ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮ আপডেট : ৬ মিনিট আগে

কুলাউড়ায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারে নিখাদ জীবন

  এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২১, ১৮:৫৭  
আপডেট :
 ১৩ জুলাই ২০২১, ২০:৫২

কুলাউড়ায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারে নিখাদ জীবন
ছবি- প্রতিনিধি
এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

নিজভূমে উদ্বাস্তুর মতো বসবাস করতে হতো। ছিল না জমি, ছিল না ঘর। অন্যের বাড়িতে আশ্রিত থেকে পরিবার নিয়ে জীবন কেটেছে তাদের। রোজগারে পেট চালানোই তাদের জন্য কষ্টকর ছিলো। বাড়ি বানানো, ঘর করার বড় স্বপ্ন তাদের অধরাই ছিলো।

মুজিব শতবর্ষে আশ্রয়নের অধিকার শেখ হাসিনার উপহারসহ ঘর প্রাপ্তিতে স্বপ্ন পূরণ হলো ২১০ অসহায় পরিবারের। গৃহহীনদের জন্য যা ছিলো স্বপ্নের বাড়ি। চারপাশে ইটের দেয়াল এবং ছাদে লাল ও সবুজ টিনের ছাউনি। ভূমিহীনরা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি তারা জীবনের একটা পর্যায়ে এসে এমন একটি নতুন ঘর পাবে। দীর্ঘদিন তারা অন্যের বাড়িতে দুঃখে কষ্টে আশ্রিত ছিলো। এখন তারা প্রত্যেকে উঠেছেন নিজেদের স্বপ্নের নীড়ে। কাটাবে তাদের নিখাদ জীবন।

কুলাউড়ায় প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখে কথা হলো উপকারভোগীদের সাথে। উৎফুল্ল উপকারভোগীরা এই ঘরগুলোকে ‘স্বপ্নের ঘর’ আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, ভিটাবাড়িশূন্য মানুষদের জন্য বিষয়টি স্বপ্নের মতো। তবে কিছু ঘরে বিদ্যুৎ ও পানি না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক উপকারভোগী। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিগগিরই নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।

কুলাউড়ায় ১ম ও ২য় পর্যায়ে মোট ২১০ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৪২টি ঘর উপকারভোগীদের মাঝে হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার তুলনায় কুলাউড়ায় আশ্রয়ন প্রকল্পের নির্মিত ঘরে এখন পর্যন্ত কোনো অনিয়ম বা সমস্যা দেখা যায়নি। সরেজমিন ঘুরে কোথাও ঘরে ফাটল কিংবা মেঝের সিমেন্ট উঠে যাওয়ার মতো ঘটনাও পরিলক্ষিত হয়নি। এমনকি ঘর নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত স্থান নির্ধারণে বেশ রুচির পরিচয় দিয়েছেন কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসন। সড়কের পাশে এসব ঘরে বসবাস করে উপকারভোগীরা উদ্বেলিত ও উচ্ছ্বাসিত।

মঙ্গলবার কর্মধা ইউনিয়নের টাট্টিউলী, জয়চন্ডী ইউনিয়নের উত্তর কুলাউড়া (পুশাইনগর), ভাটেরা ইউনিয়নের কড়ইতলা, ইসলামনগর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঘরগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে সবুজ ও লাল রঙের টিন। সরকারি খাস জমির ওপর তৈরি করা হয়েছে এসব ঘর। আয়তন ৪০০ বর্গফুট। প্রতিটি ঘরে আছে দুইটি কামরা, রান্নাঘর, বারান্দা ও টয়লেট। এছাড়া ১০টি ঘরের জন্য একটি করে গভীর নলকূপ।

সেমিপাকা এই ঘরগুলোর প্রতিটি তৈরি করতে প্রথম পর্যায়ে খরচ হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে খরচ হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রতিটি পরিবারকে দুই শতাংশ জমিসহ এই ঘর দেয়া হয়৷ উপকারভোগী যারা উঠেছেন, তারা তাদের সন্তানাদি নিয়ে আনন্দে কাটাচ্ছেন দিন। কেউ কেউ শোভাবর্ধনের জন্য ঘরের আঙিনায় লাগিয়েছেন ফুল ও ফলের গাছ। ঘর ঘেঁষে তৈরি করছেন আলাদা আরও প্রয়োজনীয় গুদামঘর। সবাই খুব উৎফুল্ল ও আনন্দিত।

কর্মধার টাট্টিউলী এলাকায় নির্মিত ঘরে উপকারভোগী হেলাল মিয়া (৪১), ফখরুল আলম (৩৭), ফয়জুন বেগম (৪৬), আজিরুন বেগম (৪৫) প্রত্যেকেই পরিবারের একাধিক সদস্য নিয়ে বসবাস করছেন। সরজমিন কথা হয় তাদের সাথে। তারা বলেন, জমিসহ ইটের ঘর পাবো, কোনোদিন স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। ঘর পেয়ে আমরা ভীষণ খুশি। আল্লাহ যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভালো করেন।

কুলাউড়া উপজেলার টাট্টিউলি আশ্রয়কেন্দ্রের ভূমিহীন দরিদ্র বিধবা আজিরুন বেগম বলেন, ‘নিজের কোনো জমি ছিল না। অন্যের জায়গায় থাকতাম। এখন নিজের জমি হয়েছে, আবার ইটের ঘর পেয়েছি। সরকারের কাছে আমাদের এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। গরীর মানুষ সারাজীবন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দোয়া করবে।’

জয়চন্ডী ইউনিয়নের উত্তর কুলাউড়া এলাকায় তৈরি প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেয়া ঘরে বাস করছেন বাসিন্দা গৌরি দাস (৪০), সবজান বিবি (৫৫), নির্মল দাস (৬০), নিপালী রাণী দাস (৩২)। তারাও ঘর পেয়ে সন্তুষ্ট। কথা বলার সময় তাদের চোখ দিয়ে আনন্দঅশ্রু ঝরে পড়ছিল।

ভাটেরার কড়ইতলায় নির্মিত উপহারের ঘরে বাস করছেন গোলাপ মিয়া (৭০), জাবেদ মিয়া (৩৮), ফিরুজ মিয়া (৪৫), রীনা বেগম (৫০)। তারা নিজেদের বসবাস উপযোগী করে ঘর গোচ্ছাচ্ছেন। তাদের চোখে মুখে তৃপ্তি ফুটে উঠেছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রশাসনের তালিকাভুক্ত ৪৪০ ভূমিহীন পরিবার রয়েছে। কুলাউড়া উপজেলায় আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০০টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘরের খরচ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রথম পর্যায়ে ১১০ ভূমিহীন পরিবার পেয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর এই উপহার। প্রতিটি ঘরের খরচ ধরা হয়েছিলো ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শিমুল আলী বলেন, প্রথম পর্যায়ের ১১০টি ঘরের নির্মাণকাজ শেষে ইতোমধ্যে উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১০০টি ঘরের মধ্যে ৪২টি ঘরের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। বাকি ঘরের কাজ চলমান রয়েছে।

ঘরগুলোতে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়ে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার জিয়াউর রহমান বলেন, দ্রুত ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে।

পানির বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মোহসিন বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পগুলোতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, ভূমিহনি, গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য দুই শতক জমিসহ ঘর প্রদানে সরকারের এ স্বপ্নযাত্রায় ক্ষুদ্র অংশীদার হতে পেরে আমি গর্বিত। বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা শতভাগ এখনো হয়নি। তা বাস্তবায়নে উভয় বিভাগের সাথে সমন্বয় করে কাজ চলমান আছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত