ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে

নিষিদ্ধ অনিশ্চিতায় ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমস

  কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২১, ১২:৩৮

নিষিদ্ধ অনিশ্চিতায় ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমস
ছবি: সংগৃহীত
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ বাউল আব্দুল করিমের সেই গানের সবগুলো কথার সাথে কেমন যেন অলৌকিক ভাবেই মিলে যাচ্ছে বর্তমান সময়ের কাজকর্ম। যান্ত্রিক এই বিশ্বে প্রকৃতিকে ছেড়ে আমরা যেন সকলেই যন্ত্রের সাথেই বন্ধুত্ব পেতে বসেছি। আর এই মোবাইল নামক যন্ত্রটির সাথে যোগ হয়েছে ইন্টারনেট। মোবাইল এবং ইন্টারনেট মানুষের যেমন প্রয়োজন মিটাচ্ছে বিপরীতার্থে তেমনি অনেক ভয়ানক খারাপ দিকও রয়েছে।

আগের দিনে গ্রাম কিংবা শহর প্রত্যেকটি অঞ্চলেই শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মাঠে বিভিন্ন খেলাধুলায়। বিকাল বেলায় পরিশ্রান্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাঠ থেকে বাড়ি ফেরা হয়েছে। প্রতিটি কিশোরের মাঠে গোল্লাছুট, কানামাছি, ফুটবল অথবা ক্রিকেটসহ নানান ধরনের খেলাধুলো করে ধুলোমাখা ও ঘামে ভেজানো শরীর দেখা গেছে। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোররা এ ধরনের খেলা কিভাবে খেলতে হয় সেটা তো দূরের কথা এসব খেলার নামই জানে না।

শিশু-কিশোর আর তরুণদের মাঠে গিয়ে আর দেখা যায় না সেই ধুলো ও কাদামাখা ঘামে ভেজা শরীর। বিকালে মাঠে আর দেখা যায় না শৈশবের সেই হৈচৈ ও খেলাধুলা। বাতাসে ভেসে আসা ঘামের সেই ঘ্রাণ ও চিরাচরিত সেই দৃশ্যটি আজকাল আর চোখে পড়ে না। এখন দেশের প্রত্যেকটি শিশু-কিশোর মোবাইল ফোন কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের মতন যন্ত্রের সাথে সন্ধি করে জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হারাচ্ছে তাদের মেধা শক্তি, চিন্তা-চেতনা এবং নিভে যাচ্ছে শিক্ষার আলো। এই ভয়ঙ্কর ক্ষতির প্রভাব পড়েছে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরও।

এখন কালিয়াকৈরে দেখা যায়, ফ্রি ফায়ার আর পাবজি গেমের আসর। আর এই ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে কোমলমতি শিশু কিশোররা। ভিডিও গেমসে আসক্তদের অধিকাংশের বয়স ১০-২০ এর মধ্যে। আর এই বয়সের ছেলে মেয়েদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে নামি দামি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই খেলার টাকা না পেয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে কিছু দরিদ্র পরিবার, শেষ সম্বল গরু বিক্রি করেও কিনে দিতে হয়েছে অ্যান্ড্রয়েড ফোন এবং বাধ্য হয়ে দিতে হয়েছে ফ্রি ফায়ার গেমস খেলার জন্য টাকা।

এতে যেমন তাদের লেখা পড়া নষ্ট হচ্ছে তেমনি নষ্ট হচ্ছে তাদের নৈতিকতা ও চরিত্র। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে এই চিত্র যেনো হয়ে উঠছে আরো ভয়ঙ্কর। এসব ভিডিও গেমস ইন্টারনেট দিয়ে খেলতে হয় তাই এই গেমস খেলা অনেক ব্যয়বহুল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে ফ্রি ফায়ার গেম খেলতে কিনতে হয় ভার্চুয়ালি অস্ত্র আর সেই অস্ত্র কিনতে গিয়ে দুই’শ টাকা থেকে শুরু করে চার হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। ইন্টারনেটের টাকা যোগান দেয়ার জন্য অনেক শিশু কিশোরই জড়িয়ে পড়ছে অনেক ধরনের অপরাধমূলক কাজের সাথে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ছোট ছোট কিশোর গ্যাং। ফ্রি ফায়ার আর পাবজি গেমসের আড়ালে আটকা পড়েছে তাদের বর্ণিল শৈশব।

অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতা এবং মাঠে গিয়ে খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় অনেক শিশু কিশোররাই খেলাধুলার আনন্দ খুঁজে ফিরছে মাউসের বাটন টিপে কম্পিউটারের পর্দায় ভিডিও গেমস খেলে কিংবা মোবাইল ফোনের স্কিনে।অনেক সময় তাদের এই আকর্ষণ চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে। সমাজের শিক্ষিত লোকেরা মনে করেন,ড্রাগস এর থেকেও বাজে অ্যাডিকশন হতে পারে ভিডিও গেমসের আসক্তি। কালিয়াকৈর পৌর এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ও খেলার মত কোথাও কোন স্টেডিয়াম বা মাঠও চোখে পড়ে না।

গেমস দুটি বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে কিন্তু তার পরেও এ নিয়ে রয়েছে নানা মতামত সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর ভিন্নধর্মী বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে না এই ক্ষতিকর গেমসটি বন্ধ হবে কি হবে না। তাই সচেতন মহলের দাবি এ ধরনের গেমস বন্ধ করা না গেলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করলে সমাজ উপকৃত হবে। এখনি সময় শিশু কিশোরদের ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে ফেরানোর। তা না হলে সমাজ ও তাদের পরিবার পড়তে পারে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে।

নয়ন নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, বর্তমান সময়ে আমার সন্তানকে পড়তে বসতে বললে সে বিরক্তি বোধ করে। তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে গেলেও অশোভনীয় আচরণ করে এবং সবসময়ই ফ্রি ফায়ার গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি যে বিষয়টি খেয়াল করছি এই গেমসের আসক্তি মাদকাসক্ত থেকেও অধিক শক্তিশালী। আর এরকম অবস্থা হয়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে আগে স্কুলে যেত এবং বাসায় পড়তো তখন মোবাইল দেখার এত সুযোগ ছিল না।

এখন অনলাইন ক্লাস এর নাম করে আমার সন্তানের মত সকল শিশু-কিশোর এসব ইন্টারনেটভিত্তিক গেমসে জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকায় দেখা গেছে এই গেমস বন্ধ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। দেখা যাক কতটুকু কার্যকর হয়। এই খবরের অনুযায়ী গেমস বন্ধ হলে হলে ভালো হবে। এ থেকে উত্তরণের জন্য অতিসত্বর এই ধরনের ইন্টারনেটভিত্তিক সকল গেমস বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিকট আবেদন জানাচ্ছি।

গোলাম নবী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবন এভাবে নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। গেমসগুলো বন্ধ না করতে পারলে স্কুল খুলে দেয়ার আবেদন করছি। তা না হলে এ দেশের ছাত্র সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। গেমস বন্ধ না করা গেলে এই গেমসের বিকল্প কোনো কিছু করার পরামর্শও দেন তিনি।

কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়র মজিবুর রহমান বলেন, এসব ক্ষতিকর গেমস থেকে বাচ্চাদের ফিরিয়ে আনতে সুযোগ হলে পৌর এলাকায় অবশ্যই আরো মাঠ তৈরি করা হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত