ঢাকা, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ২১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২০, ১৯:৪৭

প্রিন্ট

মাটি ছাড়াই সবজির চারা উৎপাদন

মাটি ছাড়াই সবজির চারা উৎপাদন
সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর প্রতিনিধি

সদিচ্ছা, কর্ম উদ্যম আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যেকোন ব্যক্তিই হতে পারে স্বাবলম্বী। স্বল্প শিক্ষিত হয়েও স্বল্প জায়গার মধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই ভাইরাসমুক্ত সবজি চারা উৎপাদন ও বিক্রির কেন্দ্র। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকেরা সবজির নার্সারি থেকে কিনে নিচ্ছে মরিচের চারা, টমেটোর চারা, বেগুনের চারা, ফুলকপি, বাঁধাকপির চারা, লাউ গাছের চারাসহ ১০ প্রজাতের সবজির চারা।

মাটি ছাড়াই শুধুমাত্র গোবর সার আর নারিকেলের ছোবড়া পচানো গুঁড়া মিশিয়ে বাম্পার ক্ষমতাসম্পন্ন জৈব পদার্থ তোইরি করা হয়। এটি মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে বিশেষভাবে সহায়তা করে। প্লাষ্টিকের ট্রে'র মধ্যে রেখে বিভিন্ন সবজির বীজ বোপণের তিন দিনের মধ্যেই অঙ্কুর বের হয়। সাত দিনের মধ্যেই দুই-চারটি পাতা বের হয়। এর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চারা বিক্রির উপযুক্ত হয়ে যায়।

দিনাজপুর জেলা সদরের সুন্দরবন ইউনিয়নের রামডুবি গ্রামের সুবাস চন্দ্র দাসের ছেলে নিরাবন চন্দ্র দাস (৩৭) রামডুবি কামারের মোড়ে গড়ে তুলেছেন নিবারন সবজির নার্সারি।

পরিত্যক্ত জায়গায় বিশেষ পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই ভাইরাসমুক্ত সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে স্বল্প সময়ে বেকারত্ব ঘুচিয়ে লাভবান হয়েছেন নিবারন চন্দ্র। পাশাপাশি কয়েকজন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে নার্সারিতে। তার দেখাদেখি একই ইউনিয়নের বেলবাড়ী বাজার সংলগ্ন গুচ্ছগ্রামের পাশেই বেশ বড় সবজির চারা উৎপাদন নার্সারি গড়ে উঠেছে।

এখন শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি চলছে দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায়। জমি প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কৃষকেরা। আর এই শীতকালীন সবজি চাষকে সামনে রেখে বিশেষ পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই কোকোপিটের সাহায্যে ৬ শতক জমিতে সবজির চারা উৎপন্ন করছেন দিনাজপুর সদরের সুন্দরবন ইউপির রামডুবি গ্রামের নিবারন চন্দ্র দাস। উৎপাদন শুরুর দুই মাসের মধ্যেই দেড় লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন তিনি।

কোকোপিট (নারিকেলের ছোবড়ার পচানো গুঁড়া) একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জৈব পদার্থ যা মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। কোকোপিটের পিএইচ সবসময় ৫.৫ থেকে ৭ থাকে যা সুস্থ উদ্ভিদ তৈরিতে এবং খুব সহজেই উন্নতমানের গাছপালা তৈরিতে সাহায্য করে।

টবে মাটি ব্যবহার করলে ওজন বেশি হয়। কিন্তু কোকোপিট ব্যবহার করলে কম হয়। ছাদের ওপর অনেক টব ব্যবহার করলে লোড ক্যাপাসিটি কম হয়। কোকোপিট দিয়ে যেকোনো প্রকার চারা তৈরি বা গাছ লাগানো যেতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই।

সবজির চারা কিনতে আসা হাসেম আলী বলেন, নিজ বাসার পরিত্যক্ত জায়গায় বেগুন, মরিচ আর লাউ গাছের চারা লাগাবো -এই উদ্দেশ্যে চারা কিনতে এসেছি। এই নার্সারির চারা অনেক ভালো। তেমন নষ্ট হয় না। অল্প দিনের মধ্যেই ফলন চলে আসে।

বেলডাঙ্গী গ্রামের চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি গত এক সপ্তাহ আগে নিবারন চন্দ্র দাসের নিকট থেকে কয়েক প্রকার সবজির চারা কিনে জমিতে রোপণ করেছি। চারাগুলো অনেক ভালো আছে। আজ আবারও বাঁধাকপি, মরিচ, বেগুন, লাউ ও ঢেঁড়সের চারা কিনতে এসেছি।

সবজির চারার নার্সরি দেখাশুনা করেন নারী শ্রমিক দিপালী রানী। তিনি বলেন, নিবারন দাদার নার্সারিতে প্রতিদিন তিনশ' টাকা হাজিরা দেয়া হয়। এখানে ট্রের মধ্যে থাকা বিভিন্ন সবজির চারাগুলোতে স্প্রের মাধ্যমে পানি দিতে হয়। যখন ক্রেতা চারা ক্রয় করার জন্য আসেন, তখন তাদেরকে ট্রে থেকে তুলে দিতে হয়।

নিবারন চন্দ্র দাস জানান, বিশেষ পদ্ধতিতে কোকোপিটের সাহায্যে দ্বারা তৈরি ভাইরাসমুক্ত সবজির চারা তৈরি এবং বিক্রি করা হয়। এই চারা তৈরিতে ট্রে ব্যবহার করা হয়। এতে কোনোভাবেই গাছ বা চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। উদ্ভিদের শিকড় উন্নয়নের জন্য একটি স্তর এবং গাছ বা চারা রোপণ করার সময় কোনো এজেন্ট প্রয়োজন হলে জৈব সারের সাথে কোকোপিটের সংমিশ্রণে একটি গ্রোয়ার মাধ্যম তৈরি করে সরাসরি চারা তৈরি করা যেতে পারে। কোকোপিট মাটির তুলনায় অনেক হালকা এবং টবে ব্যবহারের সময় খুব সহজেই ভেতরে বাতাস চলাচল করতে পারে, যার ফলে গাছ বেশি বেশি অক্সিজেন নিতে পারে। কোকোপিটের শোষক সময়কাল অনেক। ফলে এটা গাছে ধীরে ধীরে শোষিত হয়।

তিনি আরও জানান, বেসরকারি সংস্থা জেবিকা এন্টারপ্রাইজের পরামর্শে দিনাজপুর সদরের রামডুবি গ্রামের রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত এক আত্মীয় জায়গায় গত দুই মাস আগে এ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথমে চারা তৈরির জন্য ৯০০টি ট্রে, কোকোপিট, নেটসহ উপকরণ ক্রয়সহ খরচ পড়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। একবারেই এসব ক্রয় করতে হয়েছে। তবে চারা বিক্রির পর কোকোপিট ক্রয় করতে হয়। প্রতিটি ট্রে ৪৬টাকা এবং কোকোপিট ২০টাকা কেজি দরে ক্রয় করতে হয়। একই ট্রে এবং নেট কয়েক বছর চলে যায়, তাই বারবার কিনতে হয় না।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৫০ জন কৃষক তার কাছে চারা কিনেছেন। এখন বেগুন, লাউ, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কুমড়াসহ নানা ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। চারাগুলো দেড় টাকা থেকে ২ টাকায় প্রতিটি বিক্রি করা হয়। মৌসুমের আগেই চারা উৎপন্ন করে বিক্রি করা যায়। এতে ভালো দাম পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত দেড় লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়েছে। অনেক কৃষক আগাম সবজির চারা কেনার জন্য অর্ডার দিচ্ছে। কৃষকরাও আগাম এসব চারা নিয়ে ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন।

সুন্দরবন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান অশোক কুমার রায় বলেন, রামডুবি গ্রামের নিবারন চন্দ্র দাসের সবজির চারা নার্সারি পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম। নিবারন একসময় বেকার যুবক ছিল, এখন সে স্বাবলম্বী। তার নার্সারিতে তিনজন শ্রমিক সবসময় কাজ করছে। এটা নিঃন্দেহে সমাজের জন্য ভালো কাজ। সে বিশেষ পদ্ধতিতে বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করছে। একদিকে যেমন চাষিরা লাভবান হচ্ছে, অন্যদিকে সেও লাভবান হচ্ছে। চাষিরা ভালো বীজের চারা পাওয়ায় ভালো ফসল ঘরে তুলতে পারছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত