ঢাকা, সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ২৯ চৈত্র ১৪২৭ আপডেট : ১১ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২১, ১৭:১১

প্রিন্ট

সামাজিক কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে জিটিসি চ্যারিটি হোম

সামাজিক কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে জিটিসি চ্যারিটি হোম
ছবি: প্রতিনিধি

দিনাজপুর প্রতিনিধি

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উৎপাদন ও খনি উন্নয়নের পাশাপাশি খনি এলাকাবাসীদের জন্য সামাজিক কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে খনির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)।

খনির সম্মুখে সমাজ কল্যাণ সংস্থা জিটিসি চ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সেই সাথে প্রতি মাসে খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত সন্তানদের মাসিক শিক্ষা উপবৃত্তি এবং ওই এলাকার নন এমপিভুক্ত মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়কে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ এলাকার মসজিদ,মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে আর্থিক ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন জিটিসি।

পার্বতীপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত একটি গ্রাম মধ্যপাড়া। সেই গ্রামটি আজ নিজ পরিচয়ে দেশ বিদেশে পরিচিত। কেননা সেখানে রয়েছে দেশের একমাত্র এবং বৃহৎ উৎপাদনশীল মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ পার্বতীপুর উপজেলার একটি সুনামধন্য এলাকা এই হরিরামপুর ইউনিয়নের মধ্যপাড়া।

৩ হাজার ৮৮৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নে রয়েছে ১৪টি গ্রাম। প্রত্যন্ত এই জনপদে কঠিন শিলা খনির কারণে আজ এখানকার অর্থনীতি অন্য গ্রামীণ জনপদ থেকে অনেকটাই উন্নত।

মধ্যপাড়ার উন্নত শিলার উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে ২০১৩ সালে খনিটির দায়িত্ব তুলে দেন দেশিয় একমাত্র মাইনিং কোম্পানি জার্মানিয়া কর্পোরেশন লিমিটেড ও বেলারুশ কোম্পানি ট্রেস্ট এসএসএর যৌথ প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি’র) হাতে।

সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটিকে লাভের দিকে নিয়ে যেতে দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই জিটিসি খনির উৎপাদন এবং উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে খনির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী তিন শিফট চালু করে এই খনির পাথর উৎপাদন ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি খনির পাথর উৎপাদন ও উন্নয়ন এর পাশাপাশি খনির সন্মুখে চ্যারিটি হোম স্থাপন করে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা দিয়ে এলাকাবাসীদের পাশে দাড়িয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।

এলাকার মানুষ বলছেন ইতি পূর্বে এই খনি এলাকাবাসীর জন্য এমন সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। জিটিসি’র এই সেবামূলক কর্মকাণ্ড একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর জন্য এক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

খনি কার্যক্রমের পাশাপাশি খনির এলাকাবাসীদের জন্য সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে খনি সম্মুখে সমাজকল্যাণ সংস্থা ‘জিটিসি চ্যারিটি হোম’ স্থাপন করা হয়েছে। চ্যারিটি হোমে একজন অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দ্বারা প্রতিদিন খনি এলাকার ৪০/৫০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সেই সাথে প্রতি মাসে খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত সন্তানদের মাসিক শিক্ষা উপবৃত্তি, নন এমপিভুক্ত মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়কে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে আর্থিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছে জিটিসি।

কথা হয় খনি থেকে ১০ কিলোমিটার দূর পাচঁপুকুর গ্রাম থেকে ডাক্তার দেখাতে আসা ৭০ বছর বয়সী বিধবা বৃদ্ধা মোছা. সফিরন বেওয়ার সাথে। তিনি বলেন, ‘মুই অনেকদিন থেকে অসুখে ভুগছো, সরকারি হাসপাতাল মেলা দূর। যাবারও পারো না। মানুষের কাছে শুননু এই খনির জিটিসি নাকি এটি একটা বড় ডাক্তার বসাইছে হামার এলাকার মানুষের চিকিৎসা দিবার তনে। তাই আইছু বাবা। ডাক্তার মোক দেখলো। ওষুধদিল।’

জিটিসি চ্যারিটি হোমে চিকিৎসা নেয়া খনি এলাকার অমিতা খাতুন (৭০) জানান, আমি কাশি এবং সর্দি নিয়ে চ্যারিটি হোমে ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার আন্তরিকতার সাথে আমার সমস্যার কথা শুনেছেন। তার পর ওষুধ দিয়েছেন। সেই ওষুধেই আমি সুস্থ হয়েছি। দ্বিতীয়বার আর যেতে হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন খনি এলাকার শাহাদত হোসেন (৭৫) দেড় মাস আগে জিটিসি’র চ্যারিটি হোমে এসে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি লোক মুখে শুনে জিটিসি চ্যারিটি হোমে এসে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়েছে। তিনি এমন ভালো কাজের জন্য জিটিসিকে ধন্যবাদ জানান।

চ্যারিটি হোমে শিক্ষা উপবৃত্তি গ্রহণ করতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী মোছা. সুলতানা পারভিন বলেন, আমার বাবা প্রায় ২০-২২ বছর ধরে এই খনিতে চাকরি করে আসছেন। ইতিপূর্বে খনি শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে জিটিসি’র মত এমন করে কেউ কখনো ভাবেনি। আমাদের প্রতি মাসে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করে উচ্চ শিক্ষায় সহযোগিতা করায় তিনি জিটিসি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

শিক্ষার্থী মো. নাহিদ আহম্মেদ বলেন, আমার বাবা এই খনিতে প্রায় ২০ বছরের অধিক সময় ধরে খনি উন্নয়ন ও পাথর উত্তোলন কাজের সাথে জড়িত আছেন। খনি শ্রমিকদের পরিবার এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে ইতিপূর্বে কোনো কোম্পানি জিটিসি’র মত করে ভাবেনি। তারা খনি শ্রমিকদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি দিয়ে লেখাপড়ায় উৎসাহিত করেছেন। এ ছাড়া জিটিসি চ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করে অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দিয়ে খনি শ্রমিকদের পরিবারের পাশাপাশি এলাকার মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা প্রদান করছে। এ সকল কর্মকাণ্ড নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, কলেজটি এমপিও ভুক্ত না হওয়ায় তাদের শিক্ষক কর্মচারীরা সরকারি কোনো প্রকার বেতন ভাতা পান না। শিক্ষকদের এমন দুর্দশায় জিটিসি প্রতি মাসে আর্থিকভাবে তাদের সহায়তা করে পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি জিটিসি কর্তৃপক্ষকে বিশেষ করে নির্বাহী পরিচালক জাবেদ সিদ্দিকীকে ধন্যবাদ জানান।

১০ নং হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাসুদুর রহমান শাহ বলেন, গ্রামীণ এই জনপদে স্বাস্থ্য সেবা নিতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদর হাসপাতাল এবং ১৫ কিলোমিটার দুরে ফুলবাড়ি হাসপাতালে যেতে হয়। জিটিসি চ্যারিটি হোম স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের পাশাপাশি অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দ্বারা এলাকার গণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা দিয়ে যে অবদান রাখছে তা নজিরবিহীন।

পাথর খনি লোড আন লোড কুলি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম বলেন, জিটিসি যেভাবে পাথর উত্তোলন করেছে ইতিপূর্বে এমনভাবে কেউ এই খনি থেকে পাথর উত্তোলন করতে পারেনি। জিটিসিই পাথর খনিটিকে লাভজনক করেছে। আবার খনি এলাকাবাসীর জন্য জিটিসি চ্যারিটি হোম স্থাপন করে সেখান থেকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা দিচ্ছে। এতে করে এলাকাবাসী খুশি। এমন কাজের জন্য জিটিসিকে ধন্যবাদ জানান তারা। কেননা আমাদের পাশেই কয়লাখনি রয়েছে। সেখানে খনি এলাকাবাসীর জন্য এমন কোনো সামাজিক কার্যক্রম নেই।

জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) এর নির্বাহী পরিচালক জাবেদ সিদ্দিকী জানান, এই খনির জন্য এলাকাবাসীর অনেক ত্যাগ এবং অবদান রয়েছে। এই খনি নিয়ে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অনেক। আমরা এই পাথর খনিকে সরকারের লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছি। সেই সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের কোম্পানি খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত সন্তানদের শিক্ষা উপবৃত্তি, এলাকাবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জিটিসি চ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করেছে। সামাজিক এই কর্মকাণ্ডে তিনি খনি এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত