ঢাকা, বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ৯ আষাঢ় ১৪২৮ আপডেট : ৫ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২১, ১৬:৩০

প্রিন্ট

প্রযুক্তির ব্যবহারে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে বেকার যুবকদের

প্রযুক্তির ব্যবহারে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে বেকার যুবকদের
ছবি- প্রতিনিধি

গোফরান পলাশ, পটুয়াখালী প্রতিনিধি

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় করোনা মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও সচল রয়েছে কৃষিকাজ। কৃষকের নিরলস পরিশ্রম, প্রযুক্তির ব্যবহারে চাষাবাদ এবং মাঠ পর্যায়ে সঠিক পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এনেছে কৃষি বিভাগ।

এছাড়া কৃষককে কৃষিকাজে আগ্রহী করে তুলতে সরকারি প্রণোদনা, বিনামূল্যে সার ও বীজ প্রদান, কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ, উঠান বৈঠকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা, ক্ষতিকর পোকা নিধনে কীটনাশকের ব্যবহার, মিষ্টি পানি সংরক্ষণে স্লুইজ গেট নিয়ন্ত্রণ ও পুকুর খনন, উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ বিতরণে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে কৃষিতে এমন সফলতা পেয়েছে কৃষক- এমনটাই দাবি স্থানীয় কৃষি বিভাগের।

দুর্যোগপ্রবন সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে সৃষ্ট অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি অরক্ষিত বেড়িবাঁধের ভেতর প্রবেশ করলেও কৃষিতে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কৃষিসাফল্য। আর এর নেপথ্যে রয়েছে রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা কৃষি পেশায় নিয়োজিত সেই মানুষগুলোর নিরলস পরিশ্রম। কেননা পরিবেশ ও প্রকৃতি অনুকূল হলে এখানকার কৃষকের হাতে সোনা ফলে।

জানা যায়, গত ক’বছরে ধান, গম, ভুট্টা, আখ, আলু, মিষ্টি আলু, ডাল জাতীয় ফসল মুগ, মসুর, খেসারি, ফেলন, সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, মসলা জাতীয় ফসল মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া এবং অন্যান্য ফসল তরমুজ, বাঙ্গি, খিরা, শসা, পেঁপে ও শীতকালীন শাক-সবজি চাষে কৃষকের সফলতা ও স্ববলম্বী হওয়ার গল্প প্রভাব ফেলেছে স্থানীয় বেকার যুবদের মাঝে। এতে অনেক শিক্ষিত তরুণ আগ্রহী হয়ে যুক্ত হচ্ছে কৃষিকাজে।

মান্ধাতার আমলের গরু-মহিষের হালচাষ কমে গিয়ে পেয়ে চাষাবাদে যুক্ত হয়েছে ট্রাক্টর, হারভেস্টারসহ নানা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। এতে পুরাতন কৃষিচিন্তা ঝেড়ে ফেলে কৃষকরা পেয়েছে বৈজ্ঞানিক কৃষি সরঞ্জামাদি; তা ব্যবহারে যথাযথ কারিগরি প্রশিক্ষণ, উচ্চ ফলনশীর জাতের বীজ, সার ও কীটনাশক।

গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠছে কৃষি ফার্ম। বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে কৃষিঋণের সহজলভ্যতা ও কৃষি উদ্যোক্তা ঋণ পেয়ে কৃষিতে আগ্রহ বেড়েছে তরুণ প্রজন্মের। এতে বেকারত্ব কমে গিয়ে বাড়ছে কৃষি উৎপাদন এবং সচল হচ্ছে অর্থনীতির চাকা।

কলাপাড়া কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বোরো হাইব্রিড জাতের ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৭৯০ হেক্টর। উফশি জাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫২৫, আবাদ হয়েছে ২৫৫০ হেক্টর। উফশি জাতের আউশ ধানের আবাদ হয়েছে ৩৩৯০ হেক্টর, স্থানীয় জাতের আবাদ হয়েছে ৪১০ হেক্টর। উফশি জাতের আমন আবাদ হয়েছে ২৫১০০ হেক্টর, স্থানীয় জাতের আবাদ হয়েছে ৯৩৯০ হেক্টর।

এছাড়া গম আবাদের লক্ষ্যমাত্র ছিল ১০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৩০ হেক্টর। ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২৫০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৭৪৭ হেক্টর। আখ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ২৫ হেক্টর। আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ২৭০ হেক্টর। মিষ্টি আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৩৪০ হেক্টর।

ডাল জাতীয় ফসল মুগ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫৫০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৩৩২৫ হেক্টর। মসুর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৩৫ হেক্টর। খেসারি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০০০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৪৪৩৫ হেক্টর। ফেলন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮৫০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৩৩৮২ হেক্টর।

সূত্র আরও জানায়, গত অর্থবছরে তেল জাতীয় ফসল সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হেক্টর, অর্জন হয়েছে ৬০ হেক্টর; তিল লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হেক্টর, অর্জন ১০ হেক্টর; সূর্যমূখী লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ হেক্টর, অর্জন ৫৫০ হেক্টর; চিনাবাদাম লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫০ হেক্টর, অর্জন ৫৬৫ হেক্টর।

মসলা জাতীয় ফসল মরিচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৮০ হেক্টর, অর্জন ৫৭০ হেক্টর, পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হেক্টর, অর্জন ৩০ হেক্টর; রসুনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হেক্টর, অর্জন ৩০ হেক্টর; হলুদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হেক্টর, অর্জন ৪০ হেক্টর; ধনিয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ হেক্টর, অর্জন ৯০ হেক্টর।

অন্যান্য ফসল তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫০০ হেক্টর, অর্জন ৯৫০ হেক্টর; বাঙ্গির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ হেক্টর, অর্জন ১২০ হেক্টর; খিরার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ হেক্টর, অর্জন ১৫০ হেক্টর; শসার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ হেক্টর, অর্জন ১৪০ হেক্টর; পেঁপে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হেক্টর, অর্জন ৪০ হেক্টর। এছাড়া শীতকালীন শাক-সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০০০ হেক্টর, অর্জন হয়েছে ২০৭০ হেক্টর।

উপজেলার ধানখালী গ্রামের কৃষক আউয়াল হাওলাদার বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। গরু-মহিষের হাল চাষের বদলে কৃষিকাজে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাক্টর, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, কম্বাইন হারভেস্টার এবং রাইস এন্ড হুইট রিপার। এতে অল্প সময়ে যান্ত্রিক ব্যবহারে অনেক কাজ করা যাচ্ছে।

কৃষক আউয়াল আরও বলেন, বোরো ধান ঘরে তোলার পর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে সবজি ক্ষেতের একটু ক্ষতি হয়েছে, তবে তা উল্লেখযোগ্য নয়।

চম্পাপুর গ্রামের কৃষক বিজয় সরকার বলেন, কৃষিকাজে এখন গ্রামের মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। আউশ, আমন, বোরো ধানের পাশাপাশি হাইব্রিড-উফশিসহ স্থানীয় জাতের ধান চাষ করছে কৃষক। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক ও মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেয়ে এখন সবাই বেকার না থেকে চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছে। ডাল, তেল ও মসলা জাতীয় ফসলের পাশাপাশি তরমুজ, বাঙ্গি, খিরাই, শসা, পেঁপেসহ শীতকালীন শাক-সবজি চাষে ভাগ্য বদলেছে গ্রামের অনেক মানুষের।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আ. মন্নান বলেন, কৃষিতে সাফল্য অর্জনে কৃষি বিভাগ সর্বদা মাঠ পর্যায়ে কৃষকের পাশে থেকে সঠিক পরামর্শ দিচ্ছে। সঠিকভাবে চাষাবাদ করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দকৃত প্রণোদনার অর্থ, সার, বীজ ও ভর্তুকি যথাসময়ে কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

আ. মন্নান আরও বলেন, সার সুবিধা নিশ্চিতকরণে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে বিসিআইসি’র ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মিষ্টি পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ চলছে। কৃষকের স্বার্থে স্লুইজ গেট ব্যবহার নিশ্চিতে আমরা কাজ করছি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত