ঢাকা, শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ আপডেট : ১৪ মিনিট আগে

তৃতীয় শ্রেণী পাস করেই ক্লোনিং করে হাতিয়েছে কোটি টাকা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ২০:৩৯

তৃতীয় শ্রেণী পাস করেই ক্লোনিং করে হাতিয়েছে কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক

মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার মাধ্যমে নম্বর ক্লোনিং বা স্পুফিং করে এজেন্টসহ সাধারণের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়া একটি হ্যাকার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তাররা হলো- চক্রের হোতা নুরুজ্জামান মাতুব্বর, সজিব মাতুব্বর ও সুমন শিকদার।

র‌্যাব বলছে, চক্রের সদস্য দুজনের তৃতীয় শ্রেণী ও একজনের ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা হলেও প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদের বিশেষ জ্ঞান ছিলো। চক্রটি একটি বিদেশি পেইড অ্যাপস ব্যবহার করে নম্বর ক্লোনের মাধ্যমে এই প্রতারণা করছিলেন। তারা তিন ধাপে এই প্রতারণা করতেন। প্রথম ধাপে টাকার বিনিময়ে নিম্নআয়ের বিভিন্ন পেশার মানুষের নামে সিম রেজিস্ট্রেশন করে তা সংগ্রহ করতেন। দ্বিতীয় ধাপে বিদেশি অ্যাপস ব্যবহার করে এজেন্টদের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিতেন। সর্বশেষ প্রতারণার মাধ্যমে আনা টাকা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসে ক্যাশআউট করা হতো। এক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হলে চক্রের প্রথমজন পায় ১২ হাজার, দ্বিতীয়জন ২৫ হাজার এবং শেষ ধাপে চক্রের সদস্যরা পেতেন ৭০ হাজার টাকা। এই চক্র এখন পর্যন্ত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জ এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে চক্রের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে নুরুজ্জামান ও সজিব সম্পর্কে শ্যালক দুলাভাই। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১৩টি মোবাইল, ২৪টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন, চক্রটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টদের টার্গেট করে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন অসাধু মোবাইল সিম বিক্রেতার সঙ্গে পরস্পর যোগসাজসে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, খেটে খাওয়া মানুষ ও সহজ সরল মানুষদের এনআইডি ব্যবহার করে সিমকার্ড রেজিস্ট্রেশন করতেন। এরপর বিকাশ হেল্পলাইনের নম্বর ক্লোন করে নিজেদের মোবাইল ব্যাংকিং হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক জানান, চক্রটি কৌশলে এজেন্টদের পিন কোড জেনে নিয়ে মোটা অংকের টাকা নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নিতো। এরপর তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা চক্রের সদস্যদের নম্বরে পাঠিয়ে দিতেন। তাদের যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শনাক্ত করতে না পারে এর কৌশল হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে টাকা পাঠিয়ে অধীনে থাকা এজেন্ট থেকে টাকা সংগ্রহ করা হতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই গ্রুপের ২০-২৫ জন সদস্য সক্রিয় রয়েছে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারক চক্রের প্রত্যেক সদস্যের কাছে ৫০ থেকে ৬০টির বেশি সিমকার্ড থাকে। একবার প্রতারণার কাজ শেষ হলেই ব্যবহৃত সিমকার্ডটি ফেলে দেয়া হতো। চক্রের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মোবাইল নেট ব্যবহার না করে ওয়াইফাই অথবা পকেট রাউটার ব্যবহার করতেন।

গ্রেপ্তার তিনজনের পরিচয়

র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক জানান, চক্রের অন্যতম হোতা নুরুজ্জামান মাতুব্বর মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ২০০০ সাল থেকে ঢাকায় স্যানিটারি মিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৫ সাল থেকে এই প্রতারণা চক্র গড়ে তোলেন। তার বিরুদ্ধে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা মামলা রয়েছে। তিন মাস আগে জামিনে বের হয়ে আবারও এই প্রতারণার কাজে যোগ দেন।

গ্রেপ্তার সজিব মাতুব্বর সুমন শিকদার সর্ম্পকে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক বলেন, সজিব মাতুব্বরও তৃতীয় শ্রেণি পাস। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। আর গ্রেপ্তার সুমন শিকদার মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পাস করে ১৯৯৬ সালে শ্রমিক ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে যান। ২০০১ সাল থেকে বিভিন্ন পেশায় জড়িত ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ কোম্পানির এসআর হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১৭ সালে প্রতারক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। কমিশনের বিনিময়ে প্রতারক চক্রের কাছে বিকাশ এজেন্টদের তথ্য সরবরাহ করতেন।

গ্রেপ্তারের খবর ফাঁস হওয়ায় চক্রের অন্য সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েছে। এই চক্রের দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক সহযোগী রয়েছে। প্রতারণা চক্রের মূল হোতাসহ গ্রেপ্তার তিনজন এর আগেও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলেও জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ জার্নাল/এফজেড/কেএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত