ঢাকা, বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৫ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২১, ১৮:১৬

প্রিন্ট

লিচু বাগানের মধু সংগ্রহে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের

লিচু বাগানের মধু সংগ্রহে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের
ছবি: প্রতিনিধি

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

গাজীপুরের শ্রীপুরে লিচু বাগানগুলো এখন ফুলে ফুলে ভরে গেছে। গাছের নিচে সারি সারি মৌ-বাক্স। এক মৌসুমে লিচুর ফুল থেকে তিনবার মধু সংগ্রহ করে মৌয়ালরা। ইতোমধ্যে দুইবার মধু সংগ্রহ শেষ হয়েছে। লাভজনক এ চাষে মৌয়ালের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাকৃতিক এ মধু সংগ্রহ করে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে চাষিরা।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুয়ীদ উল হাসান বলেন, উপজেলায় ৭২৭ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করা হয়। বেশ কয়েকটি জাতের লিচু চাষ হয় এই উপজেলায়। চলতি বছর লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন।

উপজেলার মুলাইদ গ্রামের মৌ-চাষি মোহাম্মদ আলী বলেন, শ্রীপুরে যে পরিমাণ লিচু বাগান রয়েছে, তাতে বসন্তকালে বাগানে বাক্স স্থাপন করে শত শত টন মধু সংগ্রহ করা সম্ভব। ফুল ফোটার পর ঠাণ্ডা আবহাওয়া ও একদিন বৃষ্টি হওয়ায় এ বছর লিচুর মধু সংগ্রহের পরিমাণ এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর লিচুর ফুল থেকে মধু সংগ্রহ কম হয়েছে। মার্চের প্রথম দিকে একদিন বৃষ্টি হওয়ায় এবার তা কম হয়। গত বছর এ বছরের তুলনায় অনেক বেশি মধু ছিলো। এ বছর তিন ভাগের এক ভাগে চলে এসেছে।

গত বছর ফুল ফুটেছে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে। এবার ফুল ফুটেছে মার্চের প্রথম দিকে। গত বছর বৃষ্টি হয়নি। এবার লিচুর ফুল ফোটা মৌসুমে একদিন বৃষ্টি হওয়ায় মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে মধু কম হয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ আলী।

তিনি বলেন, বসন্তের আবহাওয়া বৃষ্টি ও ঠাণ্ডামুক্ত থাকলে প্রতি ১শ’ বাক্সের বিপরীতে ৮ থেকে সাড়ে ৮শ’ বক্স মধু সংগ্রহ করা যায়। চলতি বছর বসেন্তর কিছু সময় ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করেছে। এর মধ্যে একদিন বৃষ্টিও হয়েছে। ফলে এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় মধুর উৎপাদন কিছুটা কম। টেপিরবাড়ী মৃধা পাড়া এলাকায় তাঁর তত্বাবধানে তিনটি বাগানে তিনশ’ মৌ-বাক্স বসানো হয়েছে। মধু সংগ্রহে বসন্তের এ সময়ে কমপক্ষে শ্রীপুর উপজেলায় ২শ’ প্রশিক্ষিত শ্রমিক দুই মাসের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।

মৌয়ালরা বলেন, দক্ষ প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। চাক থেকে মেশিনে মধু নিষ্কাশন, বাক্স থেকে ফ্রেম ছেঁকে আবার বসাতে হয়। অপ্রশিক্ষিত লোকের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ ও পরিচর্যা করতে গেলে মৌমাছির ক্ষতি হয়। চাকে মধু থেকে যায়, ডিম-লার্ভা নষ্ট হয়ে মারা যায়।

শ্রীপুর উপজেলা মৌ-চাষি সমবায় সমিতির অধীনে ৩৫ জন সদস্য রয়েছেন। চাষের সাথে ২৫ জন সরাসরি জড়িত। কিছু সদস্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বেশিরভাগের প্রশিক্ষণ নেই। দুই বছর যাবৎ কোনো প্রশিক্ষণ হয় না তাদের। প্রশিক্ষিত চাষিরা সহজেই মধু সংগ্রহ ও পরিচর্যা করতে পারেন।

পিরুজালী গ্রামের মৌ-চাষি সজীব বলেন, আগ্রহীদের জন্য প্রশিক্ষণ পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক অবস্থায় ২৫ হাজার টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। মৌ-বাক্স তৈরির জন্য এ টাকা একেবারেই সামান্য। এ টাকায় মাত্র ৫টি বাক্স তৈরি করা যায়। পরে অবশ্য চাষে সফলতার ওপর ভিত্তি করে ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়।

কেওয়া গ্রামের লিচু বাগানের মালিক নূরুল আলম মাস্টার বলেন, গত বেশ কয়েক বছর যাবৎ লিচু গাছে ফুল ফোটার পর কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। কৃষি অফিসের পরামর্শে ফুল বের হওয়ার সময় ও ফুল ঝড়ার পর লিচুর গুঁটি হলে কীটনাশক দেয়া হয়। এতে মৌ-চাষিদের মধু সংগ্রহে সুবিধা হয়।

একই গ্রামের বাগান মালিক ফরিদ হুসেন আকন্দ বলেন, বাগানে মধু চাষিরা মৌমাছির বাক্স স্থাপন করায় পরাগায়ন বেশি হয়। ফলে লিচুর উৎপাদন কমপক্ষে ২৫ ভাগ বেশি হয়।

আগে এলাকার বাগান মালিকেরা ফুল ফোটার পরও কীটনাশক ব্যবহার করতেন। গত প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ কৃষি বিভাগের লোকজন বাগান মালিকদের বোঝানোয় তারা ফুল ফোটার আগে ও ফুল ঝড়ে পড়ার পরে কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে লিচুর উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বেশি হয়। ফুল ফোটার শুরুতেই মৌ-চাষিরা বাগানে মৌ-বাক্স স্থাপন করেন। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করলে বেশি ও যথাযথ পরাগায়ন ঘটে। এতে লিচুর ফলন বেশি হয়। শ্রীপুর উপজেলায় কেওয়া লিচুর বাগানে তিনটি স্থানে বাক্স বসানো হয়েছে। তিনশ’র বেশি বাক্স রয়েছে সর্বমোট।

চাষিরা বলেন, প্রতি বছরই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। কারণ প্রতি বছরই মৌমাছি লালন-পালন, মধু সংগ্রহ ও আবহাওয়ার পরিবেশ নির্ণয় করে বাক্স স্থাপনসহ নানা বিষয়ে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন হচ্ছে। এগুলো জানা এবং শেখার জন্য মৌ-চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অপরিহার্য।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মাহবুব আলম বলেন, মৌ-চাষিদের আমরা বিভিন্নভাবে উৎসাহ দিয়ে থাকি। লিচুর ফুল ফোটার মৌসুমে তারা এসে গাছে গাছে মৌ-বাক্স স্থাপন করে। এক্ষেত্রে কিছু লিচুচাষি অনেক সময় অনাগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, মৌ-বক্স স্থাপন করলে লিচুর উৎপাদন ক্ষতি হবে। কিন্তু আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করি যে, মৌ-বক্স স্থাপন করলে লিচুর উৎপাদনেতো ক্ষতি হবেই না, বরং উৎপাদন বেড়ে যাবে। এছাড়া পরাগায়ন হতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি মধুর বাড়তি উৎপাদন হবে। তাই এখন বাগান মালিকেরাও মৌ-বক্স স্থাপনে সহযোগিতা করে আসছে।

গাজীপুরের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের উপব্যবস্থাপক মো. নজরুল ইসলাম জানান, করোনা মহামারীর আগ মুহূর্তে মৌচাষে জড়িত ৯০ জন চাষিকে ৬টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয়নি। তারপরও ইতোমধ্যে দুটি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও একটি প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত