খরচার টাকা উঠছে না তরমুজ চাষিদের, ঢাকায় দাম আকাশছোঁয়া

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২২, ২০:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  আল-রাজী মাহমুদ অনিক

সাতান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশ বাংলাদেশ। দিনে দিনে এ মাথা- ওমাথা ভ্রমণ করা যায়, পরিবহন করা যায় সকল কৃষিপণ্য। অথচ চাষী ও ভোক্তার মধ্যে পণ্যের দামে আকাশপাতাল ব্যবধান। একদিকে কৃষকের চাষের খরচ উঠে না অন্যদিকে রাজধানীতে দামের উত্তাপে ভোক্তা ছুঁতে পারেন না সেই পণ্য।

গরমের ফল তরমুজের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান যেন ছাড়িয়ে গেছে অন্য সবকিছুর রেকর্ড। সারাজীবন আস্ত তরমুজ কেনা মানুষকে কেজি হিসেবে কিনতে হচ্ছে তরমুজ। রমজানের আগে থেকেই রাজধানীতে তরমুজের দাম ছিল আকাশছোঁয়া, কমেনি রমজানের পরেও। পাইকারি বাজারে দাম কিছু কমলেও খুচরা বাজারে এর প্রভাব নেই। ক্রেতাদের আগের মতোই বেশি দামে কেজি হিসেবে খুচরা বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে তরমুজ।

শনিবার যাত্রাবাড়ী আড়তে তরমুজের পাইকারি বাজার ও আশপাশে খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায় পাইকারি বাজারে সাধারণ তরমুজ শ’(১০০টি) হিসেবে বিক্রি হয়। 

আড়তদাররা জানান, তরমুজের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি একশ তরমুজে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। কেউ বলছেন, মাঝারি সাইজের একটা তরমুজে কমপক্ষে ৫০ টাকা দাম কমেছে। কিন্তু খুচরা বাজারে ক্রেতাকে এখনও ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে ফলটি কিনতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা শ’হিসেবে কিনে কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে দেশের কোনো কোনো জায়গায় খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু রাজধানীর বাজারের চিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আড়তদারদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১২ কেজি ওজনের প্রতি একশ তরমুজ এক সপ্তাহ আগেও ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। এখন সেটা বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায়। ৫ থেকে ৭ কেজি ওজনের মধ্যে থাকা একশ তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। কয়েকদিন আগেও এই দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

যাত্রাবাড়ী আড়তের মক্কা-মদিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মাহবুব আলম বলেন, তরমুজের সরবরাহ বেশি তাই দাম অনেকটাই কমে গেছে। এখন মূলত খুলনার তরমুজ আসছে। আরও মাস খানেক তরমুজ থাকবে।

হাজী নাছির বাণিজ্যালয়ের মালিক হাজী নাছির উদ্দিন বলেন, তরমুজপ্রতি দাম কমপক্ষে ৫০ টাকা কমেছে। এতে মানুষ কম দামে তরমুজ খেতে পারবে।

এদিকে তরমুজ চাষিদের লাভের চিত্র অন্যরকম। ঢাকায় এত দামে বিক্রি হলেও পাইকাররা তাদের থেকে কিনে অল্প দামে। চাষের খরচ উঠাতেও কষ্ট হয় বলে অভিযোগ করেন অনেক চাষি। 

নাটোরের বড়াইগ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, দুই বিঘা জমিতে তরমুজের চাষ করেছিলেন তিনি। ঈদের আগে এক চালান তরমুজ এক হাজার ৩০০ টাকা প্রতি ১০০ তরমুজ বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু ঈদের পর দাম না থাকায় তরমুজ বেচে ঈদের আগে ও পরে মিলিয়ে মাত্র ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। সেসব টাকা সার-কীটনাশকের দোকানসহ শ্রমিক খরচ দিতেই শেষ হয়ে গেছে। এখন সেচের বকেয়া টাকা দেবেন কোথা থেকে সেটি নিয়েই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তিনি। 

শুধু আব্দুল মজিদই নন, তার মতো বড়াইগ্রামের শত শত তরমুজ চাষির একই অবস্থা। বর্তমানে জমি থেকে কৃষকরা ৬-১০ কেজি আকারের একেকটি তরমুজ বিক্রি করছেন মাত্র ২০-২৫ টাকা দরে। আর ২-৩ কেজি আকারের তরমুজের দাম মাত্র ৬-৭ টাকা। এসব তরমুজ জমি থেকে তুলে রাস্তা পর্যন্ত আনতে প্রতিটির জন্য আবার ৫-১৫ টাকা পর্যন্ত শ্রমিক খরচ দিতে হচ্ছে। এতে চাষিদের উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। আর যারা জমি লিজ নিয়ে তরমুজ চাষ করেছেন, বিঘা প্রতি তাদের লোকসান আরও বেশি। এতে এ এলাকার তরমুজ চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। 

মাড়িয়া গ্রামের কৃষক শরীফুল ইসলাম জানান, তিনি এবার ছয় বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এতে তার এক লাখ টাকার ওপরে খরচ হয়েছে। কিন্তু জমির তরমুজ বেচে পেয়েছেন মাত্র ৮০ হাজার টাকা। 

বাজিতপুর গ্রামের কৃষক সোরাবুল ইসলাম জানান, তিনি ঈদের আগে ১২ হাজার টাকা শ হিসেবে একশ’টি তরমুজ বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু এখন বেপারিরা প্রতি শ’তরমুজের দাম ২০০০-২৫০০ টাকার বেশি বলছেই না।  সবচেয়ে ভালো তরমুজ বিক্রি করেছেন তিনি আড়াই হাজার টাকা শ’হিসাবে। 

তবে রাজধানীর শনির আখড়া, রায়েরবাগ, মাতুয়াইল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে আগের মতোই ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে।

মাতুইয়াইল কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের খুচরা তরমুজ বিক্রেতা তরিকুল  বলেন, ৬০ টাকা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করছি। সবাই যে দামে বেচে আমিও সেই দামেই বেচি।

চাষিদের থেকে বিশ-পচিশ টাকায় কেনা তরমুজ ঢাকায় এসে হয়ে যায় তিনশো-চারশো টাকা। মাঝের এত বিশাল অংকের টাকা কোথায় চলে যায় সেই প্রশ্নই সবার। একদিকে ন্যায্য দাম পায়না কৃষক, অন্যদিকে দামের আতিশয্যে তরমুজ ছুঁয়ে দেখতেও ভয় পায় রাজধানীতে বাস করা মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এআর/এমএম