ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ৪০ মিনিট আগে

রিজার্ভে কাটছে আঁধার

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২২, ০০:৪২

রিজার্ভে কাটছে আঁধার
ছবি- সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। করোনা মহামারির পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ধুঁকছে পুরো বিশ্ব। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসায় দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। দেশের অর্থনীতি অন্ধকার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে সরকারবিরোধীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয় সরকার।

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিদ্যুতের রেশনিং। এলাকাভিত্তিক তালিকা করে শিডিউল অনুযায়ী হচ্ছে লোডশেডিং। এর ফলে জ্বালানি তেল আমদানি কমেছে। আর তেল আমদানি কমানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা। তবে রেমিট্যান্সের সুবাতাসে কাটছে সেই আঁধার।

চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনে ১৬৪ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। দেশীয় মুদ্রায় বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৯৫ টাকা) এই অর্থের পরিমাণ ১৫ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিদিন এসেছে ৭৪৩ কোটি টাকা।রেমিট্যান্সের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মাসে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। মুসলমানদের অন্যতম বড় এ উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের পরিবার-পরিজনদের জন্য বেশি বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। এ কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ (২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ (২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। জুন মাসে ১৮৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এ অঙ্ক আগের মাসের চেয়ে ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার কম। চলতি বছরের মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার।

এদিকে দেশে ডলার সংকটের কারণে কমছে টাকার মান। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সোমবার এক ডলারের জন্য খরচ করতে হয়েছে ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা। বৃহস্পতিবার তা ছিল ৯৪ টাকা ৪৫ পয়সা। খোলা বাজারে ডলারের দাম উঠে গেছে ১০৫ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি আমদানি বিল মেটাতে এই দরে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। নিয়ম অনুযায়ী এটাই ডলারের আনুষ্ঠানিক দর। এর আগে, চলতি বছরের মে মাসের শুরুর দিকে এ দর ছিল ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সায়। এ হিসাবে দুই মাসের ব্যবধানে টাকার মান কমেছে ৮ টাকা ২৫ পয়সা। তবে বিভিন্ন ব্যাংক ও কার্ব মার্কেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন ব্যাংকগুলো আমদানি বিলের জন্য নিচ্ছে ৯৬ থেকে ৯৮ টাকা, নগদ ডলার বিক্রি করছে ৯৯ থেকে ১০০ টাকা। আর ব্যাংকের বাইরে খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১০২ থেকে ১০৪ টাকায়।

অন্যদের তুলনায় ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ: করোনা ভাইরাস মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যার প্রভাব অনেক দেশের মুদ্রাতেই পড়েছে। ক্রমাগত দাম হারাচ্ছে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা। এর বাইরেও সিরিয়া ও লিবিয়ার সংঘাত এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রভাব ফেলেছে অনেক দেশের অর্থনীতিতেই।

ট্রাবলডকারেন্সিসের সিনিয়র ফেলো ও পরিচালক জনহপকিন্স ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ স্টিভ হাঙ্কি গত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে সবচেয়ে দর হারানো মুদ্রার একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন।

যেখানে দেখা যায় ২০২০-এর জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে জুলাইয়ের ২২ তারিখ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি মূল্য হারিয়েছে ভেনিজুয়েলার মুদ্রা ভেনিজুয়েলিয়ান বলিভার। গত ৩০ মাসে এই মুদ্রার দাম কমেছে ৯৯.১২ শতাংশ। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটিতে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশটি ছেড়ে পাশের দেশগুলোতে চলে গেছেন অনেকেই। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত ভেনিজুয়েলাতেই। এরপরের তালিকাতেই রয়েছে জিম্বাবুয়ের ডলারের। ১ ডলারের বিপরীতে জিম্বাবুয়ের ডলার এখন ৯৫০। গত ৩০ মাসে এই ডলারের বিপরীতে এই মুদ্রার দাম কমেছে ৯৭.৬১ শতাংশ।

সাম্প্রতিক দেউলিয়া হয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের একসময়ের উন্নত দেশ লেবানন। ঋণের বোঝা, প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতি ও সর্বশেষ বৈরুত বন্দরে রাসায়নিক বিস্ফোরণ সামাল দিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাতে শুরু করেছে লেবানিজরা। ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব দেশটিকে গ্রাস করে ফেলছে। ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা লেবানিজ পাউন্ডও গত ৩০ মাসে দাম হারিয়েছে ৯২.২৪ শতাংশ। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার মুদ্রার দাম কমেছে ৭৭.২৬ শতাংশ। প্রতি ডলারের বিপরীতে সিরিয়ার মুদ্রা এখন ৪০১০ পাউন্ড।

এদিকে ন্যাটোভুক্ত দেশ তুর্কিয়েতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি। রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্রয়ের কারণে আমেরিকার রোষানলে পড়া, ইউরোপের বিনিয়োগ কমে যাওয়া, দেশটির সরকারবিরোধীরা বলছে, ক্ষমতাসীন এরদোয়ান সরকারের দুর্নীতি ও অদূরদর্শী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেশটিকে এমন পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে দেশটির নাগরিকরা নিজেদের জমানো অর্থের সুরক্ষায় তা দিয়ে ডলার ও সোনা কিনছেন। হাঙ্কির কারেন্সি ওয়াচলিস্টের তথ্যমতে দেশটির মুদ্রার দাম গত ৩০ মাসে ডলারের বিপরীতে কমেছে ৬৬.৫৭ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১৭.৮০ লিরা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে গেলে ইরানের ওপর আবারও পশ্চিমা অবরোধ কার্যকর হয়, যা দেশটির মুদ্রার দামেও প্রভাব ফেলেছে। ইরানিয়ান রিয়েল গত ৩০ মাসে দাম হারিয়েছে ৫৮.২৪ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৩ লাখ ১৯ হাজার ইরানিয়ান রিয়েল পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা রয়েছে অর্থনৈতিক সংকটে। বৈদেশিক ঋণের চাপ সামলাতে পারছে না দেশটি। এমনকি ডলারের অভাবে জ্বালানি তেল কিনতে না পারায় দিনের পর দিন পেট্রোল পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সেখানকার গাড়িগুলোকে। এমন পরিস্থিতিতে দাম কমছে শ্রীলঙ্কার রুপির। ৩০ মাসে ৫৪.৩০ শতাংশ দাম কমে এখন ডলারের বিপরীতে শ্রীলঙ্কান রুপি ৩৯৭.৮২।

জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎসংকটে ভুগছে পাকিস্তান। দেউলিয়ার হাত থেকে পাকিস্তানকে বাঁচাতে চা পান করা থেকে নাগরিকদের বিরত থাকতে বলেছেন পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী। আইএমএফ বলছে, দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি। এমন পরিস্থিতিতে দাম কমছে পাকিস্তানি মুদ্রারও। পাকিস্তান তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে ব্যবহার করছে। এর কারণ করোনা ভাইরাস মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে দেশটি দেউলিয়া হয়ে যাবে। হাঙ্কির তালিকার ভিত্তিতে সর্বশেষ ৩০ মাসে পাকিস্তানি মুদ্রার দাম কমেছে ৩২.২৪ শতাংশ। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপি পাওয়া যাচ্ছে ২২৮.৫২।

ভারতীয় রুপির দরপতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার ভারতের মুদ্রার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে এবং প্রতি ডলারের দাম ৮০ রুপি অতিক্রম করেছে। ভারতীয় রুপির দরপতন এমন একসময়ে ঘটেছে, যখন এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়াতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের (যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক) বৈঠক হতে চলেছে।

গত সপ্তায়ই ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাসে সর্বোচ্চ দরপতন হয়েছে, যেখানে রুপির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রার দাম ৮০.০৬-এ পৌঁছায়।

সেই হিসাবে বাংলাদেশের টাকার অবস্থান ডলারের বিপরীতে অন্যান্য দেশের মুদ্রার অবস্থানের থেকে অনেক ভালো। গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ৩.৩৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯৪.৭০ টাকা।

বাংলাদেশ জার্নাল/জিকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত