ঢাকা, সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ২৯ চৈত্র ১৪২৭ আপডেট : ৪ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২১, ১৭:৩৩

প্রিন্ট

সাক্ষাতকারে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

‘নারীকে নিজের কাজ দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়’

‘নারীকে নিজের কাজ দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়’
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিক।

হাফছা আক্তার, নারায়ণগঞ্জ

‘নারীকে পদে পদে নিজের কাজ দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়’ এমনটাই মনে করেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিক। করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই নিজের পরিবারের থেকে নিজেকে আলাদা করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যান নাহিদা বারিক। লকডাউনের সময় থেকে নিজ উদ্যোগে উপজেলাবাসীদের প্রয়োজনীয় কাজগুলোরও তদারকি করেন তিনি। এমনকি রাত বিরেতে কারো জরুরি প্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছে দেয়ার কাজও করতে দেখা যায় তাকে। এমনকি সে সময় তার এক বছর বয়সী ছোট মেয়েকেও নিজের থেকে আলাদা রাখতে হয়।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জার্নালের বিশেষ সাক্ষাতকারে নাহিদা বারিক বলেন, ‘আমি গভীর রাতে একটি এলাকায় লকডাউন করতে যাওয়ার সময় প্রথম যখন পিপিই পরি, তখন প্রথমবারের মতো করোনার ভয় আমার মধ্যে কাজ করে। আমার ছোট্ট মেয়েটা আমার কাছে দৌড়ে এসেও ভয়ে ফিরে যায়। তবুও আমি নিজের পেশাগত দায়িত্বে বিন্দুমাত্র অবহেলা করার কথা ভাবতে পারিনি। নিজের সকল দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। অথচ পদে পদে নারী হিসেবে আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে আমি যোগ্য আমি দক্ষ।’

তিনি আরো বলেন, ‘নারীর সৌন্দর্য তার রূপে নয়, বরং তার কাজে।’ এক কন্যা সন্তানের মা হিসেবে নিজেকে গর্বিত মা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

২০০৭ সালে ব্যবসায়ী স্বদেশ সাহাকে বিয়ে করার পর স্বামীর ব্যবসার সাথে যুক্ত হন তিনি। এভাবেই তার কর্মজীবনের শুরু। পাশাপাশি স্বামীর সহায়তায় বিসিএসের জন্যও তিনি প্রস্তুতি নেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বরিশাল ডিসি অফিসে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পদে প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন ২৯ তম ব্যাচের এ বিসিএস ক্যাডার।

বাংলাদেশ জার্নাল: করোনার এই সময়ে কাজ করতে গিয়ে নারী হিসেবে আপনার কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো কি?

নাহিদা বারিক: নারী হিসেবে অপ্রীতিকর কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি। তবে মানসিকভাবে ও আবেগের দিক থেকে বেশ উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। যেটা হয়তো কোনো পুরুষ সহকর্মীকে কমই যেতে হয়েছে। এ বিষয়ে একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। একবার এক লোক আমায় ফোন করে জানায় যে তার বাড়িতে দুইদিন ধরে খাওয়ার কিছু নেই। আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে তার বাড়িতে খাবার নিয়ে যাই এবং গিয়ে দেখি বাড়িতে তার গর্ভবতী স্ত্রী রয়েছেন! একজন নারী হিসেবে সে সময় যে ধাক্কাটা আমি পেয়েছি তা কোনো পুরুষ সহকর্মী হয়তো উপলব্ধিও করতে পারেননি।

বাংলাদেশ জার্নাল: এ সময় কাজ করতে গিয়ে পরিবার থেকে আপনি পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছিলেন?

নাহিদা বারিক: আমি আগেও বলেছি যে আমার এক বছর বয়সী ছোট্ট একটা মেয়ে আছে। এ সময় আমাকে তার থেকেও আলাদা থাকতে হয়েছিলো। আমার মা-বাবা এ সময় তার দেখাশোনা করে। যাতে আমার দায়িত্ব আর পরিবারের মধ্যে আমাকে দোটানায় না ভুগতে হয়। তাছাড়া সে সময়ে রাত বিরেতে নানা দুঃসংবাদ আসতো, যার কারণে আমাকে সে মাঝ রাতেও ছুটতে হয়েছে। তখন কোনো সহকর্মী না থাকলে আমার স্বামী আমার সঙ্গে বের হতো। সে আমাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সহায়তা করেছেন এবং কাজে যাতে কোনো প্রকার অবহেলা না করতে হয়, তাও খেয়াল রেখেছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

নাহিদা বারিক: অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে আমি ৩ ভাগে ভাগ করবো। নারীকে অর্থনৈতিক মূলধারায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সামাজিক ক্ষমতায়নের কথা বলতে গেলে নারীর অধিকার ভোগের কথা শুরুতে আসে। আর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে আমরা যা বুঝে থাকি তা হলো রাজনীতিতে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক চর্চা করা। আর আমাদের দেশে যে তা খুব সফলভাবেই হচ্ছে তা আমরা সকলেই জানি।

বাংলাদেশ জার্নাল: সদর উপজেলায় পরপর তিনজন নির্বাহী কর্মকর্তাই নারী। এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

নাহিদা বারিক: বিষয়টিকে আমি উপজেলার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। কারণ একজন পুরুষ যখন কাজ করে তা শুধু কাজ হিসেবেই করে। কিন্তু একজন নারী যখন কোনো কাজ করে তা আবেগ এবং ভালোবাসা দিয়ে যত্নের সাথে করে। আর এ বিষয়টি নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেও দেখছি।

বাংলাদেশে জার্নাল: কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু কর্মপরিবেশ কতটা নারীবান্ধব?

নাহিদা বারিক: বর্তমানে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কর্মপরিবেশ অনেকাংশেই নারীবান্ধব বলে আমি মনে করি। কারণ, বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই যেখানে সরকারি চাকরিজীবী, সেখানে তাদের কাছাকাছি পোস্টিং দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ৬ মাসের মাতৃকালিন ছুটির ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে বর্তমান সরকার কর্মস্থলগুলোতে ব্রেস্টফিডিং কর্নার এবং ডে কেয়ারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে। যা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা হচ্ছে। আশা করি খুব শিগগির কর্মপরিবেশ শতভাগ নারীবান্ধব হিসেবে বাস্তবায়িত হবে। তবে কর্মপরিবেশ যেমনই হোক না কেন, আমাদের সমাজ এখনো কোনো নারীকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে মেনে নিতে অভ্যস্ত নয়।

বাংলাদেশ জার্নাল: একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে নারী নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

নাহিদা বারিক: এটা খুবই দুঃখজনক যে এ সময়ে এসেও নারী নির্যাতন বাড়ছে। আমরা দেখছি যে যৌন হয়রানির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ ঘটনা দেখা যায়। এ ঘটনায় নির্যাতিত এবং নির্যাতনকারী উভয়ের পরিবারও অনেকাংশে ভূমিকা পালন করে। কেননা, আমারও দায়িত্ব আমার সন্তান কিভাবে মানুষ হচ্ছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। শুধুমাত্র সমাজের দোষ দিয়েই একটি সন্তান একদিনে মাদকাসক্ত বা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পরছে না। একটি পরিবার থেকেই প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষাদান আবশ্যক। বিচ্ছিন্ন যে ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে আমি বলবো, পরিবার এবং সমাজের উভয়েরই প্রয়োজন নিজেদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং পরিবার থেকেই সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশ জার্নাল: আমাদের সমাজে গৃহিণীদের ভূমিকা নিয়ে আপনার অভিমত কী?

নাহিদা বারিক: আমাদের সমাজে গৃহিণীদের ভূমিকা অসামান্য। আমরা যারা বাইরে কাজ করি, তারা পরিবারের পাশাপাশি নিজেদের জন্যও কাজ করি। আমরা বাইরে কাজ করার জন্য পারিশ্রমিক পাই। তবে গৃহিণীরা তাদের সম্পূর্ণ সময় পরিবারকে দিলেও অর্থদণ্ডে তাদের শ্রমের মূল্যায়ন করা হয় না। যেমন আমার মা তার পাঁচ সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে কখনো নিজের জন্য কিছু করতে পারেনি। আমরা পাঁচ ভাই-বোন আজ শুধুমাত্র তার জন্যই নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হয়েছি। এদিকে আমি যখন এই করোনাকালেও বাইরে গিয়ে কাজ করেছি, আমার গৃহিণী মা পুরো পরিবারটাকে আগলে রেখেছিলেন। এই সময়ে কার কি প্রয়োজন, নিরাপত্তার জন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, তা সবটাই তিনি একা সামলেছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: নারী উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকা কতটুকু?

নাহিদা বারিক: নারী উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমার সরকারি কর্মকর্তা বাবা পরিবারে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ না করে আমার গৃহিণী মাকে পরিবারে সহায়তা করেছে এবং সম্মান করেছে। যে পুরুষটির সঙ্গে আমি সংসার করছি, সে একজন ব্যস্ত ব্যবসায়ী হয়েও সব সময় আমার অনুভূতির সম্মান করেছে। সে আমার প্রত্যেকটি পদক্ষেপে পাশে থেকেছে। ফলে আমি বলবো, পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা ছাড়া নারী উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর আমার স্বামীর কথাই যদি বলি, আমার পড়াশোনা থেকে শুরু করে এখন আমার দায়িত্ব পালনেও সে আমায় সহায়তা করছে।

বাংলাদেশে জার্নাল: আপনার উপজেলায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।

নাহিদা বারিক: সদর উপজেলায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক বেশ কিছু প্রকল্প এ বছর হাতে নিয়েছি। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা আরো একটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। তা হলো, সদর উপজেলায় ৯টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। সে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মায়ের ডাক নামে একটি করে ভ্যান দিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কোনো সময় গর্ভবতী মায়ের প্রয়োজনে ভ্যানটি তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। আমরা একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়ন করেছি। আমরা জয়যাত্রা নামেও একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আমাদের উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা কারুকার্য নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। সেখানে নারীদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। তা বিগত তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে আমরা জয়যাত্রা নামে পুনরায় সে প্রকল্পের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: সমাজে যেসব নারীরা এখনো সমাজে এগিয়ে আসতে ভয় পায়, তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কি কোনো বার্তা দিতে চান?

নাহিদা বারিক: আমি বলতে চাই, আপনি আপনাকে তুলে ধরুন। নারীর প্রশ্ন আসলেই আমরা দেখি সবার আগে সৌন্দর্যের প্রশ্ন আসে। তবে সে সৌন্দর্য বাহ্যিক নয়, কাজে থাকতে হবে। আপনাকে কাজের মধ্যে নিজের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আপনি নারীর আগে একজন মানুষ। আমার নিজেরও একটি কন্যা রুশদা নুবহা ভাষা। তাকে আমি মানুষ হিসেবে বড় করতে চাই। তাকে বলবো, নারী নয়, মানুষ হও। আমি গর্বিত, কারণ আমি এক কন্যা সন্তানের মা।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত