ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬ আপডেট : ৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫২

প্রিন্ট

লাখো ‘ভালোবাসার আলোয়’ ভাষা শহীদদের স্মরণ

লাখো ‘ভালোবাসার আলোয়’ ভাষা শহীদদের স্মরণ
নড়াইল প্রতিনিধি

‘অন্ধকার থেকে মুক্ত করুক একুশের আলো, একুশের আলোয় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে লাখো মোমবাতি প্রজ্বলনের মধ্যদিয়ে নড়াইলবাসী স্মরণ করল ৫২’র ভাষা শহীদদের। প্রতিবছরের মতো এ বছর ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শহরের কুড়িরডোব মাঠে আয়োজন করা হয় এ অনুষ্ঠানের।

একুশের আলো, নড়াইলের আয়োজনে একইসাথে ভাষা দিবসের ৬৯তম বার্ষিকীতে ৬৯টি ফানুষ ওড়ানো হয়। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে কুরিরডোব মাঠে লাখো মোমবাতি একসাথে জ্বলে ওঠে। ভাষা শহীদদের স্মরণে এবারের লাখো মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।

বিশাল কুররডোব মাঠে অন্যান্যবারের মতো এবারও কলার গাছ এবং কাঠ দিয়ে শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বাংলা বর্ণমালা ও বিভিন্ন আল্পনা তুলে ধরা হয়। সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্জলনে কয়েক হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এ সময় ‘আমার ভায়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ এই গানের মধ্যদিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের গণসংগীত শুরু হবে। নান্দনিক এ অনুষ্ঠানটি নড়াইল এবং বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার দর্শক উপভোগ করেন।

একুশের আলোর সভাপতি প্রফেসার মুন্সী হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন খান নিলু, সাধারণ সম্পাদক ও নাট্য ব্যক্তিত্ব কচি খন্দকার, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মলয় কুন্ডু প্রমুখ।

হাজারো দর্শদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে এ মাঠটি। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্ট্রান, ধনী-গরীবের ভেদাভেদ ভুলে সকলে মেতে ওঠে আনন্দে। ঢাকা, বাগেরহাট, যশোর, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, সাতক্ষিরা, খুলনা, মাগুরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দর্শকরা নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখে আনন্দিত।

শুরুর কথা: বীরশ্রেষ্ট নূর মোহাম্মদ স্মৃতি সংসদের সভাপতি খন্দকার শাহেদ আলী শান্ত বলেন, ১৯৯৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম স্থানীয় বীরশ্রেষ্ট নূর মোহাম্মদ স্মৃতি সংসদের আয়োজনে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্যক্রম শুরু করে। প্রথমদিকে উদ্যোগ নেয়া হয় ভাষা শহীদদের স্মরণ করার জন্য বীরশ্রেষ্ট নূর মোহাম্মদ স্মৃতি সংসদের সদস্যদের নিজ নিজ বাড়ি এবং স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানোর মধ্যদিয়ে। পরে প্রফেসর মুন্সী হাফিজুর রহমান, বর্তমান নাট্য ব্যক্তিত্ব কচি খন্দকার, খন্দকার শাহেদ আলী শান্তসহ স্থানীয়রা এ অনুষ্ঠান কুড়িরডোব মাঠে করার সিদ্ধান্ত নেয়। গঠন করা হয় একুশ উদযাপন পর্ষদ। এ উদযাপন পর্ষদের আয়োজনে শহরের কুড়িরডোব মাঠে প্রথমে দুই হাজার মোমবাতি জ্বালিয়ে এ অনুষ্ঠান করে।

বর্তমান অবস্থা: ১৯৯৮ সালে প্রেয়াত চিত্রশিল্পী কাজল মুখার্জীর আঁকা আল্পনার মধ্যদিয়ে কুড়িরডোব মাঠে দুই হাজার মোমবাতি নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও হাটিহাটি পা পা করে প্রতি বছরই বৃদ্ধি পেতে থাকে মোমবাতির সংখ্যা। এর সাথে যোগ হয় মাটির তৈরী প্রদীপ। গত বছর ৫০ সহস্রাধিক প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানো হয়। এর সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পেতে পেতে এ বছর জ্বালানো হয় প্রায় এক লক্ষ। বেসরকারি কোম্পানি ‘রবি’ এতে সহযোগিতা করে।

যেভাবে সাজানো হয় মাঠঃ ভাষা শহীদদের স্মরণে মাঠকে সাজানোর কাজ শুরু হয় সকাল থেকে। মাঠের চারপাশ ঘিরে রাখা হয় বাঁশ এবং রশি দিয়ে। মাঠে বিভিন্ন ধরনের আল্পনা একে তার ওপর মাটি ছিদ্র করে মোমবাতি সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়। স্থানীয় যুবকরা কোন প্রকার পারিশ্রমীক ছাড়াই নিজ নিজ উদ্দোগে এ কাজ করে প্রতিবছর। সাজিয়ে রাখা প্রদীপে সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্বলন শুরু করা হলে স্বেচ্ছা সেবকরা চারপাশ থেকে জ্বালানো শুরু করে। চলে দেশত্ববোধক গান। এ সময় শহরের বিদ্যুৎ প্রায় এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া: দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দর্শকরা প্রতিবছরের মতো এ বছরও এ দৃশ্য দেখে তাদের চোখ ভরে যায়।

খুলনা থেকে আগত কলেজছাত্রী লামিয়া জানান, নড়াইলের দ্বীপশিখা প্রজ্বলনের এ দৃশ্য না দেখে দূরে থাকলে জীবন থেকে অনেক বড় কিছু একটা হারিয়ে গেছে বলে মনে হতো। তাই দেখতে এসেছি।

কলেজছাত্রী সংযুক্তা বলেন, এখানের দ্বীপশিখা প্রজ্বলনের কথা শুনেছি। এ বছর প্রথম দেখলাম। আগামীতে আবার আসব।

মাগুরা থেকে আগত ফরহাদ হোসেন জানান, যেখানে থাকি না কেন প্রতিবছরের ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নড়াইলে চলে আসি মোমবাতি প্রজ্বলনের দৃশ্য দেখার জন্য।

সাতক্ষিরা থেকে আগত মেহেদী হাসান জানান, নড়াইলের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রদীপ প্রজ্বলন একটি সুন্দর অনুষ্ঠান, যা আমার অত্যান্ত ভালো লাগছে।

আয়োজক: একুশের আলো উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রফেসর মুন্সী হাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিবছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ২১ উদযাপন পর্ষদের আয়োজনে আমরা এ অনুষ্ঠানটি করে আসছি। নড়াইলের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে।

সাধারণ সম্পাদক ও নাট্য ব্যক্তিত্ব কচি খন্দকার বলেন, অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার প্রথম ধাপ ভাষা আন্দোলন। আমরা মনে করি এখনও পৃথিবী থেকে সকল অন্ধকার দূর হয়নি। তাই আমরা নড়াইলের দীপশিখা প্রজ্বলনের মধ্যদিয়ে সকল জড়তা এবং অন্ধকারকে দূর করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

তিনি আরো বলেন, দীপশিখা প্রজ্বলনের অনুষ্ঠানটি একদিন আর্ন্তজাতিক মানের অনুষ্ঠান হবে বলে আমার বিশ্বস। এ রকম একটি অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এটি আমাদের অনুষ্ঠান নয়, নড়াইলবাসীর অনুষ্ঠান।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, দীপশিখা প্রজ্বলন অনুষ্ঠান নড়াইলবাসীর প্রাণের অনুষ্ঠান। আমরাও এ অনুষ্ঠানটি উপোভোগ করি। এ অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করা জন্য আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই সার্বিক সহযোগিতা করা হয়ে থেকে। আজও এ অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত