ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ৬ মিনিট আগে

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২১, ২১:৫৮

প্রিন্ট

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে তারা

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে তারা
ছবি- প্রতিনিধি

আবুল হোসেন, গাজীপুর প্রতিনিধি

একসময় নিজের ও পরিবারের দু’মুঠো ভাত যোগাড় করতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চরখামের গ্রামের নিলুফা বেগমেকে (৬০)। বয়সের ভারে অনেক কাজও করতে পারছিলেন না তিনি। তার স্বামীও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, ঘরের বিছানায় শুয়ে থেকে সময় কাটে তার। কোনো কর্ম করে খেতে পারেন না স্বামী মালেক মোল্লা। একমাত্র মেয়েটারও বিয়ে হওয়ার পর অন্যের ঘরে চলে গেছে। চোখে অন্ধাকার, আর পেটে যেন ক্ষুধার যন্ত্রণা তাকে কুড়ে খাচ্ছিল।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এক দোকান ও দোকানের মালামাল পেয়ে এখন তার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। এখন আর তিনি ভিক্ষা করেন না।

মনের অনেক কষ্টের কথা বলতে গিয়ে নিলুফা জানালেন, দুই মুখের অন্নের জন্য মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পাততে হতো তার। ঠিক এমন সময় এ বছরের গোড়ার দিকে কাপাসিয়ার ইউএনও মোসা. ইসমত আরা তাকে ডেকে পাঠালেন। সরকার তাকে দোকান করে দেবে, দোকানের মালপত্র কেনার জন্য মূলধনও দেয়া হবে বলে জানানো হলো।

এ খবর শুনে তার যেন খুশি আর ধরে না। শেষে গত ২৬ মার্চ সেই দোকান ও মালপত্র বুঝিয়ে দিলেন ইউএনও ইসমত আরা। এরপরও ঘুরে গেল নিলুফার ভাগ্যের চাকা।

এখন আর ভিক্ষুক নন, এখন তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এখন আর তাকে খাবারের জন্য, স্বামীর ওষুধের টাকার জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয় না। তিনি মুদির দোকান চালিয়ে এখন দৈনিক ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা আয় করছেন।

একইভাবে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া দোকান ও মূলধন পেয়ে স্বচ্ছন্দের মুখ দেখেছেন কাপাসিয়া উপজেলার কড়িহাতা ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী আবুল হোসেনের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৫)। দোকান পাওয়ায় তার ১০ বছরের ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপের অবসান হয়েছে।

একই উপজেলার পাকিয়াব গ্রামের হতদরিদ্র নাজিম উদ্দিনও পেয়েছেন সরকারি দোকান ও মালপত্র। অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে একসময় তাকে ভিক্ষা করতে হয়েছে। সরকারিভাবে তাকে সহায়তায় করায় এখন তিনি আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন এবং তার মধ্যে নতুনভাবে বাঁচার আশা সঞ্চার হয়েছে। ক্ষুদ্র দোকানের মাধ্যমে তার এখন যে আয় হচ্ছে, তাতেই তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারবেন বলে আশা করছেন।

কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসমত আরা বলেন, তার উপজেলায় সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ৬ জন ভিক্ষুককে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে সরিয়ে এনে স্বাবলম্বী করা হয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও বাজারগুলোতে ক্ষুদ্র দোকান নির্মাণ করে মালামাল কিনে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে যে আয় হবে, তা দিয়ে তারা সংসার খরচ চালাতে পারবেন।

তিনি বলেন, আমরা ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য যে বরাদ্দ পাচ্ছি, তা দিয়ে এ প্রকল্প অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তালিকায় থাকা অনেককেই ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ থেকে বের হয়ে আসার জন্য কাউন্সিলিং করছি।

গাজীপুর সমাজসেবা বিভাগের উপ-পরিচালক এসএম আনোয়ারুল করিম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত দুই বছর আগে ভিক্ষুকমুক্ত গাজীপুর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ জন্য প্রাথমিক অবস্থায় জেলার ৫টি উপজেলায় জরিপ করে ভিক্ষুক বাছাই করা হয়। জরিপে কালিয়াকৈরে ৫৭৮ জন, কালীগঞ্জে ২৩৬ জন, শ্রীপুরে ৪৬৬ জন, কাপাসিয়ায় ৭৮ জন, গাজীপুর সদরে ১৭০ জনসহ মোট ৯৫০ জন ভিক্ষুক বাছাই করা হয়। পরে তাদের এ পেশা থেকে ফিরিয়ে আনতে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে ভিক্ষুক পুনর্বাসন করতে এ যাবৎ মোট ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গাজীপুর সদরে ৮ জন, কাপাসিয়ায় ৬ জন, কালিগঞ্জে ৩ জন, কালিয়াকৈরে ৫ জনকে মুদি দোকান তৈরি করে দেয়া হয়। এছাড়াও এ প্রকল্পের আওতায় শ্রীপুরে ১২ জন ভিক্ষুককে ছাগল পালনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে ছাগল দেয়া হয়েছে।

‘সব মিলিয়ে ২৮ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়াও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনেককেই আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে অভিশপ্ত পেশা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বের করে কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। পরনির্ভরশীলতা দূরীকরণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। তাই ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় নিয়োজিতদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।’

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ও নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সারাদেশের মতো গাজীপুরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতিমধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। অনেকেই এখন সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ভিক্ষা ছেড়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠছে। এটা আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত