ঢাকা, সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ২৯ চৈত্র ১৪২৭ আপডেট : ৪৫ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২১, ১০:২০

প্রিন্ট

তারা বাংলাদেশটাকে তছনছ করে ফেলেছে

তারা বাংলাদেশটাকে তছনছ করে ফেলেছে
বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল

জার্নাল ডেস্ক

১৯৬৭ সালে সেনাবাহিনীতে চাকরি নিয়েছিলেন মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। ভোলার এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই অনেক সাহসী ছিলেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মোস্তফা কামাল চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, তখন তাদের অবস্থান ছিলো ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। যুদ্ধ শুরুর পরপরই পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অবস্থা নেন এই রেজিমেন্টের সৈনিকরা। ১৬ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদাররা চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিশ্চিহ্ন করতে এগিয়ে আসে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। তখন আখাউড়ার দরুইন গ্রামে অবস্থান নেন মোস্তফা কামাল।

১৮ এপ্রিল

যুদ্ধের এক পর্যায়ে নৌ এবং আকাশপথেও হামলা শুরু করে পাকিস্তানিরা। অবস্থা বেগতিক দেখে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয় মুক্তিসেনারা। কিন্তু নিজের পরিখা থেকে সরতে রাজি হননি কামাল। এলএমজি নিয়ে শত্রু বাহিনীর উপরে গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখেন ৷ ১৮ এপ্রিল শত্রু সেনার তুমুল আক্রমণে একসময় প্রাণ হারান তিনি। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে রুখতে পেরেছিলেন এই যোদ্ধা।

প্রত্যক্ষদর্শী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মুখলেছুরের বয়ান

এই বীর সেনার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তার কাছে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মো. মুখলেছুর রহমান। সতীর্থরা সরে যাচ্ছে, তাই কামালকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কামাল রাজি হননি। সেদিনের অভিজ্ঞতা ডয়েচে ভেলের কাছে জানিয়েছেন মুখলেছুর।

তিনি বলেন, আমি মোস্তফা কামালের পরিখায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাকে বলি, ভাই চলেন। আমাদের সকলকেই ব্যাক করতে বলেছে। আমরা চলে যাই। তখন কামাল বলেন, না, আমি কাভারিং ফায়ার দেবো। আপনারা চলে যান।

রহমান বলেন, মোস্তফা কামালের পরিখা ছিল পুকুরের এক প্রান্তে। আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাঁতরে পুকুরের অপরপ্রান্তে পৌঁছাতেই দেখি সেলিং-এ তার (কামাল) পরিখা উড়ে গেল।

বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি

সেদিন মোস্তফা কামালের বীরত্বের জন্যই বেঁচে যান অনেক মুক্তিসেনা। যুদ্ধক্ষেত্রে তার এই একক নৈপুণ্য উৎসাহিত করে অন্য সেনাদেরকে। বীরশ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি লাভ করেন কামাল। মুখেলসুর রহমান জানান, অল্প বয়সি কামাল ছিলেন অসীম সাহসী।

মুখলেছুর রহমান এর কথা

মুখলেছুর রহমানের বয়স বর্তমানে ৮৫ বছর। বাস করেন আখাউড়ায়। বর্ষীয়ান এই মুক্তিসেনা জানান, মোস্তফা কামালের মৃত্যুর পর তার মরদেহ খুঁজে পান স্থানীয় মানুষ। কামালকে শুধু গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি পাকিস্তানিরা, বরং নৃশংসভাবে বেয়নেটবিদ্ধও করে তাকে। অকুতোভয় এই যোদ্ধাকে দাফন করা হয় দরুইন গ্রামেই। তবে, তার জানাজা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি তখন।

জার্মানিতে চিকিৎসা

অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মুখলেছুর রহমান নিজেও একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ডিসেম্বরে নোয়াখালিতে যুদ্ধের সময় গলায় গুলি লাগে তার। ডান হাতটাও সে সময় অচল হয়ে যায়। ১৯৭২ সালে তার চিকিৎসায় এগিয়ে আসে তৎকালীন পূর্ব জার্মান সরকার। তাকেসহ কয়েকজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে বিশেষ বিমানে পূর্ব জার্মানিতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ছয়মাস চিকিৎসা করা হয় মুখলেছুর-এর।

হতাশ মুখলেছুর

বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে বেশ হতাশা প্রকাশ করেন মুখলেছুর রহমান। তার মতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের যা প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে এবং ভালোমতো চলতে পারবো। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে রাজাকার আল-বদরে ভরে যায়। তারা বাংলাদেশটাকে তছনছ করে ফেলেছে।

প্রসঙ্গত, দরুইন গ্রামে মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। পুকুরের পাড়ে যে স্থানে তিনি প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেই জায়গায়ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে ভোলায় স্মৃতি জাদুঘর এবং পাঠাগার তৈরি করা হয়েছে। একটি এলাকারও নামকরণ করা হয়েছে ‘কামালনগর’। সূত্র: ডয়েচে ভেলে

বাংলাদেশ জার্নাল/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত