চোখের মণি মা, চোখের বালি মা

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২২, ১৮:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

  গাজীপুর প্রতিনিধি

ছবিতে: বিশিয়া-কুড়িবাড়ি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রিত একজন মা

পরম নির্ভরতা ও ভালোবাসার আশ্রয়স্থল মা। সন্তানের জন্য জীবন বরবাদ করার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণও মা। সেই মাকে যদি তার নিজের সন্তান জীবন সায়াহ্নে এসে সংসার বঞ্চনার নিদারুণ দুঃখবোধ উপহার দেয়, তবে তা হয়ে ওঠে অশ্রুজলের করুণ কাব্য। জীবনের নানা জটিলতা ও বাঁক বদলে সংসার বঞ্চনার শিকার মায়েদের আশ্রয়স্থল গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুরের বিশিয়া-কুড়িবাড়ি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র।

গাজীপুরের ওই বৃদ্ধাশ্রমে ৮৫ জন মা যাপিত জীবনের দুঃখ ভুলে সুখ হাতড়ে বেড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের জীবনের শেষবেলায় পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সাধ্যানুযায়ী সেবার হাত বাড়িয়ে রেখেছে। সেখানে বসবাস করেও ব্যথাতুর মায়ের মন সন্তানের মঙ্গল কামনাতেই প্রার্থনায় বিভোর থাকে।

মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবসে গাজীপুরের বৃদ্ধাশ্রমটি গিয়ে সেখানে থাকা নিবাসীদের সঙ্গে কথা হয়। দুই ছেলের মা ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার সাবেক স্কুলশিক্ষক গুলনাহার বেগম (৬৮)। ৬ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় সন্তানের কাছে হয়ে ওঠেন বোঝা। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও এখন বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা। সন্তানেরাই এখানে তাকে দিয়ে গেছেন। সন্তানরা যত দুঃখই দিক, তবু তাদের মঙ্গল কামনাই এই মায়ের দিনরাতের প্রার্থনা।

গুলনাহার বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, যতদিন স্কুলে চাকরি করেছি ততদিন খুব ভালো ছিলাম। বেতনের টাকা সন্তানদের হাতে দিতাম, ওরা খুব খুশি হতো। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেছে। পরে টাকার জন্য কিছুদিন টিউশনিও করেছি। এরপরও থাকতে পারিনি সন্তানদের কাছে। সুন্দর গোছানো সংসার ছেড়ে এখন পড়ে রয়েছি বৃদ্ধাশ্রমে।

সাবেক এই স্কুলশিক্ষিকা আক্ষেপ করে বলেন, সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে আমার হয়তো কোনো ফাঁক-ফোকর ছিল। তা যদি না হয় তবে ওরা এমন হবে কেন? আমার ভাইয়েরা তো আমার মায়ের সঙ্গে এমনটা করেনি। ওদের বাবা আমার শাশুড়িকে কত যত্ন করেছে, কিন্তু আমার কেন এমন কপাল? এসব কথা বলতে বলতে তিন বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন...।

গুলনাহার বেগমের মতো আরও অনেক মাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে প্রবীণ নিবাসে। বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদা এখানে পূরণ হলেও সন্তানের স্নেহ-সান্নিধ্য ভুলতে পারছেন না মায়েরা। সন্তান দূরে ঠেলে দিলেও সারাক্ষণ সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন অবহেলিত এই মায়েরা।

দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল গোপালগঞ্জের মমতাজ বেগমের (৫৫)। কাতর কণ্ঠে বললেন, মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। ছোট ছেলে ব্যবসা আর বড় ছেলে বাবার জমানো টাকা ব্যাংকে রেখে ঘুরেফিরে খায়। ছোট ছেলে কথা দিয়েছিল রিকশা চালিয়ে খাওয়াবো, প্রয়োজনে তোমাকে রক্ত বেঁচে খাওয়াবো। সেই ছেলেই ৮ বছর আগে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে চলে গেছে। গত ৮ বছরে কয়েকবার দেখতে এসেছিল ছোট ছেলে। কিন্তু বড় ছেলে ৮ বছরে একবারও দেখা করেনি।

“মনে হয়েছিল এবার ঈদে ওরা আসবে, কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। শেষ পর্যন্ত ওরা কেউ আসেনি।”

বৃদ্ধাশ্রমে কথা হয় ঢাকার জিঞ্জিরা এলাকার বাসিন্দা নারগিস বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই বৃদ্ধাশ্রমে আছি ৫ বছর। অন্যান্য দিন সবার সঙ্গে গল্প করে কিংবা ঘুমিয়ে সময় কাটিয়ে দেই। কিন্তু বিশেষ দিনে সন্তানের কথা খুব মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতার রোষানলে একমাত্র মেয়েকে ছেড়ে পড়ে রয়েছি এখানে।

“ঈদ বা অন্যান্য বিশেষ দিন আসলেই মেয়েটির কথা খুব মনে পড়ে। ওদের সঙ্গে একসাথে বসে ভাত খেতে ইচ্ছে করে।”

কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, গাজীপুর সদরের মণিপুর বিশিয়া কুড়িবাড়ি এলাকার খতিব আবদুল জাহিদ ১৯৮৭ সালে রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় ১২ কক্ষের একটি বাড়িতে কেন্দ্রটি স্থাপন করেন। ১৯৯৪ সালে কেন্দ্রটিকে মণিপুর বিশিয়া এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৫ সালে ২১ এপ্রিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী মাদার তেরেসা কেন্দ্রটির সম্প্রসারিত অংশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ওই সময় থেকেই কেন্দ্রটিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলেছে সন্তানের কাছে আশ্রয় না পাওয়া এমন শতাধিক বৃদ্ধা মায়ের।

তিনি বলেন, শিশুর শৈশবে নিজের সব সুখ বিলিয়ে দিয়ে সন্তানের মঙ্গল নিশ্চিত করতেন এই মায়েরা। সন্তানেরা সেই মায়েদেরই জীবন থেকে মুছে ফেলেছেন। অথচ সন্তানের মঙ্গল কামনায় দিন-রাত প্রার্থনায় রত থাকেন এখানকার মায়েরা।

কেন্দ্রের হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার বলেন, এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রত্যেকেই যেন আমার মা। আমি তাদের সবাইকে মায়ের মতোই আদর-যত্ন করি। মায়েদের সেবা-যত্নের চেষ্টা করা হলেও সন্তানের জন্য তাদের হাহাকার কোনো কিছুতেই দূর করা যায় না।

কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বর্তমানে এই কেন্দ্রে ৮৫ জন বৃদ্ধ নারী ও ৯০ জন পুরুষ আছেন। অসহায় ও নিরুপায় বয়োজ্যেষ্ঠরা এ প্রবীণ নিবাসে বিনা খরচে থাকেন। তাদের জন্য আমৃত্যু নিশ্চিত করা হয় অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান ও বিনোদন। মারা যাওয়ার পরও তাদের নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস মোতাবেক সমাধিস্থ করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে