ঢাকা, সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৫ আশ্বিন ১৪২৮ আপডেট : ১৪ মিনিট আগে

চট্টগ্রামে অনলাইনে বেড়েছে কোরবানির পশু বিক্রি

  মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২১, ১৭:১৪  
আপডেট :
 ১৭ জুলাই ২০২১, ১৮:১২

চট্টগ্রামে অনলাইনে বেড়েছে কোরবানির পশু বিক্রি
মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

ঘনিয়ে আসছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। আজকের দিন ছাড়া আর সময় রয়েছে মাত্র তিনদিন। কিন্তু কোরবানির পশুর হাটগুলোতে নেই তেমন বেচাকেনা। দেখাদেখিতেই সময় পার করছেন ক্রেতারা। তবে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি থাকায় এবার কোরবানির পশু অনলাইনে বেচাকেনা বেড়েছে। হাট থেকে গরু কেনার যে ঐতিহ্য চট্টগ্রামবাসীর, এই করোনাকালে সেই প্রথাগত অভ্যাস অনেকটাই বদলে গেছে।

ক্রেতারা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অনলাইনের দিকে ঝুঁকেছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে অনলাইনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকার গরু।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রথমবারের মতো অনলাইনে গরু বিক্রির কার্যক্রম শুরু করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘অনলাইন হাটে’ এবার মোট ৩৭টি খামারের গরু বিক্রি হচ্ছে। চলতি বছর করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে গরু বিক্রিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের ৩৭টি খামার থেকে অনলাইনে এ পর্যন্ত আপলোড হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার কোরবানি পশু এবং অনলাইনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার গরু। তাছাড়া খামার থেকে সরাসরিও বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোরবানি গরু।

এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার কোরবানির গরু। যার মধ্যে ৫৪০ কোটি টাকার গরু বিক্রি হয়েছে অনলাইনে।

চট্টগ্রামের সারা এগ্রো ফার্মের পরিচালক ইকবাল চৌধুরী বলেন, এ পর্যন্ত আমাদের খামারে প্রায় ৩২০টি গরু বিক্রি হয়েছে। আর অনলাইনে আপলোড করে বিক্রি হয়েছে ১২৫টি। এবারে করোনা পরিস্থিতিতে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। করোনা সংক্রমণ এড়াতে এবারেই প্রথম অনলাইনে গরু বিক্রি করেছি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গতবারের চেয়ে এবার করোনা পরিস্থিতি খারাপ। তাই অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির সম্ভাবনাও বেশি। ১৫ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে পশু বিক্রির দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।

এই বিভাগে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৮১ টি গরু-মহিষ এবং ২৪ হাজার ৫১৩ টি ছাগল-ভেড়া ​অনলাইনে বিক্রি হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে রাজশাহী বিভাগ। তৃতীয় স্থানে ঢাকা বিভাগ। চতুর্থ স্থানে রংপুর বিভাগ। অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রিতে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ।

গত ২ জুলাই থেকে জেলাভিত্তিক অ্যাপ, ফেসবুক পেজ ও বিভিন্ন অনলাইন সাইটের মাধ্যমে পশু বিক্রি শুরুর উদ্যোগ নেয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। আর ৪ জুলাই ‘ডিজিটাল হাট’ নামে আরও একটি প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন করা হয়।

​চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রেয়াজুল হক বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে জনসমাগম এড়াতে অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাকাটার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। মোট পশুর ২৫ শতাংশ ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস থেকে বিক্রির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

অনলাইনে বিক্রির একটা সুবিধাও আছে, সাধারণত এগুলো শহরকেন্দ্রিক বিক্রিটা বেশি হয়। শহরের লোকজন কাছাকাছি এলাকার মধ্যে পছন্দসই গরু ভালো পেয়ে গেলে অনলাইনেই গরুটা কেনেন, তারা হাটে যেয়ে ধকল পোহাতে চান না।

তিনি বলেন, এখন যেহেতু লকডাউন শিথিল হয়ে গেছে মানুষ এখন হাটে গিয়ে কিনতে পারছে। অনলাইনে আমরা আপলোডের বিষয়টিতে গুরুত্ব বেশি দিয়েছিলাম, জনগণের কাছাকাছি কতটুকু পৌঁছাতে পারছি সেটি দেখার জন্য। পরে ক্রেতা-বিক্রেতা নিজেরাই যোগাযোগ করে ক্রয়-বিক্রয় করছেন। আমরা শুধু দুই পক্ষকে যোগাযোগ করানোর কাজটা করেছিলাম।

কোরবানির পশুর হাটের দেশের দ্বিতীয় বড় গরুর বাজার চট্টগ্রামের সাগরিকা। দেশের সীমান্তবর্তী উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে চট্টগ্রামে আসছে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক।

এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর দুটি বড় বাজার সাগরিকা ও বিবির হাট গরুর বাজার ছাড়াও অস্থায়ী বাজারগুলোতে প্রচুর গরু এসেছে। লালমনিরহাট, যশোর, বগুড়া, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মাদারিপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নগর ও বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিদিন আসছে শত শত গরুবোঝাই ট্রাক।

সাগরিকা বাজারের ইজারাদার আবুল কালাম আজাদ বাবুল বলেন, গতকাল কিছুটা বেচাকেনা হয়েছে। বন্ধের দিন থাকায় মানুষের ভিড় বেশি ছিল। সেই তুলনায় বেচাকেনা হয়নি। আশা করছি, আজ-কালের মধ্যে বাজার জমজমাট হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, সময় ঘনিয়ে আসায় কোরবানির পশুর জোগান বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গরু নিয়ে আসছেন বেপারিরা। কয়েকটি বড় গরু এসেছে। কয়েকটি গরুর দাম ১৫-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকাচ্ছেন। ক্রেতারা ৭-৮ লাখ পর্যন্ত দাম তুলেছেন।

বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, চট্টগ্রামে এখনো গরুবাহী ট্রাক ঢুকছে। ব্যবসায়ী ও বেপারিরা ব্যস্ত রয়েছেন গরু নামানো ও খাইনে পরিচর্যায়। বাজারে দেশীয় গরুর আধিক্য বেশি। পথে রয়েছে কয়েক’শ ট্রাক। উত্তরবঙ্গ থেকে গরু বহনকারি ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক বেপারি চট্টগ্রামের চেয়ে ঢাকামুখী হয়েছেন।

সাগরিকা বাজারে প্রচুর গরু রয়েছে। আরও অন্তত ৫০-৬০ ট্রাক পশুবাহী ট্রাক পথে রয়েছে বলে জানান ইজারাদার। আজ রাত বা কালকের মধ্যে এসব ট্রাক বাজারে চলে আসবে।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা সাগরিকা বাজারে মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, তিনি এবার ১০ টি গরু এনেছেন। সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা দামের গরু আছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৬০ টি গরু নিয়ে আসছেন বেপারি রহমত আলী। তারা যৌথভাবে খাইন প্রস্তুত করে রেখেছেন।

বিবিরহাটে গরু বেপারি মো. শাহজাহান বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেপারিরা গরু নিয়ে বাজারে আসছেন। দূর-দূরান্ত থেকে কয়েক দিন আগে এসে খাইন ধরতে হয়। তাই আগে-ভাগে চলে আসতে হয়।

এদিকে, নগরের অলিগলি এবং উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় গরু বিক্রির মিনি হাটে লোকজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। মূলত বেশি জনসমাগম এড়াতেই মানুষ এখন এসব বাজারমুখী হচ্ছেন। অনেকে দরকষাকষি করছেন, আবার অনেকে অগ্রিম টাকা দিয়ে গরু বুকিংও দিয়ে রাখছেন।

নগরীর বড়পোল এলাকায় গরু কিনতে আসা ব্যাংকার আহসান হাবিব বলেন, ভিড় এড়াতে এখান থেকে গরু কিনতে এসেছি। দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। তবে এখনো বাজার জমে উঠেনি বলে অগ্রিম কিছু বলা যাচ্ছে না। দরদামে মিলে গেলে আজকেই গরু কিনে বাড়ি ফিরবো।

হাটহাজারী উপজেলার মৌসুমি পশু ব্যবসায়ী মিজান বলেন, মৌসুমী ব্যবসা হিসেবে আমি প্রতিবছর কোরবানির জন্য গরু কিনে আনি। এসব গরু পরিচিত লোকজন ও সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি। এবার ঠাকুরগাঁও রুহি বাজার থেকে ১০০টি গরু এনেছি। আশা করি এবার গরুর দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। ব্যবসায়ও হয়ত এবার লাভ করতে পারবো।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এবারের বাজারে সম্ভাব্য কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৮ লাখ ৯ হাজার। এর বিপরীতে চট্টগ্রাম জেলায় স্থানীয় উৎপাদন ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৪। যার মধ্যে গরু ৫ লাখ ১০ হাজার ৪০টি, মহিষ ৬৩ হাজার ১৩৬টি, ছাগল ও ভেড়া ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩টি এবং অন্যান্য পশু ৯৫টি।

ডা. মো. রেয়াজুল হক বলেন, কোরবানির আরও কিছুদিন বাকি আছে। আমরা আশা করছি, কোরবানির আগমুহূর্তে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে। চট্টগ্রামে ৫২ হাজারের মতো কোরবানির পশু ঘাটতি আছে। সিরাজগঞ্জ থেকে গরু এলে এই ঘাটতি পুষিয়ে নেয়া যাবে।

তবে এবার গরুর সঙ্কট হবে না দাবি করে তিনি আরও বলেন, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ৫০-৬০ হাজার গরু আসে। খামারির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গরু এনে চট্টগ্রামের চাহিদা পূরণ করছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত