ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৪১

প্রিন্ট

তিস্তার করাল গ্রাস

কাশিমবাজার যেন বিচ্ছিন্ন জনপ

কাশিমবাজার যেন বিচ্ছিন্ন জনপ
গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়ন যেন পরিত্যক্ত এক জনপদ। ইউনিয়নের কাশিমবাজার যেন এক নতুন ছিটমহল। গত দুই মাসে তিস্তা নদীর ভাঙনে এই বাজারের চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে।

নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও সরকারি কোনো কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজ নিতে আসেননি। ভাঙন কবলিতদের পাশে দাঁড়াতে জনপ্রতিনিধিদের নেই কোনো উদ্যোগ। নেই ভাঙন প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা।

গাইবান্ধার মানচিত্রে হরিপুরের কাশিমবাজার থাকলেও ওই এলাকা দেখাশোনার দায়িত্ব কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের বলে দাবি করেছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১১ নং হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজারের বাসিন্দা রওশন আরা বেগম। জন্মের পর বাবাকে দেখেননি। অনেক কষ্টে বড় করা মেয়েও এক দুর্ঘটনায় তাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমায়। মেয়ের মরদেহ বাড়ির উঠানে কবর দেয়া হয়। কষ্টের মাঝে মেয়ের কবর দেখে মনে সান্ত্বনা পেতেন রওশন আরা। মনে করতেন আদরের মেয়ে তার পাশেই আছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে মেয়ের কবরসহ তার ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ভিটেমাটি হারা রওশন আরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মনে অনেক কষ্ট। কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। আমরা কোন দেশে আছি। আমাদের জন্য কেউ দয়া করে না। এখন আর বাঁচার ইচ্ছা নেই। আল্লাহ আমাদের মরণ দাও।

নদীভাঙনের শিকার আলেয়া বেগম বলেন, আমাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। সরকারি কোনো কর্মকর্তা তো দূরের কথা আমরা যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি; তারাও খোঁজ নিতে আসেনি।

ভাঙনের শিকার আবু তালেব বলেন, ভিটেমাটি সব নদীতে গেল, ভিডিও করে কী লাভ। ঘরবাড়ি কি আর ফিরে আসবে। সবাইকে চেনা হয়েছে, বিপদে কেউ আসে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, হরিপুর ইউনিয়নের রওশন আরা, আলেয়া আর আর আবু তালেবের মতো গত দুই মাসে ভিটেমাটি হাড়িয়ে নিঃস্ব হয়েছে চার শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরবাড়ি সরাতে ব্যস্ত সবাই। কারও সঙ্গে কথা বলার যেন সময় নেই তাদের। এমন পরিস্থিতিতে এখনও কোনো জনপ্রতিনিধি ভাঙনকবলিতদের পাশে দাঁড়ায়নি বলে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরাও অভিযোগ করছেন।

হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, আমরা বার বার যোগাযোগ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি, কিন্তু তারা নেয়নি। ফলে আমার বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ভাঙন প্রতিরোধের জন্য গাইবান্ধায় যোগাযোগ করলে বলে কুড়িগ্রামের কথা, আর কুড়িগ্রামে যোগাযোগ করলে বলে গাইবান্ধার কথা। কেউ আসেনি খোঁজ নিতে। আমরা কোন জেলার বাসিন্দা এখনও বুঝতে পারছি না।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসা শিক্ষক মঞ্জুরুল হক বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে কুড়িগ্রাম অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছুটা কাজ করলেও তা ছিল লোক দেখানো। এখানে কোনো জনপ্রতিনিধি কারও খোঁজ নিতে বা সাহায্য করতে কখনও আসে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মেম্বার আব্দুস ছাত্তারের সঙ্গে কথা হলে তিনি সব দোষ দেন ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির।

আব্দুস ছাত্তার বলেন, দুই চরের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণে ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি কখনও কাশিমবাজারে আসেন না। আমি যে মেম্বার, আমাকে যে জনগণ ভোট দিয়েছে তাদের সেবা করার জন্য এই কথা চেয়ারম্যান বুঝতে চান না। তিনি এই এলাকায় কখনও আসেন না। চেয়ারম্যান না চাইলে আমি কীভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াবো।

হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কী কাজ করলাম আর না করলাম সে জবাবদিহিতা কি আপনাকে দিতে হবে? উপজেলায় আসেন কী কী কাজ করেছি দেখে যান।’

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম সরকারের মুঠোফোনে বার বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তিস্তা নদীর কাশিমবাজার পয়েন্টে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, গাইবান্ধার মানচিত্রে হরিপুরের কাশিমবাজার থাকলেও গাইবান্ধা থেকে ওই এলাকা অনেক দূরে। ওই এলাকার দেখাশোনার দায়িত্ব কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেত নিতে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত