ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ২৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৭:০৭

প্রিন্ট

স্বাধীনতার ৫০ বছর

যেভাবে নেতা হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু

যেভাবে নেতা হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু

জার্নাল ডেস্ক

১৯৬০এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ সালের ছয়দফা প্রস্তাব থেকে শুরু করে ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং এরপরে ৭০-এর নির্বাচন, এসব রাজনৈতিক পরিক্রমার ভেতর দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে উঠেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র নেতা হওয়ার পেছনে আন্যতম ছিলো ১৯৬৬ সালের ছয়দফা প্রস্তাব। ছয় দফা ঘোষণার পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ-এর পূর্ব পাকিস্তান প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি এই যে ৬ দফা দিলেন তার মূল কথাটি কী?

আঞ্চলিক ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন শেখ মুজিব। তিনি বলে ছিলেন আরে মিয়া বুঝলা না, দফা তো একটাই। একটু ঘুরাইয়া কইলাম।

ঘুরিয়ে বলা এই এক দফা হলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ স্বাধীনতা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলের স্বাধিকার আন্দোলনের দাবি উঠেছে কিন্তু ছয় দফার দাবির মধ্য দিয়ে এটি একক এজেন্ডায় পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে এই দফা পেশ করেন। অনেকে এসব দাবিকে রাজনৈতিক বোমা বলে উল্লেখ করেছেন।

যুদ্ধের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদরা উনিশ'শ ছেষট্টি সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় সম্মেলন ডাকা হয়।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে ওই সম্মেলনে যান শেখ মুজিবুর রহমান এবং আগের দিন সম্মেলনের বিষয় নির্ধারণী কমিটির সভায় ছয় দফা পেশ করেন। ছয় দফার ছিলো তিনটি স্বতন্ত্র দিক: রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামো।

শেখ মুজিব বিরোধী দলগুলোর যে সম্মেলনে এসব দফা তুলে ধরেছিলেন সেখানেই তার বিরোধিতা করা হয়। সবার আপত্তির কারণে এই প্রস্তাব সম্মেলনের এজেন্ডায় স্থান পায়নি। ক্ষুব্ধ হয়ে শেখ মুজিব সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করেন।

রাজনীতিবিদরা বলেন, এসব দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান থাকবে না, ভেঙে যাবে। পাকিস্তানের খবরের কাগজে তাকে চিহ্নিত করা হয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে।

নিজের দল আওয়ামী মুসলিম লীগেরও সব নেতার সমর্থন ছিলো না ছয় দফার প্রতি। তবে ছাত্রলীগের তরুণ নেতারা শেখ মুজিবের পাশে ছিলেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিও ছয় দফার বিরোধিতা করে।

ছয় দফাকে প্রয়োজনের অস্ত্রের ভাষায় মোকাবেলার হুমকি দিয়েছিলেন সামরিক শাসক আইয়ুব খান। লাহোর থেকে ঢাকায় ফিরে পরের মাসেই এসে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন তাজউদ্দীন আহমদ।

ছয় দফা কর্মসূচি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য তারা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করতে শুরু করেন। এই কর্মসূচিকে তারা 'বাঙালির বাঁচার দাবি' হিসেবে অভিহিত করেন।

এর পর শেখ মুজিবকে বারবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখা হয় এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তখনই শোনা গেল 'জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো' এই স্লোগান। তখন শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ডাকা হয়। হরতালে পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দলকে চাঙ্গা করা এবং দলের প্রধান হয়ে ওঠার জন্যেও শেখ মুজিবের এরকম একটি কর্মসূচির প্রয়োজন ছিলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রওনক জাহান বলেন, ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী মারা যাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান দলটির হাল ধরেন। সোহরাওয়ার্দীর পরে পূর্ব বাংলায় এবং আওয়ামী লীগে যারা রাজনীতি করতেন তারা কেউ কেন্দ্রীয় সরকারে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করা, কিম্বা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না।

শেখ মুজিবর রহমান তখন দলের নেতা হতে যাচ্ছেন এবং এজন্য তার একটা কর্মসূচির প্রয়োজন ছিলো যা বাঙালির আকাঙ্ক্ষাকে ধরতে পারবে। এখানে নতুন আঙ্গিকে স্বাধিকারের কথা বলা হলো যা তাদেরকে স্বাধীনতার পথ দেখালো।

এর পরই তিনি প্রেসিডেন্ট হলেন এবং এই কর্মসূচি নিয়ে সারা দেশে মহকুমায় মহকুমায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। তখন তিনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এসময় শেখ মুজিবের সফরসঙ্গী ছিলো তাজউদ্দীন আহমদ।

তার কন্যা শারমিন আহমদ তার 'তাজউদ্দীন আহমদ/নেতা ও পিতা' গ্রন্থে লিখেছেন: আইয়ুব খানের বৈদেশিক মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন ছয় দফাকে অযৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য মুজিব কাকুকে ঢাকার পল্টনের জনসভায় তর্কযুদ্ধের আহবান জানালেন। মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে পরামর্শ করে ভুট্টোর চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করলেন।

আব্বু ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করে মুজিব কাকুর চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সংবাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে জ্ঞাপন করলেন। আব্বুর সঙ্গে কথা বলার পরপরই ভুট্টো বুঝতে পারলেন ছয় দফার যৌক্তিকতা আব্বু এমন নিপুণ ও তথ্যবহুল যুক্তিতে দাঁড় করিয়েছেন যে মুজিব কাকু ও তার দলকে তর্কে হারানো মুশকিল। আব্বুর সঙ্গে কথা শেষ করার পর ভুট্টো মুসলিম লীগ নেতাদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন হি ইজ ভেরি থরো, শেখের যোগ্য লেফটেন্যান্ট আছে দেখছি।

কিন্তু পরে সেই তর্কযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় নি। এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে গণজাগরণের সৃষ্টি হলো। দৈনিক ইত্তেফাক এর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

রওনক জাহান বলেন, এর আগে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা থেকে শুরু করে আরো অনেক এজেণ্ডা ছিলো। কিন্তু ছয় দফা দেয়ার পর থেকে জাতীয়তাবাদের বিষয়টি একমাত্র এজেন্ডায় পরিণত হলো। তখন লোকজনকে সংগঠিত করা অনেক বেশি সহজ হলো। হয় আপনি আমাদের পক্ষে অথবা বিপক্ষে।

তিনি আরো বলেন, একারণে শেখ মুজিব খুব দ্রুত সকল মানুষকে জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার পক্ষে নিতে পারলেন এবং ৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে দেশকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত পথে নিয়ে গেলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার নিজের কানে শোনা। ছাত্রলীগের নেতা সিরাজুল আলম খান একটি সভায় মন্তব্য করেছিলেন যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই এদেশকে স্বাধীন করতে হবে। কারণ লোকে তার কথা শোনে। অর্থাৎ ৬ দফার পর তিনি অবিসম্বাদিত নেতা হয়ে উঠতে শুরু করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয় এবং এর পর থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন বাঙালির মুখপাত্র।

তিনি বলেন, এখানে স্বাধীনতার কোন কথা লেখা ছিলো না। সেখানে ছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের সুপারিশ। এবং স্বায়ত্তশাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা পথ-নির্দেশ। এটা ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কৌশল।

ছয় দফা ঘোষণার পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের জন্ম হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান হন তার প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

বাংলাদেশ জার্নাল/এমএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত