ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ২৩ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২১, ১৯:১০

প্রিন্ট

চোরাকারবারিদের দৌরাত্মে সীমান্তে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঝুঁকি

চোরাকারবারিদের দৌরাত্মে সীমান্তে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঝুঁকি
সীমান্ত এলাকা। ফাইল ছবি

এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা ভারতের সীমান্তঘেঁষা। সীমান্ত এলাকাজুড়ে প্রায় শতাধিক ব্যক্তি অপরাধচক্রের সাথে যুক্ত। এরা ভারতীয় অস্ত্র, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ, নাসির বিড়িসহ সকল ধরণের মাদক কারবারির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এ অপরাধচক্রের লেনদেন হয় হুন্ডিতে।

এদের বড় একটি অংশ নিয়মিত ভারতে যাওয়া-আসা করে। অবৈধ পণ্য কিনতে দিনে কিংবা রাতে, বিজিবির অবস্থান চিহ্নত করে সুযোগ বুঝেই কাঁটাতার ডিঙিয়ে পাড়ি দেয় ভারতে। ওই দেশের চোরাকারবারিদের সঙ্গে নিয়ে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে অবৈধ ক্রয় শেষে ফেরে বাংলাদেশে। কখনো আবার ভারতের সক্রিয় অস্ত্র ও মাদক কারবারিদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এ অপরাধচক্র। এমন অবাধ বাংলাদেশ-ভারত আসা-যাওয়াতে করোনার ‘ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট’ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে সারা জেলা।

তাছাড়াও এসব সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতের মাদক কারবারিরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করছে বাংলাদেশে। অনেকেই আবার স্থানীয় কুলাউড়া, রবিরবাজার, জুড়ী ও শমসেরনগরের 'শপিং মহলে' কেনাকাটা শেষে ফেরে ভারতে। এ সবই হয় বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে অতি গোপনে। কিন্তু চাঞ্চল্যের বিষয় হচ্ছে, এদের মাঝে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই।

সম্প্রতি (২১ মে) কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈভাবে ভারতে যাওয়ার সময় দু’জনকে আটক করে বিজিবি। এদের একজন ভারতীয় নাগরিক। পরে কুলাউড়া সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা পরীক্ষা করা হয়। অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার প্রচেষ্টার অভিযোগে আলীনগর বিজিবির এক সদস্য বাদী হয়ে কুলাউড়া থানায় আটক দু’জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে হাজতে পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলার কুলাউড়া উপজেলায় চোরাকারবারিদের আধিক্য বেশি। এ উপজেলার চারটি ইউনিয়নে স্থানীয় ছোট-বড় অপরাধচক্রে নেতৃত্ব দেয় অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত এ অপরাধচক্র। এসব ঘটনায় মামলা হলে অপরাধচক্রের হোতারা পালিয়ে যায় ভারতে। এছাড়াও অবৈধ পণ্য বহনকালে বিজিবি ধাওয়া খেয়ে ভারতে পালায়।

চারটি ইউনিয়নের সুনির্দিষ্ট স্পট দিয়ে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ভারতে যাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে যেমন দেয়া হয়, তেমনি ভারতের একটি চক্র তাদের রিসিভ করে নিয়ে যায়। ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার পরিস্থিতি দেশে স্বাভাবিক হলেই ফের একই কায়দায় দেশে ফেরে তারা। দেশে ফেরার পর হোম কোয়ারেন্টাইন কিংবা করোনা টেস্টের ধারেকাছেও যায় না তারা। এতে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঝুঁকিতে রয়েছে কুলাউড়া উপজেলা।

মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে যেখানে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সেখানে চোরাকারবারিদের অবাধে বিচরণ বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ, বলছেন স্থানীয়রা। অনেকেই বলছেন, সীমান্তের চিহ্নিত চোরাকারবারিদের ও স্থানীয় এলাকাবাসীর করোনা টেস্ট খুবই জরুরি। দরকার হলে লকডাউনের মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারে প্রশাসন। পুলিশ-বিজিরি যৌথ কঠোর নজরদারি করতে পারে সীমান্তে।

এদিকে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ধরনটির নাম দেয়া হয়েছে বি.১.৬১৭। এখন পর্যন্ত ধরনটি ভারতে তিনবার রূপ বদলেছে বলে জানা গেছে। সস্প্রতি যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ এটিকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বা উদ্বেগজনক ধরন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। করোনার ভারতীয় ধরন ঠেকাতে বাংলাদেশ এর আগে দুই সপ্তাহের জন্য সীমান্তে পণ্যবাহী যান ছাড়া সব ধরনের যাতায়াত বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এর মধ্যেও অনুমতি নিয়ে অনেকেই দেশে ফিরেছেন।

ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ভারতে এই ভ্যারিয়েন্ট প্রথমে মহারাষ্ট্রে শনাক্ত হয় গত ৫ অক্টোবর। পরে এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রায় প্রতিদিনেই রেকর্ড ভাঙছে মৃত্যু ও শনাক্তের। দেশটির সরকারি হিসাবে, ভারতে একদিনে মৃত্যু চার হাজার ১৮৭ জনের বেশিও হয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতে বর্তমানে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৩৮ হাজারেরও বেশি।

সূত্র জানায়, কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা, কর্মধা, হাজিপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের স্পর্শকাতর সুনির্দিষ্ট প্রায় অর্ধশত স্পট দিয়ে ভারতে যাওয়া-আসা করে এসব চোরাকারবারিরা। আর এ কাজে নেতৃত্ব দেয় সীমান্তের প্রায় ১০/১৫ জন বড় বড় অবৈধ ব্যবসায়ী। এ চক্র টাকার বিনিময়ে ভারতীয় যে কোনো নাগরিককে বাংলাদেশে, আবার বাংলাদেশের নাগরিককে ভারতে পাঠায় কাঁটাতারের ওপর দিয়ে।

এসব অবৈধ কাজের সাথে সম্পৃক্ত অস্ত্র, মাদক ও নাসির বিড়ি ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয় কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, আলীনগর, গনকিয়া, ধামুলীগ্রাম, কর্মধা ইউনিয়নের মুড়ইছড়া, মুড়ইছড়া নতুন বস্তি (দশটেকি), শরীফপুর ইউনিয়নের ন’মোজা, চাতলাপুরের চৌয়াল্লিশ পাট্টা, খাম্বারঘাট, চানপুর, হরিপুর, বাঘজোড়, লালাচক, শরীফপুর, দত্তগ্রাম, কালালায়ের চক, নিশ্চিতপুর, বুরাইপার এবং হাজিপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর ও মাদানগর গ্রামে। পরে পালাক্রমে শুরু করে তাদের অবৈধ কার্যক্রম। ভারতে যাওয়া-আসা, অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে আনা, মানুষ পাচারসহ বাস্তবায়ন করে তাদের সমস্ত পরিকল্পনা।

চিহ্নিত কয়েকজন চোরাকারবারির লাগাম টানা যাচ্ছে না। দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে নানা অপকর্ম-অপরাধ। এসব অবৈধ কাজে সরাসরি যুক্ত পৃথিমপাশ ইউনিয়নের আমুলি গ্রামের সক্রিয় মাদক ও বিড়ি কারবারি একাধিক মামলার আসামি সুমন (অপরাধচক্রের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী অবৈধ কারবারি), গনকিয়া গ্রামের কালাপীর ওরফে মুসলিম, শিকড়িয়া গ্রামের ছিদ্দেক, মুজিব (সিদ্দেকের মেয়ের জামাই), আরজদ (সিদ্দেকের ছেলে), গনকিয়া গ্রামের সুফান ও সুন্দর।

এছাড়া আছে কর্মধা ইউনিয়নের মুড়ইছড়া নতুন বস্তি (দশটেকি) গ্রামের একাধিক মামলার আসামি মউর মিয়া (সব রকমের অবৈধ কাজের সাথে জড়িত)। শরীফপুর ইউনিয়নের তাপস, শুক্কুর ও আক্তার। হাজিপুর ইউনিয়নের ভূইগাঁও গ্রামের মারজান বক্স, সুলতানপুর গ্রামের জুনাব আহমদ তালুকদার ও আব্দুল মুহিত।

মূলত এসব চিহ্নিত অবৈধ কারবারিদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে ভারতীয় অস্ত্র, মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিল, নাসির বিড়িসহ সকল ধরনের মাদকদ্রব্য। এদের রয়েছে একাধিক প্রাইভেটকার, মোটরবাইক, সিএনজিচালিত অটো, মিনি পিকআপসহ নানা বাহন। আর এসব বাহন ব্যবহার করে অস্ত্র, মাদক ও নাসির বিড়ি কুলাউড়াসহ জেলার নানা স্থানে পৌঁছে দিয়ে চালাচ্ছে রমরমা বাণিজ্য।

এ প্রসঙ্গে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌস আক্তার বলেন, ‘চোরাইপথে ভারতে গিয়ে আবার দেশে ফেরা সাত্যিই আমাদের জন্য ঝুঁকির। আমার উর্ধ্বতন কর্তকর্তাদের এ বিষয়টি অবগত করবো। নির্দেশনা আসলে সে আলোকেই কাজ করবো।’

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, এটা খুবি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি আরও বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিচ্ছি। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

চোরাকারবারিদের ভারতে গোপনে যাওয়া-আসার বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে জেনেছেন জানিয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বলেন, ‘আমাদের বর্ডার বন্ধ রয়েছে। আমরা এ ঝুঁকি এড়াতে পারি না। আমরা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। শিগগিরই প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু হবে। আমাদের প্রশাসন থেকে যা করতে হয়, তাই করা হবে।’

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত