ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫ অাপডেট : ১৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:১৯

প্রিন্ট

৫ হাজার থেকে ৫০ কোটি রুপির মালিক!

৫ হাজার থেকে ৫০ কোটি রুপির মালিক!
অনলাইন ডেস্ক

বাবা বলতেন: ‘হও সফল হও, নয় বিয়ে কর।’ কিন্তু আর দশটা পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মত বিয়ে করে স্বামীর ঘাড়ে বসে বসে খাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না তার। তাই তিনি সফল হওয়ার চেষ্টায় মনোনিবেশ করেন। মাত্র ৫ হাজার রুপি দিয়ে শুরু করা ব্যবসা এখন ৫০ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে।

এতক্ষণ ধরে যার কথা বলছি তার নাম সুপ্রিয়া সাবু। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা আর দশটা ভারতীয় মেয়ের মত একই পরিণতিই যেন অপেক্ষা করছিল তার অদৃষ্টেও। ফাইন আর্টসে ব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পরই তার বাবা তোড়জোড় শুরু করেন মেয়ের বিয়ে দেয়ার। কিন্তু এই বিষয়টা একদমই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না সুপ্রিয়া। কেননা তিনি যে এতদিন ধরে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে আসছিলেন। তাই বাবার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সে। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়েও একরোখা মেয়েকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারেন না তার বাবা। তাই শেষমেষ নিজেই নিরস্ত হন। মেয়েকে এক বছরের সময়সীমা বেঁধে দেন তিনি। বলেন, ‘তোমার হাতে এই একটা বছরই সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে পারলে নিজে কিছু করে দেখাও, নয়ত এক বছর পর আমার কথামত যেখানে বিয়ে দেব, সেখানেই বিয়ে করতে হবে তোমাকে।’

কিন্তু এক বছরের মধ্যে খুব বড় কোনও সফলতা অর্জন যে সম্ভব নয় তা ভালোই বুঝতে পারছিল সুপ্রিয়া। কিন্তু তাই বলে কিছু না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকাটাও তো কোন কাজের কথা নয়। তাই বাবার দেয়া চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে সে। কিন্তু কী করা যায়? তার যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সেই সমপর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই চাকরি পেতে তো কমপক্ষে দুই-তিন বছর সময় লাগবেই। আর অন্যের অধীনে চাকরি করে এক বছরের মধ্যে নিজের জন্য যে একটা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব নয়, সেটা খুব দ্রুতই অনুধাবন করে বুদ্ধিমতি সুপ্রিয়া। কিন্তু তার হাতে যে মাত্র একটা বছরই আছে। তাই প্রচলিত পথে না হেঁটে, নিজেই কিছু করে দেখানোর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা করে সে।

তাই ২০০৯ সালে, মাত্র ২২ বছর বয়সে এবং ৫০০০ রুপি মূলধন নিয়ে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে সে গড়ে তোলে তার প্রথম কোম্পানিঃ মাস্টারস্ট্রোকস এডভার্টাইজিং। কিন্তু মাত্র ৫ হাজার রুপিতে কিই বা করা যাবে। একটা সফল বিজ্ঞাপনী সংস্থার জন্য প্রয়োজন আরও অনেক বেশি পুঁজির। আর এজন্য ব্যাংক লোনের চেষ্টা শুরু করে সে। কিন্তু সুপ্রিয়া পারসোনাল গ্যারান্টি ও কোনও নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স প্রদান তো দূরে থাক, ব্যাংকের প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য যে প্রসেসিং ফি-র দরকার হয়, সেটাই জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়। তাই তার দেখা স্বপ্নের ওখানেই জীবন্ত সমাধি হওয়ার উপক্রম হয়।

কিন্তু ততদিনে মেয়ের প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি, অধ্যাবসায় আর হার-না-মানা মানসিকতা দেখে তার বাবার মন একটু হলেও নরম হয়। তখন তিনি এগিয়ে আসেন মেয়েকে অর্থনৈতিকভাবে কিছু সাহায্য করার উদ্দেশ্যে। তিনি নিজেই মেয়ের হাতে তুলে দেন ব্যবসা শুরু করার জন্য কিছু অর্থ। কিন্তু তখন আরও একবার, এবং শেষবারের মত আল্টিমেটাম দিতেও ভোলেন না ‘এক বছরই রয়েছে তোমার হাতে সময়। হয় সফল হও, নয়ত আমার পছন্দ করা পাত্রের সাথে বিয়ে বসতে হবে।’

তবে একবার নিজের কোম্পানি তৈরি করার পর সুপ্রিয়া যেন আগের চেয়েও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে। এটা যেন তার কাছে এক জীবনমরণ লড়াই। যে করেই হোক সফল হতে হবে তাকে। এজন্য দিন নেই রাত নেই, অক্লান্ত পরিশ্রম করে যেতে থাকে সে।

মানুষের সাথে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মিশতে পারার একটা সহজাত গুণ ছিল সুপ্রিয়ার মধ্যে। সেই গুণটাকে কাজে লাগিয়ে খুব দ্রুতই সরকারি ও প্রাইভেট সেক্টরের একাধিক ক্লায়েন্ট জুটিয়ে ফেলে সে। তাদের মধ্যে ইনসা, নিবসকম, হিটাচি, স্যামসাং, রাঠি স্টিল বারসের মত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যতম। ধীরে ধীরে তার কোম্পানির কার্যক্রমও বাড়াতে থাকে সে। শুধু বিজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ না থেকে, পাশাপাশি ক্লায়েন্টদের গ্রাফিক, ওয়েব ডিজাইন, মার্কেটিং, আইডেন্টিটি ডেভেলপমেন্ট, কর্পোরেট প্রেজেন্টেশন, ফটোশপ প্রভৃতি সেবা দিতে শুরু করে তারা। যত দিন যায়, অবস্থার ক্রমশ উন্নতি ঘটতে থাকে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে তার কোম্পানির সুনাম।

বাবার বেঁধে দেয়া এক বছর সময়সীমার মধ্যেই নিজেকে দারুণ সফল একজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় সুপ্রিয়া। ফলে বাবাও আর তার স্বপ্নপূরণের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান না। বরং মেয়েকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন ডানা মেলে মুক্ত আকাশে উড়বার। তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি সুপ্রিয়াকে। মাত্র তিন বছরের মাথায়, ২০১২ সালে সুপ্রিয়া দিল্লীতে শুরু করে তার নতুন ই-কমার্স কোম্পানি, খৌগাল ডিলস। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই কোম্পানির শাখা ছড়িয়ে পড়তে থাকে উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে। বড় বড় বিনিয়োগকারীরা বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করে সুপ্রিয়ার কোম্পানিতে।

এভাবে এখন পর্যন্ত ১৪টি বড় শহরে গড়ে উঠেছে তার কোম্পানির শাখা। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তার জয়যাত্রা। বিজ্ঞাপনী সংস্থা দিয়ে কাজ শুরু করা সুপ্রিয়া এখন গড়ে তুলেছে তার নিজের মুভি প্রোডাকশন হাউজও। আর মাত্র ৫০০০ রুপি নিয়ে ব্যবসা শুরুর পর সাড়ে ছয় বছরের মধ্যেই সেই ব্যবসার মূল্যমান ছাড়িয়ে গেছে পঞ্চাশ কোটি রুপি।

সুপ্রিয়ার জীবনের এই গল্প নিছকই কোন গল্প নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য সুপ্রিয়া এখন এক মস্ত বড় অনুপ্রেরণার নাম। সুপ্রিয়ার দেখাদেখি ভারতের অনেক মেয়ের মধ্যেই এখন এ বিশ্বাস জন্মেছে যে পড়ালেখা শেষ করে বিয়ে করাই কোন মেয়ের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য হতে পারে না।  মনে যদি থাকে উদ্যম আর ইচ্ছাশক্তি, তবে সেগুলোকে পুঁজি করে আকাশটাকেও ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব, যেমনা ছুঁয়েছে সুপ্রিয়া!

সূত্র: কেনফোলিওস

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত