ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২১, ১৬:৩০

প্রিন্ট

ক্ষেতে পানি রাখার পরামর্শ

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই ধানে চিটা

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই ধানে চিটা
গরম বাতাসে চিটা হয়ে যাওয়া ধান। ছবি- প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

গোপালগঞ্জ, নাটোর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে গরম বাতাসে ধান চিটা হয়ে গেছে। হঠাৎ এই দুর্যোগে পড়ে এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন কৃষকরা। কিভাবে বাঁচবেন ও ঋণ পরিশোধ করবেন সেই চিন্তায় দিশেহারা তারা। তবে হিট শকে আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিন্তিত না হয়ে ধান ক্ষেতে পানি রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

গবেষকরা বলছেন, লোকবল সঙ্কট থাকায় শতভাগ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে ধানে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরাগায়নের সময় ঝড়ো বাতাস ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পরাগায়ন ব্যাহত হতে পারে বলেও মনে করছেন গবেষকরা।

এ সকল বিষয় নিয়ে গোপালগঞ্জ, নাটোর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ থেকে বাংলাদেশ জার্নালের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য দিয়ে রিপোর্ট করেছেন কিরণ শেখ।

গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় গরম বাতাস বয়ে যায়। এই গরম বাতাসে ক্ষেতে উঠতি বোরো ধানের শীষে মাত্র ‘দুধ এর মতো পানি’ এসেছে, সেই ধান সব চিটায় পরিণত হয়ে সাদা রঙ ধারণ করেছে। ধানের শীষে হাত দিলে ভেতরে চালের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

এর মধ্যে গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার পর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া এবং কাশিয়ানীসহ ১০টি ইউনিয়নে গরম বাতাস বয়ে যায়। এই গরম বাতাসে ক্ষেতে উঠতি বোরো ধানের শিষে হাত দিলে এতে কোনো ধানের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু চিটা আর চিটা। এতে জেলার শত শত কৃষক কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এ ঘটনার পরপরই কৃষি বিভাগ ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠে নেমেছে।

গোপালগঞ্জ জেলা

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া এবং কাশিয়ানী উপজেলাসহ ১০টি ইউনিয়নে গরম বাতাসে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত পরিদর্শন করেছে জেলার ভাঙ্গা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের একটি দল।

গত মঙ্গলবার ও বুধবার পরিদর্শন শেষে তারা বলেছেন, ‘লু হাওয়া’র কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। আর লু হাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে প্রয়োজনীয় পানি দিলে এবং পটাশ (প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ১০ লিটার পানিতে সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম পটাশ মিশিয়ে) স্প্রে করলে নতুনভাবে ফলন হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চললে এ অপূরণীয় ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।

গোপালগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শনে ভাঙ্গা ধান গবেষণা ইন্সিটিউটের গবেষকদল

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ কুমার রায় বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ভাঙ্গা ধান গবেষণা ইন্সিটিউটের গবেষকদের একটি দল টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করেছেন। তারা কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে এখন পর্যলন্ত ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায়নি বলেও জানান অরবিন্দ কুমার রায়। তিনি বলেন, দ্রুত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হবে।

গত রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে জেলার ৪টি উপজেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে গরম হাওয়া বয়ে যায়। আধঘণ্টা ধরে চলা এ গরম হাওয়ায় কোটালীপাড়ার কান্দি, পিঞ্জুরী, হিরণ ও আমতলী ইউনিয়ন, টুঙ্গিপাড়ার গোপালপুর, ডুমুরিয়া, পাটগাতি ও বর্নি ইউনিয়ন, কাশিয়ানীর রাতইল ইউনিয়ন, সদর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের শত শত হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ধানের এমন ক্ষতি হওয়ায় কৃষকরা শুধু কাদঁছেন। কী করে ধার-দেনার টাকা শোধ করবেন। সন্তানদের নিয়ে সারা বছর কী খাবেন।

সুনামগঞ্জ জেলা

এদিকে গত কয়েকদিনে হঠাৎ করে শুরু হওয়া গরম দমকা বাতাসে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হাওরগুলোর বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত রোববার বিকেল থেকে তিন থেকে চার ঘণ্টা স্থায়ী বাতাসে হাওরের স্থানীয় কৃষকদের মাঝে শুরু হয় এক ধরণের আতঙ্ক। বোরো ফসল নিয়ে বেড়ে যায় দুঃশ্চিন্তাও। ধানের শীষ বাতাসে নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন।

হাওরগুলোতে বেড়েছে শীষ কাটা লেদা পোকার উপদ্রব। এ পোকার আক্রমণে বোরো ধানের শীষ শুকাতে শুরু করে। ক্ষেতের পর ক্ষেত এই পোকার আক্রমণের শিকার। ফলে কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলেছে, শাল্লার হাওরে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।

সুনামগঞ্জের শাল্লায় হাওরগুলোর বোরো ফসলে ব্যাপক ক্ষতি

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শাল্লা উপজেলায় ২১ হাজার ৯৩৫ হেক্টর জমিতে এবার বোরো ধান চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বেশি হাইব্রিড জাতের ধান। গত কয়েকদিন আগে হাওরে ১০ হেক্টর জায়গা দিয়ে হঠাৎ দমকা বাতাস বয়ে যায়। এই গরম বাতাসে হাওরে পয়েন্ট ৩ হেক্টর জায়গা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া শীষ কাটা লেদা পোকার আক্রমণে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে যাতে পোকার আক্রমণ দমন করা যায়।

হাওরের কৃষকরা জানান, কিছুদিন আগে বোরো ধান শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই এখন বোরো ধানে বেড়েছে নানা সমস্যা। কয়েকদিন ধরে শুরু হওয়া দমকা গরম বাতাসে শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের একটি অংশ ঘাতুয়া হাওরের ধানে বেশ ক্ষতি হয়। এই হাওরে পোকার উপদ্রবেও বেশ ক্ষতি হয়েছে।

এছাড়া বাহাড়া ইউনিয়নের খলার হাওর, ভেড়াডহর ছাগল নাইয়া, হবিবপুর ইউনিয়নের ভান্ডারবিল, উদগল হাওরেও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। পুরো হাওরে শীষ কাটা লেদা পোকায় ৫০ হেক্টর জমি জমি আক্রান্ত হয়েছে।

প্রথমে শিলাবৃষ্টি এরপর দমকা গরম বাতাসে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের বোরো

এ বিষয়ে কৃষক শান্ত কুমার দাস বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, বেশি ফলনের আশায় হাইব্রিড জাতের ধান রোপণ করেছিলাম হাওরে। গত রোববার বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শুধু গরম বাতাস ছিল। সকালে রোদ ওঠার পর হাওরে গিয়ে দেখি শীষ আসা বোরো ধান মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। ঋণ করে ফসল করেছি। এখন কী করে ঋণ শোধ করবো। আমারা সংসার চালাবো কী করে। আর আমরা কী বা খেয়ে বাঁচবো?

শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম মবিউজ্জামান চৌধুরী বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, গরম বাতাসে হাওরের মুটামুটি ক্ষতি হয়েছে। আমাদের মাঠকর্মীরা কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তবে লোকবল সঙ্কট থাকায় শতভাগ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

‘পোকার আক্রমণ থেকে বোরো ধান রক্ষায় আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তারা যাতে বিকালে সোনালী মিস নামের কীটনাশক ১০ লিটার পানির সঙ্গে ১০ মিলি. মিশিয়ে অথবা মার্শাল নাইট্রো ১০ লিটার পানির সঙ্গে ২০ মিলি. মিশিয়ে ছিটিয়ে দেয়। কিন্তু লোকবল সঙ্কট থাকায় পরামর্শ প্রদানে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, শাল্লার হাওরগুলোর মধ্যে ১০ হেক্টর জায়গার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যায়। বাতাসে পয়েন্ট ৩ হেক্টর জায়গা ক্ষতি হয়েছে। তারপরও আমরা জমিতে কীটনাশক দেয়ার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি।

ময়মনসিংহ জেলা

এদিকে গরম বাতাসে ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলার সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান চিটা হয়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে শাকসবজিও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলায় এবার ২ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। গত ৪ এপ্রিল হিট শকে ত্রিশাল ও গফরগাঁয়ের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর মধ্যে ত্রিশাল উপজেলায় ২ হাজার ২৮৬ হেক্টর জমির বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গফরগাঁও উপজেলায় ৫৫০ হেক্টর, নান্দাইলে ২৫০ হেক্টর, ঈশ্বরগঞ্জে ২৫০ হেক্টর, ফুলবাড়িয়ায় ২২০ হেক্টর, গৌরীপুরে ১৬০ হেক্টর, ভালুকায় ১৫০ হেক্টর, মুক্তাগাছায় ১০৫ হেক্টর, ফুলপুরে ১০০৯ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৯৫ হেক্টর, হালুয়াঘাটে ৪০ হেক্টর, তারাকান্দায় ৩০ হেক্টর ও ধোবাউড়া উপজেলায় ১৫ হেক্টর বোরো ফসলের ধান চিটা হয়ে গেছে।

ময়মনসিংহে চার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান চিটা হয়ে গেছে

সদর উপজেলার কৃষক বাতেন মিয়া ও আবু ইউসুফ জানান, কালবৈশাখী ঝড় বা শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয় জানি। কিন্তু গরম বাতাসে ধানের এমন ক্ষতি কখনো দেখিনি ও শুনিনি। সকালে ক্ষেতে গিয়ে দেখি থোড় শুকিয়ে ধান চিটা হয়ে আছে।

ত্রিশাল উপজেলার কৃষক ফজলু মিয়া ও আব্দুল হাই জানান, গরম বাতাসে তাদের ১২ কাঠা জমির বোরো ধান পুড়ে গেছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশে এখন মাঠে পানি দিচ্ছেন তিনি।

গরম বাতাসে ধান নষ্ট হওয়ায় ময়মনসিংহে থামছে না কৃষকের হাহাকার। যে ফসলের মাঠে এতোদিন ছিলো সোনালী স্বপ্ন, আজ সেখানে রোদে পোড়া বিমূর্ত আর্তনাদ। যতোই বয়ে যাচ্ছে সময়, ততোই বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ। অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই কৃষকদের। এ যেন প্রকৃতির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ। কেননা এর কোনো সমাধানও খুঁজে পাচ্ছে না কৃষি বিভাগ।

গরম বাতাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাইব্রিড জাতের বোরো

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ সোনালী ধানের শীষ সাদা হয়ে গেছে। কৃষকরা ধানের শীষ হাতে নিয়ে অসহায়ের মতো আহাজারি করেছেন। সদর উপজেলার চর দূর্গাপুর, চর ভবানীপুর, কোনাপাড়া, আনন্দীপুর, সিরতাসহ বিভিন্ন গ্রামের ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়াও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের চর গোবিন্দপুরে কয়েকশ’ হেক্টর ধান নষ্ট হয়েছে।

ঈশ্বরগঞ্জের মগটুলা ইউপির দুবলী গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের দরিদ্র কৃষক রহিম আলী বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ‘অনেক ঋণ-ধার কইরা ২৫ কাঠা জমিতে ধান চাষ করছিলাম। গরম বাতাসে আমার কপাল পুইরা গেলো। সব ধান নষ্ট হয়া গেলো। এই ঋণ আমি কেমনে শোধ করবাম?’

একই বিষয়ে সদরের চর ভবানীপুর গ্রামের কৃষক মফিজ উদ্দিন বলেন, ৫০ শতাংশ জমিতে আমি হাইব্রিড ধান চাষ করেছিলাম। গত রোববার সন্ধ্যায় গরম বাতাসে সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। জমি থেকে মনে হয় কোনো ধান পাবো না।

গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, রোববার বিকালে থেকে শুরু হওয়া কালবৈশাখীর গরম বাতাসে জমির ধান পুড়ে সাদা হয়ে গেছে। এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে মরণ ছাড়া উপাই নাই।

মুক্তাগাছার তারাটি অজ পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুছ সাত্তার বলেন, আমার ৬৩ কাঠা জমিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

মাঠের পর মাঠ সোনালী ধানের শীষ এখন ফ্যাঁকাসে

একই গ্রামের কৃষক শুকুর আলী, ফারুক হোসেন ও সাইফুল ইসলাম জানান, এতো খরচ করে বোরো ধান চাষ করার পর মনে আশা ছিলো গোলায় ধান তুলবো। কিন্তু আমাদের আশায় গুড়েবালি।

গৌরীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফুর নাহার লিপি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাসহ ২০ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিলো। গত বছরের তুলনায় বেশি জমিতে বোরো ধান চাষ হয় এবার। ক্ষতির বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

মুক্তাগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, গত রোববার বিকেলে কালবৈশাখীর হিট শকে (গরম হাওয়া) বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট দিয়েছি। বিশেষ করে হাইব্রিড চাষাবাদে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মতিউজ্জামান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ক্ষতির কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ দল মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করবেন। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গরম বাতাসে ধানের রেণুগুলো ঝড়ে পড়েছে। ফ্যাঁকাসে রঙ ধারণ করেছে। দ্রুতই ক্ষতির পরিমাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষকের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

নাটোর জেলা

নাটোরে কালবৈশাখী ঝড়ের পর ২৫০ কৃষকের ৪০০ বিঘা জমির ধান চিটা হয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে ধান ক্ষেত পরিদর্শন করে নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পণ্ডিত গ্রামের ২৫০ কৃষকের ৪০০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হওয়ার ঘটনা সত্য।

এ বিষয়ে কৃষক আব্দুস সাত্তারের বাংলাদেম জার্নালকে বলেন, তিন বিঘা জমিতে ধানের চাষ করেছি। ধানের অবস্থা দেখে খুব খুশি ছিলাম। হঠাৎ করে শীষ বেড় হওয়ার সময় সাদা হয়ে চিটা হয়ে গেছে জমির অর্ধেকের বেশি ধান। কেনো এমন হলো তা নিয়ে চরম চিন্তায় আছি। তবে পানি সঙ্কটের কারণে এমন হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

নাটোরের পণ্ডিত গ্রামের ২৫০ কৃষকের ৪০০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছে

ছাতনি ইউনিয়নের কানুসগাড়ি বিলের ধান চাষী আব্দুর রহিম বলেন, ৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। কিন্তু শীষ মরে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় আছি। কি করলে এর প্রতিকার হবে তা আমাদের জানা নেই।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার সরকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, এভাবে শীষ মরে ধান চিটায় পরিণত হওয়ার ঘটনা আগে কখনো নাটোরে দেখা যায়নি। তবে গেল কয়েকদিন আগে ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধির কারণে ধানে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরাগায়নের সময় ঝড়ো বাতাস ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পরাগায়ন ব্যাহত হতে পারে।

তিনি বলেন, আমরা মাঠ ঘুরে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য জমিতে পানি ধরে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা ধান গবেষণার সাথে যোগাযোগ করে নমুনা সরবরাহ করেছি।

এদিকে নেত্রকোণার হাওরের কৃষকরা যখন আগাম ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক সেই সময় গত রোববার রাতে কয়েক মিনিটের গরম বাতাস নষ্ট করে দেয় দাড়িয়ে থাকা ধানের শীষ।

নেত্রকোণা জেলা

এ বিষয় নিয়ে নেত্রকোণার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক আবুল মিয়া ও মজিবুরসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ জার্নালের। তারা বিলাপের সুরে বলেন, গত রোববার সন্ধ্যায় গরম বাতাসে আমাদের বছরের একমাত্র সোনার ফসল বোরো ধান সব সাদা হয়ে গেছে। এখন আমরা আমাদের সংসার কিভাবে চলবো?

একই উপজেলার মাগান ইউনিয়নের ঘাটুয়া গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, হাওরে ধান কাটার মতো অবস্থা নেই। সব জমি সাদা হয়ে গেছে। এখন ভেবে পাচ্ছি না সংসারের সারা বছরের খোরাক কিভাবে চলবে। বছরে একটিমাত্র ফসলের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের এখানের কৃষকেরা খোরাকী হিসেবে ধান মজুদ করে। কৃষকদের ফসল উৎপাদনে যে খরচ হয়েছে তা তো উঠবেই না, বরং যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তা কেটে আনতে কামলার (শ্রমিক) মূল্যও পরিশোধ করা যাবে না।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রণোদনার আশ্বাস

গতকাল বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম মদন উপজেলার উচিতপুর হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত বোরোর জমি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছে সরকার। যেসব কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা পেয়ে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। কৃষকদের পুনর্বাসন ও সহযোগীর জন্য সরকার সব ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে।

নেত্রকোণা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, এবার নেত্রকোণা জেলায় এক লক্ষ ৮৪ হাজার ৯৮৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আক্রান্ত জমির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৯৮০ হেক্টর। হিট শকে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি ৪০ হাজারেরও বেশি পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। যে সমস্ত জমিতে শীষের ভেতর দুধের মতো তৈরি হয়েছিলো, হিট শকের কারণে দুধের মতো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধানের উপরিভাগ সাদা হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেএস/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত