ঢাকা, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২০, ২০:২২

প্রিন্ট

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট

স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আসছে

স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আসছে
মৃত্তিকা সাহা

আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে সরকার ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়াতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। করোনা ভাইরাসের আক্রমণে বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার যে চিত্র দেখা গেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই বরাদ্দ বাড়াতে যাচ্ছে। এছাড়া, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ৩ ও ১০ বছর মেয়াদী দুটি পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

চলতি অর্থবছরে ১৬-১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মাত্র ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ করেছে, যা মোট বাজেটের ৫ শতাংশের কম। এবার তা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। তবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ এক শতাংশেরও কম, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৪৮ টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। উন্নত দেশগুলোতে এই বরাদ্দ ১০ শতাংশের ওপরে।

এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে এই সময়ে নানা প্রকল্প নেওয়া হবে। দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকার ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসে স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ারও পরিকল্পনা করছে। শুধু তাই নয়, এসব দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে এই পরিকল্পনায়।

তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ১০ বছর মেয়াদি আরও বড় পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নেবে। ১০ বছর আগে সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে যেভাবে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, এবার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নেও সরকার একই পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে করোনা সামাল দিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আড়াই হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অনুদানে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী সরাসরি কেনার প্রস্তাব আছে। করোনা সংক্রান্ত প্রকল্প দুটি হলো, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকার কোভিড ১৯ ইমারজেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্প এবং এডিবির সহায়তায় ১ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার কোভিড ১৯ রেসপন্স ইমারজেন্সি অ্যাসিসট্যান্স প্রকল্প। প্রকল্প দুটি গত সপ্তাহে পাস হলেও টাকা খরচ শুরু হবে আগামী অর্থবছর থেকে। সব জেলা হাসপাতালে আইসোলেশন সেন্টার নির্মাণ এবং সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ইউনিট তৈরিই প্রকল্প দুটির মূল উদ্দেশ্য। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীও কেনা হবে। এ ছাড়া আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার জন্য ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। জনবল সংকট কমাতে ইতিমধ্যে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা, দেশে স্বাস্থ্যখাতে যে সরকারি খরচ, সেটি পৃথিবীর যে দেশগুলিতে সবচেয়ে কম তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে ০.৫ থেকে ০.৬ শতাংশ খরচ করা হয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবায়। স্বাস্থ্যখাতে এত কম সরকারি খরচ করে করোনাভাইরাসের মতো একটি সংক্রমণ এবং এর ফলে স্বাস্থ্যসেবার যে সংকটটি দেখছি, সেটি মোকাবিলা করা খুবই কঠিন।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, ‘এবারের বাজেটে আমাদের প্রত্যাশা ছিল স্বাস্থ্যখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত যতটুকু আমরা শুনছি, তাতে আমরা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না। এবারের বাজেটে গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের বরাদ্দ না দেওয়া হলে যে বিপদটি হবে তা হলো সংক্রমণ এখন যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সামনের দিনেও এই সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর যে বিশাল চাপ আসবে, আমরা যদি অল্প সময়ে আমাদের সক্ষমতা সেভাবে বাড়াতে না পারি, তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করা খুবই কঠিন হয়ে যাবে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের পরিমাণগত পরিবর্তন হলেও গুণগত পরিবর্তন হয়নি। মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও ষাটোর্ধ মানুষেরা নানা ধরনের অসুখ-বিসুখে ভুগছেন। অথচ চীনের মতো দেশের ষাটোর্ধ মানুষেরাও অনেক সক্ষম। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ডা. রুবায়ুল মোরশেদ বলেন, এটি হলো ‘মেডিকেল প্রভার্টি’।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বাবদ মাথাপিছু ব্যয় সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ সরকারের ব্যয় সবচেয়ে কম। তাই দেশের মানুষের আয়ু বৃদ্ধি খুব সুখকর হয়নি, এর যেমন অর্থনৈতিক চাপ আছে, তেমনি স্বাস্থ্যগত চাপও আছে। সে জন্য রবাইয়ুল মোরশেদ মনে করেন, বরাদ্দ তো বাড়াতে হবেই, এর সঙ্গে টাকা ব্যবহারের ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে। দক্ষ জনবল সৃষ্টি করতে হবে।

এদিকে গত ১০ বছরে বাজেটের আকার যে হারে বেড়েছে, স্বাস্থ্য বাজেট সেই হারে বাড়েনি। এ সময়ে মন্ত্রণালয়টির বাজেট বেড়েছে তিনগুণ। বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় সোয়া চারগুণ। ২০১০-১১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকায়। আর ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল এক লাখ ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত