ঢাকা, শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১ কার্তিক ১৪২৮ আপডেট : ২ মিনিট আগে

স্কুলে নিয়োগ বাণিজ্য, আদালতে মামলা

  দিনাজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:৩৮

স্কুলে নিয়োগ বাণিজ্য, আদালতে মামলা
ছবি: প্রতিনিধি
দিনাজপুর প্রতিনিধি

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার কালীমেলা দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ে এমপিও নীতিমালার আলোকে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে একাধিক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়োগপ্রার্থী মাসুম ইসলাম অফিস সহায়ক পদে ২ লক্ষ টাকা দিয়েও নিয়োগ পাননি বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় নিয়োগ বোর্ডের চার সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে নিয়োগ বোর্ড সভাপতি হুমায়ুন কবির বাবুল, প্রধান শিক্ষক টলীন চন্দ্র, বীরগঞ্জ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং জিডি প্রতিনিধি বীরগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে দিনাজপুর সহকারী জজ আদালতে এ মামলা দায়ের করা হয়।

একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক টনীল চন্দ্র ও বিদ্যালয় পরিচালনা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হুমায়ুন কবির বাবুল চাকরির আশ্বাসে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দাবি, কোনো প্রার্থীর কাছে আর্থিক কোনো লেনদেন করা হয়নি। মেধার ভিত্তিতে ৩টি পদে ৩ জন কর্মচারীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

জানা যায়, কালীমেলা দ্বি-মূখি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩টি কর্মচারীর পদ শূন্য হয়। পরে প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিরাপত্তাকর্মীর তিনটি পদের জন্য গত ১৫ সেপ্টেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তিনটি পদের জন্য ৩১ জন প্রার্থী আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই ও ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকায় দুজন প্রার্থীকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। ২৯ জন নিয়োগ প্রার্থীকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ঘোষণা অনুযায়ী প্রার্থীদের গত ১৬ সেপ্টেম্বর লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য ডাকযোগে এডমিট কার্ড দেয়া হয়। এডমিট কার্ডের দিনক্ষণ ও স্থন হিসাবে বীরগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেই নিয়োগ পরীক্ষায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে ৪ জন, নিরাপত্তাকর্মী পদে ৬ জন এবং অফিস সহায়ক পদে ৫ অংশগ্রহণ করেন। কয়েকজন নিয়োগ প্রার্থী এডমিট কার্ড পাওয়ার পরও নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।

নিয়োগ বোর্ডের দাবি, যারা এডমিট কার্ড পাওয়ার পরও নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি তারাই এই পরীক্ষাকে বানচাল এবং বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন। পরীক্ষায় যিনি সর্বোচ্চ মেধাবী ও কোনো নাম্বার পেয়েছেন তাকেই নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তিন পদের জন্য ৩ কর্মচারী যোগদান করেছেন। এখন তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ের কর্মচারী হিসাবে কাজ করছেন।

নিরাপত্তাকর্মী পদে আবেদনকারী লিটন ইসলাম বলেন, কালিমেলা দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন আমার বাসা এবং আমার পরিবার ওই বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আমি প্রার্থী হিসেবে আবেদন করি এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সাথে একান্তভাবে বৈঠক করি। আমাকে চাকরি দেয়া হবে বলে ৭ লক্ষ টাকা দফারফা হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং সভাপতিকে নগদ ১ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি, কিন্তু নিয়োগ পাইনি।

অফিস সহায়ক পদে নিয়োগপ্রার্থী মাসুম ইসলাম বলেন, অফিস সহায়ক পদে আমার নিকট থেকে ৫ লক্ষ টাকার দফারফা হয়। আমি তাৎক্ষণিকভাবে ২ লক্ষ টাকা প্রধান শিক্ষক এবং সভাপতিকে দেই। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি নিয়োগ পরীক্ষার দুইদিন আগে আমাদের সাফ জানিয়ে দেয়া হয় যে অফিস সহায়ক পদে ১৪ লক্ষ টাকার বিনিময়ে এক প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরবর্তীতে মামলা দায়ের করেছি।

কালিমেলা দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল গফফার বলেন, বর্তমান প্রধান শিক্ষক টনীল চন্দ্র ও বর্তমান সভাপতি হুমায়ুন কবির বাবুল একাধিক প্রার্থীর নিকট থেকে চাকরির আশ্বাসে টাকা নিয়েছে। যখন যে পদে যে বেশি টাকা দিচ্ছে, তখন তাকে সেই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ধর্মীয় মেয়েকে স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

অফিস সহায়ক পদে চাকরিপ্রার্থীর বাবা ইউনুছ আলী বলেন, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হুমায়ুন কবির বাবুলের নিকট রাতের অন্ধকারে তার বাসার একাধিকবার আমরা সাক্ষাৎ করি এবং চাকরির বিষয়ে সে আশ্বস্ত করে। তার কথামতো আমার গোয়ালের ৭টি গরু ও বিভিন্ন লোকের কাছে থেকে সুদের ওপর টাকা নিয়ে একদিনে ৫ লক্ষ টাকা দেই ছেলের চাকরির জন্যে। অফিস সহায়ক পদে আরও বেশি টাকার বিনিময়ে একজন প্রতিবন্ধী ছেলেকে চাকরি দেয়া হয়েছে। পরে আমার ছেলে বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেছে।

ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান বিদ্যোৎসাহী সদস্য আলহাজ্ব দানেশ আলী মাস্টার বলেন, বর্তমানের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক টনীল চন্দ্রকে আমি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলাম। সেসময়ে তিনি বিদ্যালয়টি সঠিকভাবে ন্যায়-নীতির সাথে পরিচালনা করবে বলে অঙ্গীকার করেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি এতো অর্থলোভী হয়ে পড়েছেন যে, তার কারণেই আজকে এই বিদ্যালয়টি অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, চাকরি দেয়ার নামে একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। নিয়োগ বোর্ড ও এই স্বার্থান্বেষী প্রধান শিক্ষকসহ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিচার দাবি করছি।

অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক টনীল চন্দ্র বলেন, এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের জনবল কাঠামো নীতি অনুসরণ করে যথাযথভাবে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এ নিয়োগ বোর্ড গঠন করা হয়। সর্বোচ্চ মেধাবী প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কোনো অর্থ গ্রহণ করিনি, অর্থ গ্রহণের প্রশ্নই আসে না। বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ণ কারার জন্য স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যে মামলা করে হয়রানি করছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হুমায়ুন কবির বাবুল বলেন, এখানে কোনো রকমের স্বজনপ্রীতির বা আর্থিক লেনদেনের ঘটনাই ঘটেনি। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনজন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয় এবং বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চাকরিপ্রার্থীরা আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ বোর্ড গঠন করা হয়। নিয়োগ বোর্ড লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর সর্বোচ্চ নাম্বারপ্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়েছে। কোনো আর্থিক লেনদেন করা হয়নি, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

নিয়োগ কমিটির ডিজির প্রতিনিধি বীরগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, নিয়োগ বোর্ডের ওপর কোন মামলা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। ডিজির প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য থাকলে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আমরা সম্মানী পেয়ে থাকি। তবে এটা সরকার নির্ধারিত ফি না।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত