে তারই সম্পর্কে লেখা হয়েছে ছবিসহ- 'তিনি এদেশের নতুন করপোরেট জগতে এসেছিলেন বিদ্যুৎ চমকের মতো। সর্বত্রই তিনি তার নিজস্বতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎ চমকের মতোই তিনি যেন হারিয়ে গেলেন, আজকাল আর তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তিনি স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেছেন। নাকি স্বেচ্ছা নির্বাসন? এত বড় পদ থেকে একেবারে বেকার হওয়ার বিলাসিতা কেন? পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কার কথা বলা হচ্ছে এতক্ষণ? তিনি আর কেউ নন, দেশের সর্ববৃহৎ টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সদ্য সাবেক হওয়া সিইও রওশন জাহান।' 

এ পর্যন্ত পড়েই তার মনে হলো, যিনি এই লেখা লিখেছেন তিনিও আসলে জানেন যে, বিদ্যুৎ আকাশেই চমকায়, মাটিতে নয়। তিনি হাসলেন মনে মনে এবং তারপর বাইরে বেরুবেন বলে নিজেকে তৈরি করার জন্য শোবার ঘরের দিকে গেলেন। বাড়িটি ফাঁকা একেবারে। জীবন থেকে তিনি অনেক কিছুই ছেঁটে ফেলেছিলেন, বিশেষ করে সম্পর্কগুলোও তিনি ধরে রাখেননি। যখন যা তিনি করেন তাতেই সব মনোযোগ ঢেলে দেন। আর সে কারণেই প্রতিষ্ঠা পেতে তার সময় লাগেনি। আবার এই ঝকমকি থেকে বেরিয়ে আসতেও সময় নেননি মুহূর্ত মাত্র। কেন এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নিয়ে তার নিজের ভেতরেই নানা রকম দ্বন্দ্ব বা প্রশ্ন আছে। তবে সেগুলো তিনি সময় নিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচন করতে চান। 

নারীর জীবন খুব বেশি অদল-বদল না হলে একটা নির্দিষ্ট ছকেই বাঁধা, এটাই এদেশে দস্তুর ছিল। রওশন জাহানের মায়ের জীবনের কথাই ধরা যাক। বিয়ে হয়েছিল কলেজে পড়া অবস্থাতেই। চট্টগ্রামের যে কলেজে তিনি পড়েছেন সেখানে ছেলেদের সঙ্গে ক্লাস করতে দেওয়াটাই ছিল ওর নানার পরিবারের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। এ কথা নানাকে বহুবার গর্বভরে বলতে শুনেছেন রওশন। কিন্তু কী হয়েছে ছেলেদের সঙ্গে পড়তে দিয়ে? বাঁধা রিকশাওয়ালা সকালে এসে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, তারপর আবার কলেজ শেষে বাড়িতে পৌঁছে দিত। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ ছিল। শিক্ষকরাও কমন রুম থেকে সার ধরে মেয়েদেরকে নিয়ে ক্লাসে ঢুকতেন, আবার ক্লাস শেষে তার পেছন পেছন মেয়েদের কমন রুমে এসে ঢুকতে হতো। তার পরও সেখান থেকে কলেজ পাস করা হয়নি রওশনের মায়ের। তার আগেই বিয়ে হয়ে যায় চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। রওশনের জন্ম গত শতকের সত্তরের দশকে। রওশন কিন্তু ছেলেদের সঙ্গে একই স্কুলে লেখাপড়া করলেও শেষ পর্যন্ত দেশের বিখ্যাত মেয়েদের স্কুল-কলেজ থেকেই পাস করেছে। তার পর তো বিদেশে পড়তে গিয়েছে, চাকরিজীবন শুরু করেছে এবং দেশে এসে বেশ দ্রুতই করপোরেট আইকন হিসেবে নাম করেছে। ফলে ওর জীবনের সঙ্গে মায়ের জীবনের কোনো মিল নেই; থাকার কথা নয়। মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে মা ও মেয়ের জীবনের এই পরিবর্তন রওশনকে অবাক করে খুব। 

ওর মনে পড়ে মা-বাবার সম্পর্কের কথা। বিশেষ করে সেই সব ভোরে যখন বাবা তৈরি হতেন অফিসের জন্য আর ওকে তৈরি হতে হতো স্কুলের জন্য। মায়ের তখন নাভিশ্বাস অবস্থা। ছোট দুটো যমজ ভাই তারস্বরে কাঁদছে, এর মধ্যে একাধিক পদ দিয়ে ব্যবসায়ী বাবার নাশতা দিয়ে টেবিল ভরে রাখা, ওর স্কুলের টিফিন বাক্স ভরে দেওয়া, ব্যাগ গোছানো এবং সেই সঙ্গে বাবার রাজনীতির লোকদের দেখভাল- এক হাতে মা সামলাচ্ছেন দিনের শুরুতে। তারপর গোটা দিনে কী হতো বা কী হচ্ছে তা জানার সুযোগ ছিল না রওশনের। কিন্তু বিকেলে বাড়ি ফিরে ও দেখেছে আরেক রকমের মাকে। সকালে দেখা মা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মা। তখনকার ব্যস্ততা আরেক রকম। কিন্তু এত কিছুর পরও যখন বাবা মাকে 'কিছুই কর না বা সারাদিন বাড়িতে কী কর যে, এইটা হইল না ওইটা হইল না' বলে গালমন্দ করতেন তখন রওশনের মনে হতো, নারী-জীবন সহজ নয়। ওর ছোট চাচা ওদের সংসারেই থাকতেন। তখনও বেকার, সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমান আর গান শোনেন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন আর হপ্তে হপ্তে চা চেয়ে পাঠান। বিকেল হলে ভাবির কাছে শিঙ্গাড়া আর আলু পুরির অর্ডার দিয়ে পাঁচ মিনিট পরপর চিৎকার করে ডাকতেন, 'ভাবি, কী কর? হলো? এতক্ষণ লাগে কেন?' রওশনের তখন মনে হতো, ওর মায়ের জীবন বদলাতে হবে। কারণ সবাই ওর মায়ের এই জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বাড়িভর্তি আত্মীয়স্বজন, রাজনীতির মানুষ, ফ্যাক্টরির মানুষ, নানা-বাড়ির মানুষ আর ওর মা একা। বাড়িময় সারাক্ষণ সর্বত্র মাকে ঘুরতে দেখছে কিশোরী রওশন। তারপরও মা কিছু করেন না- এই বাক্য তখনও ওকে আহত করত, এখনও করে। আর সেই আহত হওয়া থেকেই নিজের জীবনকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার একটা জেদও তৈরি হয়েছিল ওর ভেতর। সেই জেদ এখনও আছে প্রবলভাবে। 

দেশের করপোরেট জগতের আইকন থেকে এই যে এখন ইচ্ছা করে একটা বেকার জীবনে প্রবেশ করছেন রওশন জাহান; তাও একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই। এই উদ্দেশ্য বেকার জীবনের স্বাদ নেওয়া নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু। যদিও ওকে বারবার এই প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে যখন তখন- 'এর পর কোথায় যাচ্ছেন?' এরই মধ্যে কত খবর বেরিয়েছে- অমুক জায়গায় যোগ দিচ্ছেন রওশন জাহান, তমুক কোম্পানির দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি ইত্যাদি। কিন্তু রওশন জাহানই শুধু জানেন, তিনি কী করবেন। আর সে উদ্দেশ্য নিয়েই আজ সকালে তিনি বেরুলেন তার বহুদিনের বিশ্বস্ত চালকসঙ্গী রক্তিমকে নিয়ে। কোথায় যাবেন কী করবেন সেটা শুধু তিনিই জানেন, তবে রক্তিমও জানে, এতদিন একসঙ্গে থাকার এটাই সুবিধে, পাশের মানুষটিকে বুঝতে শেখা, যদিও সবার কাছ থেকে এই বোধ রওশন পাননি। পাননি বলেই জীবনে তার সঙ্গী বদলেছে বারবার। তিনিও এটা মেনেই নিয়েছেন, যে কারণে স্থায়ী কোনো সঙ্গীর খোঁজ করেননি আর। এ জন্য বাজারে তার সুনামও নেই। কিন্তু সুনামের তোয়াক্কা রওশন জাহান কোনোদিন করেননি, এখনও করেন না। 

গাড়ি চলে শহর ছাড়িয়ে। দেশের উত্তরে যায়, দক্ষিণকে পেছনে রেখে। দু'পাশে পুব আর পশ্চিম ঘুমায়। গান বাজে কানের ভেতর। গাড়ির সিডিতে গান বাজানো রওশন জাহানের পছন্দ নয়। তাতে তার পছন্দ চাপিয়ে দেওয়া হয় চালকের ওপর, যেটা ও চায় না। নিজের পছন্দ কারও ওপর চাপানোর পক্ষপাতী নন তিনি। গান শুনতে শুনতেই তার মনে হয়, এই যে তার কর্মজীবনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানো, এতে যারা খুশি হয়েছেন তাদের কথা। যেমন এহসান ইকবাল, এদেশের করপোরেট জগতের প্রভু বলে নিজেকে দাবি করেন এবং সবাই সেটা মেনেও নিয়েছে এক প্রকার, তিনি নিশ্চয় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন। কারণ ভদ্রলোক কোনোভাবেই যেন রওশন জাহানকে মেনে নিতে পারছিলেন না। মনে মনে হাসলেন রওশন জাহান, আর তার ঠোঁটের রেখাই বলে দিচ্ছে, তিনি সেই সব পুরুষের কথা ভাবছেন, যারা তার এই স্বেচ্ছা বেকারত্ব নিয়ে অফিস, গাড়ি, পার্টি, জিম- সর্বত্র নিশ্চয় হাসছেন আর বলছেন, 'বেশি বাড়ছিল। ঘর নাই সংসার নাই; বাচ্চা নাই স্বামী নাই; করপোরেট মারাচ্ছিলেন! কই, পারলি টিকে থাকতে? এত্তো সোজা না।' এত সোজা যে নয়, সেটা রওশন জাহানের চেয়ে ভালো আর কে জানে! ওহ না জানে, অনেক নারীই জানে, এবং রওশন জাহান সেই নারীদেরই একজন, যাদের জীবনে বেকারত্ব বলে আসলে কিছুই নেই; কোনোদিন, কোনোকালে ছিলও না। 

রওশন জাহান তার নোটবুক খুলে বসেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে কাছে আসা, পাশে আসা নারীদের মধ্যে কয়েকজনের জীবনচক্র নিয়ে বসেন। এতদিন তিনি তাদের কথা জেনেছেন, শুনেছেন এবং সময়-সুযোগ বুঝে নোট রেখেছেন। স্বেচ্ছা বেকারত্বের জীবনের শুরুতে তিনি তাদের কথাই পড়তে শুরু করেন, যাদের মধ্যে তার মায়ের নাম সবার প্রথমেই লেখা। এবং কোনো বর্ণনা ছাড়াই রওশন জাহান লিখেছেন, 'নারীর কর্মজীবন কখন শুরু হয়? যখন তার বাবা বা ভাই তাকে বলেন, যাও তো মামণি, এক গ্লাস পানি নিয়ে আসো তো। সেই যে পানি আনা শুরু হয়, মৃত্যু পর্যন্ত নারী কেবল পানিই আনে। পানি আনার কাল আর তার শেষ হয় না।' 

রওশন জাহানের নোট বই থেকে তিনজন নারীকে আমরা বেছে নিতে চাই। যাদের সামাজিক, সাংসারিক, বয়সের স্তর বিবেচনায় এনে এদেরকেই উপযুক্ত 'স্যাম্পল' হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। যেমন রওশন জাহানের সঙ্গে এদেশের মিডিয়ার যোগাযোগ শুরু হয়েছিল টেলিভিশন মিডিয়া তরতাজা হয়ে ওঠার আগে থেকেই। তখন এক দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তিনি পত্রিকাটির নারী পাতার জন্য লিখতেন। তখনও এদেশে নারী সাংবাদিকদের নারী পাতার কাজই দেওয়া হতো। এর বাইরে হয়তো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা এনজিওর বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমের রিপোর্টিং করতে পাঠানো হতো। এমনকি রাতের বেলা পত্রিকা অফিসে থাকতে পারবে না বলে কত হাসাহাসি হতো। কিন্তু রওশন জাহান সেই রিপোর্টার মেয়েটির লেগে থাকা দেখেছেন। দেখেছেন তার কাজ করার অদম্য শক্তি। হাজারীবাগের একটি বাসায় মেয়েটি থাকত তখন। সেখান থেকে পত্রিকা অফিসে আসা-যাওয়া করাটা খুব সহজ ছিল না। এমনকি পত্রিকা অফিসে তখন মেয়েদের আলাদা কোনো টয়লেট থাকত না। থাকলেও তা ব্যবহার করার মতো নয়। এসব কথা মেয়েটির কাছ থেকেই জেনেছিলেন রওশন জাহান। এক প্রকার বন্ধুর মতোই হয়ে গিয়েছিলেন ওরা। অফিসের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে কাজের অন্ত ছিল না। তখনকার পত্রিকা অফিসে বেতনই বা কত ছিল? তাও আবার মাসের পর মাস বেতন হতো না। কী দিয়ে কীভাবে চালাত মেয়েটি- সেটা রওশনের কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল। তারপরও কোনোদিন তার কাছে এ বিষয়ে মুখ খোলেনি মেয়েটি। হাসিমুখ আর প্রফেশনাল আলাপই হতো ওদের মধ্যে। বন্ধুত্ব হওয়ার পর আরও কত গল্প যে জানা হয়েছিল, তার শেষ নেই। পত্রিকা অফিসেই মেয়েটির সম্পর্ক হয়েছিল আরেক সাংবাদিকের সঙ্গে। কিন্তু ছেলেরা রাজনৈতিক রিপোর্টার হয়, ক্রাইম রিপোর্টার হয়, তাই তাদের মূল্যমান বেশি। মেয়েটিও জেদ ধরেছিল নিজেকে রিপোর্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। পেরেওছিল। কিন্তু তাতে কী হলো? সম্পর্কটা টিকল না ওদের। দু'জনের প্রেম ছাপিয়ে উঠেছিল প্রফেশনাল জেলাসি। ততদিনে মেয়েটি নিজেকে আবিস্কার করেছে, নিজের শক্তিকে আবিস্কার করেছে এবং জেনেছে যে, মেয়েদের বেকার হতে নেই, হওয়া যায় না। বেকারত্ব পুরোটাই ছেলেদের এখতিয়ার। রওশনও ওর কাছ থেকেই জেনেছিলেন, একেবারে শুয়ে-বসে থাকার জীবনে সমাজের কোনো স্তরের মেয়েদের কপালেই নেই। এখনও ওরা বন্ধু, এদেশের মিডিয়ায় মেয়েটি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে ঠিকই, কখনও কখনও এক মিডিয়া হাউস থেকে চাকরি গেলে আরেক মিডিয়া হাউসে চাকরি না পাওয়া অবধি তার বেকার থাকার কথা বটে, কিন্তু সেটা সম্ভব হয় না। সম্পর্কের কোনো এক ফোকর দিয়ে তার জীবনে যে পুরুষ মানুষটি এসেছিল, যার সঙ্গে সামাজিকভাবে চুক্তিবদ্ধও হয়েছিল, সেই পুরুষটিও মেয়েটির ব্যক্তিত্বকে নিতে পারেনি বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক বিয়েটি টেকেনি। কিন্তু সন্তানকে মেয়েটি ছাড়তে পারেনি। তাকে মানুষ করতে গিয়ে মেয়েটির পক্ষে আর কোনোদিন বেকার হওয়া সম্ভব হবে না- এ কথা এই মেয়ের মতো বহু মেয়ের জানা, বিশেষ করে একলা-মায়েদের। 

রওশন জাহানের নোটবুক থেকে বেছে নেওয়া দ্বিতীয় মেয়েটির নাম শামেলা। এ রকম নামের দ্বিতীয় কোনো মেয়ের সঙ্গে রওশন জাহানের পরিচয় নেই। ওর সঙ্গে শামেলার পরিচয়টাও বিস্ময়কর। রওশন সোনারগাঁও হোটেলে একটি অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত তখন কত হবে? এগারোটা সাড়ে এগারোটা। তখনও বেশ জ্যাম। কাকলি মোড়ে জ্যামে আছেন। চোখটা বন্ধই ছিল। তাও বছর দশেক আগের কথা, মনে করতে পারেন। একটি ছিপছিপে গড়নের মেয়ে এসে দাঁড়াল জানালার পাশে। এত রাতে একটি মেয়ের ভিক্ষে করার কথা নয়, তাও এই বয়সের। কৌতূহলী হয়ে জানালাটা নামালেন রওশন জাহান। মেয়েটি সোজা বলল, 'ভিক্ষা করতে ইচ্ছা করে না, কিন্তু কেউ কাইজ-কামও দেয় না।' মেয়েটির চোখ টলটল করছে কথা বলার সময়। কোনটা সত্যি কান্না, কোনটা অভিনয়- এটা আসলে বোঝা যায়। রওশন জাহান বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়েটি অন্তত ভান্‌ করছে না। শামেলাকে রওশন গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন। তার পর থেকে শামেলা তার কাছেই আছে। শামেলার গল্প খুব ব্যতিক্রমী কোনো গল্প নয়। ওর শ্রেণির সাধারণ আর দশটি মানুষের মতোই গল্পটি। 

স্বামী নামক একটি জীবের সঙ্গে ঢাকায় আসা। কিন্তু ঢাকায় এলেই তো হবে না। এ শহরে কাজ না করলে পেট চলবে না- এ ধারণা শামেলার ছিল না, থাকার কথাও নয়। যদিও এ শিক্ষা ওর দ্রুতই হয়ে গিয়েছিল। কাজ জোটাতে না পেরে ওর শরীরটাকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল ও। মন থেকে মানতে পারেনি, কিন্তু স্বামীর সংসারে বেশ অনেকটা পেট, আর ক্ষুধার্তের দেওয়া গঞ্জনা আসলে নেওয়া যায় না। কিন্তু যেদিন থেকে রওশনের বাড়িতে কাজ শুরু করেছিল শামেলা, সেদিন থেকে ওর নিপুণ সংসারী চেহারাটি যেন ফুটে বেরিয়েছিল। একটু দেখিয়ে দিলেই সবকিছু আয়ত্তে নিয়ে আসা শামেলা বেশ চাঁচাছোলা কথা বলে। মাঝে মাঝে সেগুলোতে কোনো রস থাকে না, কিন্তু তাতে রওশনের অসুবিধে হয় না। যে স্বামী ওকে ঢাকায় এনে ওর ওপর ভর করে খেতে চেয়েছিল, তাকে পথে এনেছে শামেলা। পথে এনেছে বলতে গাড়ি চালানো শিখিয়ে রওশনকে দিয়েই এক জায়গায় ড্রাইভারের চাকরি পাইয়ে দিয়েছে। একটি মেয়ে হয়েছে শামেলার। গ্রাম থেকে শামেলার বিধবা মাকে ঢাকায় এনে তার কাছে রেখে শামেলা আর ওর স্বামী দু'জনে সকালে কাজে আসে, সন্ধ্যায় ফিরে যায়। ভাইয়ের বউয়ের কাছে শামেলার মা'টা বেশ কষ্টই পাচ্ছিল। রওশন ওর চোখের সামনে শামেলার ক্ষমতায়ন দেখেছে। নারীর ক্ষমতায়নে যে খুব বেশি 'এফোর্ট'-এর দরকার হয় না, সেটা ও শুধু শামেলাকে দিয়ে নয়, কর্মক্ষেত্রেও অনেক মেয়েকে দিয়ে রওশন বুঝেছে, জেনেছে। 

তবে মান্না দে'র বিখ্যাত গান কফি হাউসের সেই সুজাতার মতো মেয়েকেও রওশন চেনে-জানে। ওর আশেপাশে, ও যে সামাজিক বাস্তবতায় বসবাস করে, যাওয়া-আসা আছে সেখানে অনেক সুজাতার সঙ্গে রওশনের দেখা হয় বটে। কিন্তু মাঝে মাঝে রওশন অবাক হয়ে যান, যে চটকদার সুখের ভেতর সুজাতারা ডুবে থাকে সেটুকু নিশ্চিত করতে তাদেরকেও কম কষ্ট করতে হয় না। নিজেকে সারাক্ষণ সাজিয়ে-গুছিয়ে রঙিন কাগজে মুড়ে সবার সামনে উপস্থিত করার পেছনে সময় আর শ্রম দুটোই ব্যয় করতে হয়। তারপরও কোনো কোনো সুজাতাকে তাদের সুখের তোশকে আগুন লাগিয়ে শিরদাঁড়া খাড়া করে বেরিয়ে আসতে দেখেছে রওশন, বেরিয়ে এসে তারা নতুন ও নিজস্ব জীবন বেছে নিয়েছে, সন্তানকে মানুষ করেছে। রওশনের ভাবনায় সারাদিন ঘুমিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ মেকআপের বাক্স হয়ে পার্টিতে গিয়ে মদ্যপান করা সুজাতাও যেমন দোষী নয়, আবার সে সুজাতা এর থেকে বেরিয়ে এসেছে তাকেও বিপ্লবী নয়- আসলে রওশন এসবের দর্শকমাত্র। সারাজীবনই রওশন তার চারপাশের মানুষকে একটু দূরত্বে থেকে দেখেই অভ্যস্ত। যেমন ওর মা'কে দেখেছেন বাড়িময় সারাক্ষণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে, তেমনই দেশে-বিদেশে বসবাস, কাজ করা, এত মানুষকে চেনা-জানা- সবাইকেই দেখার চেষ্টা করেছেন। আর দেখতে দেখতে তিনি একটি নিদারুণ সত্য আবিস্কার করেছেন- মেয়েরা আসলে কোনোদিন কোথাও বেকার হয় না, বেকার থাকে না। হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি, মাস শেষে বেতন কিংবা আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যবসা কারও কারও করা হয়ে ওঠে না, কিন্তু তাতে মেয়েদের কাজ বিন্দুমাত্র কমে না এবং তার অর্থমূল্য আপাত চোখে কিছু না হলেও পৃথিবী নামক এই কারখানায় তা আসলে অমূল্য। 

যদিও রওশন জাহান নিজেকে একজন নারীমাত্র মনে করেন না। নিজেকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে ভাবেন, কিন্তু কখনও কখনও তাকে শুধু নারী বানাতে সমাজ বা রাষ্ট্র বা বাস্তবতা উঠেপড়ে লাগে। তিনি এই পীড়াও সহ্য করে নিয়েছেন। রওশন তার নোট বইয়ের নারীদের কথা একের পর এক পড়ে চলেছেন। গাড়ি যমুনা সেতু পার হচ্ছে। রওশন যাচ্ছেন উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল নারীদের সঙ্গে কথা বলতে। রওশন জাহান, দেশের বিখ্যাত করপোরেট নারী, যার শাড়ির সুতোর ঘনত্বও সংবাদ বা আলোচনার বিষয় হয়, তিনি যখন সাঁওতাল নারীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে যান, তখন তার পেছনেও যে বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে, সে কথা কি বলে বোঝাতে হয়? হয় না। 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত